হ্রদ থেকে সমুদ্র, দুই জলের দুই গল্প

· Prothom Alo

কয়েক বছর আগে সিলেটে গিয়েছিলাম। সেখানে চা–বাগান, ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর আর মেঘালয়ের পাহাড় দেখে বেশ অভিভূত হয়েছিলাম। বিশেষ করে ভোলাগঞ্জের পাথরের ওপরে বয়ে চলা স্বচ্ছ পানি আমাকে বিমুগ্ধ করেছিল। সে সময় সমুদ্রের নীল জলরাশি দেখার প্রবল আগ্রহ জেগেছিল। সৌভাগ্যক্রমে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি সেই সুযোগ এনে দেয়। প্রতিষ্ঠানটি কাপ্তাই হ্রদ ও চট্টগ্রাম পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদের ট্যুর দলে ছিল কয়েক প্রজন্মের মানুষ। তাই ট্যুর ব্যবস্থাপনা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠল। সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন লেখক ও গবেষক জুলফিকার আলী ভুট্টো ভাই। বয়স ষাটের কাছাকাছি হলেও দেখে মনে হয় যেন টগবগে তরুণ! যা হোক, ট্যুর দলে আমার দুই বন্ধু তৈয়বুর রহমান শাহ ও আবদুল্লাহ আল রাসেল যোগ দিয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। আমরা তিন বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে পড়েছিলাম। তৈয়বুর ঢাকায় সম্প্রতি একটি বেসরকারি ব্যাংকে জয়েন করেছে। আর কিছুদিন আগে রাসেল ৪৯তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। আমরা ঘোরার যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে সোসাইটি প্রাঙ্গণে হাজির হলাম। রাস্তাঘাট তখন কুয়াশায় আচ্ছন্ন।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

রাতের চুয়েট ক্যাম্পাস

বাস ছাড়ল সন্ধ্যা ছয়টায়। গন্তব্য চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমাদের মধ্যরাত হয়ে গেল। রাতে থাকলাম চুয়েট ক্যাম্পাসের গেস্ট হাউসে। আমরা সকালে ঝটপট উঠে পড়লাম। তারপর নাশতা খেতে ছুটলাম চুয়েটের টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায়। এখানকার মুরগি তেহারি ও সবজি-ডাল বেশ সুস্বাদু ছিল। আমরা মজা করে খেলাম। চুয়েট ক্যাম্পাস বেশ সুন্দর। চারদিকে ব্যাপক গাছপালা। ঢাকায় এখন বেশ শীত, রোদের দেখা পাওয়া যায় না। কিন্তু এখানে সাত সকালে রোদ দেখা গেল।

রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে

অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি কাপ্তাই হ্রদ

এবার আমাদের ছুটে চলা রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের দিকে। বাস সাঁই সাঁই করে চলতে শুরু করল। পথিমধ্যে আমরা খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর ভরা যৌবন প্রত্যক্ষ করলাম। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা কতটুকু দুর্গম, তা টের পেলাম। অবশেষে আমাদের দলটি কাপ্তাই হ্রদের ঘাটে এসে পৌঁছল। এই ঘাট নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ নৌ–পরিবহন কর্তৃপক্ষ। তাই নৌকা ভাড়া করতে তেমন বেগ পোহাতে হলো না। দুটো নৌকা ভাড়া করে আমরা রওনা হলাম ১০ আর ই ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পের দিকে। কাপ্তাই হ্রদের পানি বেশ পরিষ্কার ও সবুজাভ। যাবার পথে হ্রদের দুই পাশেই ছোটবড় অনেক টিলা খেয়াল করলাম। আহা! কী অপরূপ দৃশ্য। আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। বলতে গেলে চোখের পলক ফেলতেই মন চাচ্ছিল না। শুরু হলো ছবি তোলার হিড়িক। এ সময় ফয়সাল আমার অনেকগুলো ছবি তুলে দিল। আর্মি ক্যাম্পে পৌঁছে আমরা যে যার মতো ছড়িয়ে পড়লাম। আমি আর খলিল ভাই এখানকার মিষ্টির দোকানে ঢুঁ মারলাম। এগুলো বেশ মজাদার ছিল। পরে শুনলাম এসব দোকান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত হয়। ক্যাম্প থেকে ফেরার সময় আদিবাসী বাজারে আমরা হানা দিই। তারা নানা পসরা সামগ্রী সাজিয়ে বসে ছিল। সেখানে পাহাড়ি কলা ও তেঁতুল কিনলাম। আমার বন্ধু রাসেল ভোজনরসিক মানুষ। আমাকে চাকমা দোকানদারের তৈরি পাটিসাপটা কিনে খাওয়াল। একই দোকান থেকে গরম শিঙাড়াও খেলাম। খুব মজাদার ছিল। আমাদের দলের প্রায় সবাই উৎসুক হয়ে কেনাকাটায় মগ্ন হয়ে পড়ল। আমরা কয়েকজন এক ফাঁকে আদিবাসী গ্রাম ঘুরে দেখতে বের হলাম। একটি বাড়িতে দু–একজন চাকমা মেয়েকে হস্তশিল্পের প্রতি মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে দেখলাম। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার পথে। ঘাটে পৌঁছে দুপুরের খাবার খেলাম এবং এবার আমাদের গন্তব্য চট্টগ্রাম পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত।

কাপ্তাই হ্রদে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে ট্যুর দল

রাতের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত

কাপ্তাই হ্রদে বেশি সময় ব্যয় হওয়ায় পতেঙ্গায় পৌঁছতে আমাদের দেরি হয়ে যায়। সে জন্য আমরা সূর্যাস্ত উপভোগ করতে পারিনি। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রবেশ করার সময় রাতই হয়ে গেল। এ সময় সমুদ্রসৈকতের পাড়ে সামুদ্রিক বস্তু দিয়ে তৈরি গয়না ও খাবারের সারি সারি দোকান নজর পড়ল। কনকনে শীতে সমুদ্রপাড়ের মানুষদের জবুথবু অবস্থা। উপকূলে স্টিমার ও বিশাল জাহাজ নোঙর করা ছিল। আর মাঝে মাঝে সমুদ্রের ঢেউ পাড়ে আছড়ে পড়ছিল। আমি তৈয়বুর, রাসেল ও খলিল ভাই তীরে হাঁটতে শুরু করলাম। আমরা ঝালমুড়ি খেলাম। এবার অপেক্ষা জোয়ার দেখার। তবে জানতে পারলাম জোয়ার শুরু হবে রাত ৯টার পর থেকে। তাই আমরা ৪ জন বাজার ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিই। দোকানগুলোতে হরেক রকমের সামগ্রী দেখতে পেলাম। আমি কিছু আচার কিনে নিলাম। বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ রান্না করে বিক্রি করা হচ্ছিল। আমরা অবশ্য ভাজাপোড়া এড়িয়ে গিয়েছিলাম। রাত গভীরতর হচ্ছিল। অন্যদিকে সাগরপাড়ে ঢেউয়ের গর্জন ক্রমশ বাড়ছিল। জোয়ার দেখে অভিভূত হলাম। আমি জোয়ারের পানি ছুঁয়ে দেখার জন্য হাত বাড়ালাম! সাগড়পাড়ে শীতের তীব্রতা বেড়েই চলল। ইতিমধ্যে আমাদের দলের সবাই ঢাকায় ফেরার জন্য আকুল হয়ে উঠল। ফাঁকা রাস্তায় বাস দ্রুতবেগে ছুটে চলল। লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে ইতিমধ্যে আমরা বেশ ক্লান্ত। বাস এসে থামল কুমিল্লায়। রাতের খাবার এখানেই সেরে নিলাম। ঢাকায় আমরা পৌঁছালাম ভোর ছয়টার দিকে।

সামুদ্রিক বস্তু দিয়ে তৈরি হরেক রকমের গয়না ও তৈজসপত্র

প্রয়োজনীয় পরামর্শ

ঢাকা থেকে ট্রেন ও বাসযোগে চট্টগ্রাম পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে যাওয়া সম্ভব। ট্যুর দলে লোকসংখ্যা কম হলে ও বাজেট কম থাকলে বাস রিজার্ভ করে না যাওয়াই ভালো। এতে খরচ বেশি পড়বে। সমুদ্রসৈকত পাড়ের দোকানগুলো অনেক সময় দেশীয় পণ্য বিদেশি বলে চালিয়ে দেয়, তাই কেনাকাটায় সতর্ক থাকতে হবে। কাপ্তাই হ্রদের চারপাশের স্থল অংশে বিষাক্ত সাপের উপদ্রব থাকতে পারে, তাই সাবধান থাকা জরুরি। ট্যুরে একাধিক গন্তব্য সহজেই উপভোগ করতে হলে সময় ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী হতে হবে।

লেখক: গবেষণা সহযোগী, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source