বগুড়ার ৫ টাকার শিম ঢাকায় আসতে আসতে যেভাবে ৭০ টাকা হয়ে যায়
· Prothom Alo

খেত থেকে সবজি তুলে বিক্রির জন্য কৃষক যে হাটে নেন, সেখান থেকেই শুরু হয় কৃষিপণ্যে নামে–বেনামে টাকা আদায়। এরপর ভোক্তা পর্যন্ত সেই সবজি পৌঁছাতে বারবার হাতবদল হয় আর ধাপে ধাপে বাড়ে দাম। পরিবহন খরচের পাশাপাশি যাত্রাপথে পরিবহন মালিক–শ্রমিক সংগঠনের চাঁদাবাজি ও পৌরসভার ইজারাদারের চাঁদার টাকাও যুক্ত হয় পণ্যের দামে।
Visit amunra-opinie.pl for more information.
সবজির মূল্যবৃদ্ধির কারণ খুঁজতে সবজিবাহী ট্রাকে করে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বগুড়ার মহাস্থান হাট থেকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত আসেন এই প্রতিবেদক। কথা বলেন কৃষক, আড়তদার, হাটের ইজারাদার, ব্যবসায়ী ও পরিবহনশ্রমিকদের সঙ্গে। এতে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে মহাস্থান হাটে পাইকারি পর্যায়ে এক কেজি শিম বিক্রি করে কৃষক পেয়েছেন পাঁচ টাকা। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজারে ভোক্তারা সেই শিম কিনেছেন ৭০ টাকা কেজি। বগুড়ায় কৃষক যে কাঁচা মরিচ বিক্রি করেছেন ৩৬ টাকায়, ঢাকায় সেটি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন এলাকার মোকাম থেকে রাজধানীর ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে অন্তত পাঁচবার হাতবদল হয়। খেত থেকে সবজি তুলে হাটে নেন কৃষক, সেখানে ফড়িয়া ও ব্যাপারীরা কৃষকের কাছ থেকে সবজি কিনে আড়তে দেন। সেখান থেকে ট্রাকে সবজি যায় রাজধানীর বিভিন্ন আড়তে। আড়ত থেকে সবজি কেনেন পাইকার বা ফড়িয়ারা। পরে ফড়িয়াদের কাছ থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা পণ্য কিনে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করেন। এভাবে ধাপে ধাপে নানা অজুহাতে মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকের খেতে ফলানো সবজি থেকে টাকা হাতিয়ে নেন। ফলে সবজির দাম বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই দিতে হয়।
বগুড়ার শেরপুরে ইজারাদারকে দেওয়া টোলের টাকার রশিদ‘ধলতা’র ফাঁদে কৃষক
বগুড়া সদরের পীরগাছা গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার তিনি মহাস্থান হাটে ১০ মণ টমেটো বিক্রি করেন। প্রতি মণ টমেটোর দর ঠিক হয় ৮০০ টাকা। কিন্তু ৮ হাজার টাকার বদলে ব্যাপারী তাঁকে দিলেন ৭ হাজার ২০০ টাকা। শহিদুল বলেন, ‘১০ মণ টমেটো হাটত লিয়ে আসনু, ১ মণই ফাও। ২০ কেজি ধলতা লিচ্চে ব্যাপারী। হাটের খাজনা ২০ কেজি।’
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সবজি বিক্রি করতে আসা চাষিদের প্রতি মণে দুই কেজি বেশি দিতে হয় আড়তদার ও ব্যাপারীদের। বেশি দেওয়া এই সবজি স্থানীয়ভাবে ‘ধলতা’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া চাষিদের কাছ থেকে ইজারাদারের লোকজন মণপ্রতি দুই কেজি করে খাজনা তুলছেন। সেই হিসাবে হাটে ১০ মণ সবজি বিক্রি করে চাষিরা পান ৯ মণের দাম। কৃষকদের জিম্মি করে ‘ধলতা আদায়’ এখন এই হাটে ‘নিয়মে’ পরিণত হয়েছে।
এ ছাড়া ক্রেতার কাছ থেকে মহাস্থান হাটে সবজির দামের ওপর শতকরা আট টাকা হারে কমিশন নেন আড়তদারেরা। ঢাকায় আসার পর পাইকারি আড়তে কমিশন কেটে রাখা হয় প্রতি কেজি সবজিতে চার টাকা।
মহাস্থান হাটের ইজারাদার রায়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাহেরুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, হাটে নিয়ম মেনেই খাজনা আদায় করা হচ্ছে। কোনো অনিয়ম হচ্ছে না।
মহাস্থান হাট সবজি, কাঁচা ও পাকা মাল ব্যবসায়ী এবং আড়তদার সমিতির সভাপতি শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আড়ত থেকে পাইকারি মোকামে সবজি পরিবহনের সময় কিছু সবজি পচে যায়। এ কারণে ৮-১০ বছর ধরে এ হাটে সব ধরনের সবজিতে মণপ্রতি দুই কেজি করে ধলতা নেওয়ার নিয়ম চালু আছে।
ট্রাক বন্দোবস্তের নামেও ‘চাঁদাবাজি’
মহাস্থান হাট থেকে সবজির ট্রাক রওনা দেওয়ার সময় সেখানকার এক ব্যক্তি ট্রাকচালকের হাতে একটি কাগজ দেন। ‘আন্তঃজেলা ট্রাক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন বগুড়া’ লেখা এ চালান কপি চালকদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ৫০০ টাকা করে তোলেন খায়রুল ইসলাম (খাজা) নামের এক ব্যক্তি। তিনি মহাস্থান পিকআপ ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি।
খায়রুল ইসলাম বলেন, এটা কোনো চাঁদা নয়। ব্যবসায়ীরা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের আড়তে লাখ লাখ টাকার সবজি পাঠান। অপরিচিত ট্রাকে সবজি পাঠানোর কারণে মালামাল খোয়ানোর ঝুঁকি আছে। এ কারণে চালানের কাগজে চালকের নাম–ঠিকানা, ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বরসহ বিস্তারিত লিখে ট্রাকভাড়া বন্দোবস্তে সহায়তা করা হয়। চালকের জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফটোকপি রেখে দেওয়া হয়। এককথায় ব্যবসায়ীদের মালামালের জিম্মা নেওয়া হয়। এতে চালকেরা খুশি হয়ে ৫০০ টাকা করে দেন।
পথের চাঁদাবাজি কিছুটা কম
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মহাস্থান হাটের সবজির মোকাম থেকে ১৫ টন সবজিবোঝাই ট্রাকটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। এতে শসা, শিম, ছাঁচি লাউ, আলু, কাঁচা মরিচসহ বিভিন্ন সবজি ছিল। ট্রাকটি বগুড়া শহরের চারমাথা ভবের বাজার পৌঁছালে চালক জানালেন, কিছুদিন আগেও এখানে পণ্যবাহী ট্রাক থামিয়ে ৩০০ টাকা চাঁদা তোলা হতো। তবে এখন চাঁদাবাজি নেই।
পথে টাকা পরিশোধের রসিদবগুড়ার শেরপুর পৌরসভা এলাকায় পৌঁছাতেই লাঠি হাতে ট্রাক থামান এক যুবক। তিনি রসিদ ধরিয়ে দিয়ে ৫০ টাকা আদায় করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবক বলেন, তিনি শেরপুর পৌরসভার ইজারাদার রুহুল আলমের হয়ে এই চাঁদা তুলছেন।
ট্রাক চান্দাইকোনায় পৌঁছাতেই চালক রানা মিয়া বলেন, এখানেও ১০০ টাকার চাঁদা দিতে হতো, রাতের বেলা বলে রক্ষা। যমুনা সেতুর পশ্চিম টোল প্লাজায় পৌঁছার আগেই ট্রাকের চালক ও সহকারী জানালেন, অন্য সময় এখানে ট্রাক থামিয়ে ট্রাফিক পুলিশ চাঁদাবাজি করত। তবে সপ্তাহ দুয়েক ধরে অনেকটা কমেছে। রাত তখন প্রায় ১১টা। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় কাগজপত্র তল্লাশির জন্য ট্রাক থামায় হাইওয়ে পুলিশ। চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির কাগজপত্র যাচাইয়ের পর ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মালামাল বহনের দায়ে মামলা দেওয়ার কথা বলেন পুলিশ। চালক সহকারীকের দিয়ে চা-নাশতা খাওয়ার জন্য ৫০০ টাকা দিয়ে ছাড়া পান।
মধ্যরাতের দিকে সবজিবাহী ট্রাক পৌঁছাল গাজীপুরের কালিয়াকৈর বাজারে। এখানে এক ব্যক্তি রসিদ দিয়ে ১০০ টাকা চাঁদা নিলেন। নাম প্রকাশ না করে ওই ব্যক্তি বললেন, তিনি কালিয়াকৈর পৌরসভার ইজারাদারের লোক। ওই বাজারে ৫০ বস্তা শসা নামানোর পর ট্রাক আবার এগিয়ে চলে।
রাত দুইটা নাগাদ পৌঁছায় মিরপুর ১ নম্বরের শাহ্ আলী বাজারে। চালক বললেন, অন্য সময় এখানে ১০০ টাকা চাঁদা দিতে হতো। তবে এখন চাঁদা নেই। এখানে ৫০ বস্তা শসা ও ১০০ বস্তা আলু খালাসের পর ট্রাক থামল কারওরান বাজারে। সেখানে ৫০ বস্তা শসা, ৫০০ কেজি শিম ও ২০ বস্তা কাঁচা মরিচ খালাসের পর পরবর্তী গন্তব্য রাজধানীর শ্যামবাজার। সেখানে ৫০ বস্তা শসা খালাসের পর চালক রানা মিঞা বলেন, এক মাস আগেও কারওয়ান বাজারে ১০০ টাকা এবং শ্যামবাজারে ২০০ টাকা লাইনম্যান চাঁদা গুনতে হয়েছে। এখন চাঁদা নেই।
মধ্যরাতে সবজিবাহী ট্রাক পৌঁছানোর পর মিরপুর–১ নম্বর সুলতানুল আউলিয়া হজরত শাহ্ আলী বাগদাদী (রহ.) বাজারে মালামাল খালাসের জন্য তোড়জোড় শুরু হয়রাত পৌনে চারটার দিকে ট্রাক পৌঁছায় যাত্রাবাড়ী। সেখানে ট্রাক থামতেই ছুটে আসেন ইজারাদারের লোকজন। চালকের সহকারীকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে ২৫০ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দেওয়ার পর এখানে ১০০ বস্তা শসা খালাস করে ভোরের আলো ফোটার আগেই পুলিশের ঝামেলা এড়াতে ট্রাক দ্রুত যাত্রাবাড়ী ত্যাগ করে।
হিসাব কষে দেখা গেল, বগুড়া থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত ১৫ টন সবজি খালাস করতে গিয়ে ট্রাকচালককে ঘাটে ঘাটে রসিদের বিপরীতে ১৫০ টাকা এবং বিনা রসিদে মোট ৪০০ টাকা চাঁদা গুনতে হয়েছে।
ঢাকায় এসে দাম কয়েক গুণ
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বগুড়ার মহাস্থান হাটে এক কেজি সবজি ঢাকার পাইকারি আড়তে নিতে পরিবহন খরচ পড়ে গড়ে দুই টাকা। এর সঙ্গে শ্রমিক, বস্তা বাবদ খরচ যোগ হয় কেজিতে আরও দুই টাকা। অর্থাৎ এক কেজি সবজি বগুড়ার মহাস্থান থেকে ঢাকায় আসতে খরচ পড়ে চার টাকা।
মহাস্থান হাটে বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি শসা ১২ টাকায় বিক্রি হয়। গতকাল সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজারে সেই শসা ৪০ টাকা কেজি কিনেছেন ভোক্তারা। একইভাবে ১২ টাকার বেগুন ঢাকায় ৬০ টাকা, ২০ টাকার গাজর ৪০ টাকা, ডায়মন্ড জাতের ৮ থেকে ১১ টাকা কেজির আলু ১৫ থেকে ৩০ টাকা, ২০ টাকার প্রতিটি লাউ ৭০ টাকা, ১০০ টাকার সজনে ১৬০ টাকা, ২০ টাকা কেজির মূলা ৪০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা যায়, যা কৃষকপর্যায়ে বিক্রি হওয়া দামের প্রায় দুই থেকে তিন গুণ।