টেকনাফের বাজারে কেন অসময়ে আমের দেখা মিলছে

· Prothom Alo

চৈত্র মাসের আগে সারা দেশে আমের দেখা মেলে না। ব্যতিক্রম কক্সবাজারের টেকনাফ। উপকূলীয় এই উপজেলায় মাঘ মাস থেকেই বাজারে কাঁচা আম বিক্রি শুরু হয়। চাহিদা বেশি থাকায় চড়া মূল্যে বিক্রিও হয়। কৃষিবিদদের মতে, বারোমাসি এই স্থানীয় জাতের আম দেশের আর কোথাও হয় না। টেকনাফের আর্দ্র আবহাওয়ায় কেবল এই আম জন্মায়।

Visit chickenroadslot.pro for more information.

মাঝারি আকারের আম। এক পাশে লম্বালম্বি একটা দাগ। স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে ‘বুক সেলাই’ আম নামে পরিচিত। কক্সবাজারের টেকনাফের বিভিন্ন ফলের দোকানে ডিসেম্বর মাস থেকে এই আমের দেখা মিলছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহেও উপজেলার ফলের দোকানগুলোতে দেদার বিক্রি হচ্ছে এসব আম। পবিত্র রমজান মাসের কারণে রোজাদারদের অনেকেই চড়া দামে এই আম কিনছেন। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়।

প্রশ্ন হলো, দেশের মানুষ যখন আমের মুকুলের দেখা পায় না, তখন কীভাবে টেকনাফের বাজারে আম উঠছে। কৃষিবিদেরা বলছেন, এই আম স্থানীয় জাতের। বারোমাসি আমেরই একটি জাত। তবে দেশের অন্য কোথাও এই আম দেখতে পাওয়া যায় না। কেবল টেকনাফের আর্দ্র আবহাওয়ায় এই আম ধরে।

টেকনাফ বাসস্টেশন বাজারে সবচেয়ে বেশি কাঁচা আম বিক্রি হয় ‘ মামা-ভাগিনা’ নামের একটি ফলের দোকানে। দোকানের মালিক মো. ইউনুস ও শাহ জাহান নামের দুই ফল ব্যবসায়ী। আগাম আম সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রথম আলোকে তাঁরা বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে তাঁরা দুজন বিভিন্ন ফলের পাশাপাশি কাঁচা আমও বিক্রি করছেন। গত সাত দিনে তাঁরা টেকনাফের বাহারছড়া, কচ্ছপিয়া, সাবরাং এলাকা থেকে অন্তত ১২ লাখ টাকার কাঁচা আম কিনেছেন। বেশির ভাগ আম ঢাকায় সরবরাহ করা হয়েছে।’

টেকনাফ পৌরসভার রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসে কাঁচা আম বিক্রি করেন বাদশা মিয়া। ক্রেতার নজর কাড়তে কাঁচা আম সুতায় বেঁধে বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন। লোকজন দরদাম করে দুই-তিনটি করে কিনে নিচ্ছেন। বাদশা মিয়া (৫৫) বলেন, টেকনাফের আগাম এই কাঁচা আম এখন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতেও বিক্রি হচ্ছে। ভ্রমণে আসা পর্যটকেরা অসময়ে নতুন ফল কিনে খাচ্ছেন চড়া মূল্যে।

মো. হুমায়ুন কবির, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, টেকনাফ।দেশে বারোমাসি কাটিমন জাতের আম আছে। এগুলো সারা বছর ফলন দেয়। এই জাতের আমও সেই রকম। তবে এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় আবহাওয়ায় জন্মায়। আমরা এর ‘সায়ন’ নিয়ে অন্যত্র লাগিয়েছি, কিন্তু আগাম আম পাইনি। তাই আমটির আগেভাগে ফলন দেওয়ার পেছনে স্থানীয় আবহাওয়া একটি ভূমিকা রাখছে বলে মনে হচ্ছে। এ জন্য বিশদ গবেষণা প্রয়োজন।

গত জানুয়ারি মাসে সাত লাখ টাকার কাঁচা আম বিক্রি করেছেন সাবরাং ইউনিয়নের নয়াপাড়ার কৃষক দিল মোহাম্মদ। প্রতি কেজি আম বিক্রি করেছেন ৫৫০ টাকায়। দিল মোহাম্মদ (৫৭) বলেন, ১৩ বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের সিকদারপাড়ায় বেড়াতে যান। সেখানে পাহাড়ের পাদদেশে তিনি এই জাতের আমের বাগান দেখেন। তারপর সেখান থেকে পাঁচ কেজি পাকা আম কিনে আনেন। পরে কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী আঁটি থেকে গজানো চারা রোপণ করেন। পাঁচ বছরের মাথায় বেশির ভাগ গাছে মুকুল আসতে থাকে।

দিল মোহাম্মদ জানান, প্রথম বছর ১৭টি গাছ থেকে ৬৮৪টি কাঁচা আম পাওয়া গেছে। এখন ৪২টি গাছে কয়েক হাজার আম ধরেছে। এ গাছ বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করা গেলে কৃষকেরা লাভবান হবেন।

কেন টেকনাফের বাজারে শীতেই আগাম আমের দেখা মিলছে, জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, এটা খুব সম্ভবত বারোমাসি আমেরই কোনো জাত। টেকনাফের আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে দুই মাস আগেই বাজারে চলে আসে এই আম।

চাহিদা থাকায় চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে এই আম। সম্প্রতি তোলা

দেখতে মিল থাকলেও টেকনাফের বাজারে আসা আমের জাতটি রাংগুয়াই নয় বলে নিশ্চিত করেন কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, রাংগুয়াই জাতের আমটি একেবারে মৌসুমের শেষে ধরে। এটি রাংগুয়াই নয়। স্থানীয় একটি জাত। টেকনাফের বাইরে এটি দেখা যায়নি। চাহিদা বেশি থাকায় কাঁচা অবস্থায় কৃষকেরা বিক্রি করেন। তাই এই আম পাকা অবস্থায় কেমন, তা এখনো জানেন না তাঁরা।

আগে ভাগে ফলন দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘দেশে বারোমাসি কাটিমন জাতের আম আছে। এগুলো সারা বছর ফলন দেয়। এই জাতের আমও সেই রকম। তবে এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় আবহাওয়ায় জন্মায়। আমরা এর ‘সায়ন’ নিয়ে অন্যত্র লাগিয়েছি, কিন্তু আগাম আম পাইনি। তাই আমটির আগেভাগে ফলন দেওয়ার পেছনে স্থানীয় আবহাওয়া একটি ভূমিকা রাখছে বলে মনে হচ্ছে। এ জন্য বিশদ গবেষণা প্রয়োজন।’

কৃষি, বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভৌগোলিক এবং জলবায়ুগত কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমের ফলনকে প্রভাবিত করতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, টেকনাফ বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিণে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় অবস্থিত। এখানকার তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা দেশের উত্তর বা মধ্যাঞ্চলের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকে। ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যখন শীতের আমেজ থাকে, টেকনাফে তখন আমগাছে মুকুল চলে আসে। তাপমাত্রা বেশি হওয়ার কারণে মুকুল থেকে গুটি এবং গুটি থেকে আম বড় হওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হতে পারে। এ নিয়ে গবেষণা দরকার।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী কর্মকর্তা আশীষ কুমার বলেন, উপকূলীয় এলাকার মাটিতে লবণের উপস্থিতি গাছের হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলে। এটি অনেক সময় গাছকে দ্রুত ফলন দিতে প্ররোচিত করে। এই বিশেষ ‘মাইক্রো ক্লাইমেট’-এর কারণেই টেকনাফের আম অন্তত দেড় থেকে ২ মাস আগে পরিপক্ব হয়।

Read full story at source