ইরান যুদ্ধ যে কারণে সহজে শেষ হবে না
· Prothom Alo

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কিছু প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে। কেন এই যুদ্ধ শুরু হলো, যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল কী এবং যুদ্ধের পর পরিস্থিতি কেমন হবে? এসব বিষয় নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই।
এই প্রশ্নগুলোর একটি বড় কারণ হলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কখনো বলা হয়েছে, লক্ষ্য শুধু ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ থেকে বিরত রাখা। আবার কখনো বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা।
Visit milkshakeslot.online for more information.
তবে যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প একটি বিষয়ে সঠিক কথাই বলেছিলেন। সেটি হলো, এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে না। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ঘোষণার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হতাহতের কথাও উল্লেখ করেন। কয়েক দিন পর তিনি বলেন, যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে, প্রয়োজনে আরও দীর্ঘ সময়ও চলতে পারে।
সম্প্রতি অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হবে এবং তিনি যখনই চাইবেন, তখনই তা শেষ হবে। তাঁর এই বক্তব্য বাস্তব সামরিক পরিস্থিতির চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা বেশি হতে পারে। দ্রুত বিজয়ের ঘোষণা আর্থিক বাজারকে শান্ত করতে পারে এবং দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারে। কিন্তু এসব ঘোষণা যুদ্ধের গভীর কারণগুলোকে সমাধান করে না। সামরিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক প্রতিশোধ এবং অসম্পূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্য প্রায়ই রাজনৈতিক ঘোষণার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে টিকে থাকে।
সাধারণত দুই রাষ্ট্রের মধ্যে অধিকাংশ যুদ্ধ তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ের হয়। ইউক্রেন যুদ্ধ, যা এখন চতুর্থ বছরে চলছে, তা ব্যতিক্রম। করেলেটস অব ওয়ার প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই শতকে অধিকাংশ আন্তরাষ্ট্রীয় যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যেই শেষ হয়েছে। অনেক যুদ্ধ আরও ছোট ছিল। উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের কথা বলা যায়। তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের উদাহরণও আছে। ১৯৮০–এর দশকের ইরাক-ইরান যুদ্ধ আট বছর ধরে চলেছে এবং এতে ১০ লাখের বেশি সেনা নিহত হয়েছেন।
স্থিতিশীল তেহরান
ইরানের সরকার সহজে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম। এটি একটি বিস্তৃত ও শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই ব্যবস্থা ইরানের জ্বালানি থেকে আয় এবং বহু দশক ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে টিকে আছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পরও এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি; বরং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত অস্থায়ী নেতৃত্ব গঠন করা হয় এবং পরে তাঁর ছেলে মুজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি এবং তাদের সহযোগী বাসিজ বাহিনী শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্যেও স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। কয়েক দশক ধরে এই বাহিনীর সদস্যদের কঠোর মতাদর্শিক যাচাই ও সাংগঠনিক সংহতির মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে দৃঢ় রক্ষক হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধের জটিলতা ক্রমেই বাড়ছে। এমন খবরও এসেছে যে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে। একই সঙ্গে আশঙ্কা রয়েছে যে চীনও ইরানকে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে পারে, যেমনটি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সমর্থনের ক্ষেত্রে করেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইউক্রেনের কাছেও সহায়তা চেয়েছে ইরানের ড্রোন মোকাবিলায় করতে।
বিমান হামলা ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর বড় ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু তা শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাবে না কিংবা রেভোল্যুশনারি গার্ডের যুদ্ধের মনবল ভেঙে দেবে না।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া ১২ দিনের তীব্র সংঘাত থেকে ইরান কিছু শিক্ষা নিয়েছে। এরপরের কয়েক মাসে তাদের সামরিক ও নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সক্ষমতা পুনর্গঠন করেছে এবং বৃহত্তর সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান যুদ্ধের ভৌগোলিক বিস্তৃতি বাড়িয়েছে। তারা কয়েকটি উপসাগরীয় আরব দেশে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি অবরোধ করেছে। বড় ধরনের যুদ্ধ সাময়িকভাবে থেমে গেলেও ইরান আঞ্চলিক অবকাঠামোর ওপর সীমিত হামলা বা তেল–গ্যাস পরিবহনের পথ ব্যাহত করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা ধরে রাখবে।
অর্থনৈতিক অভিঘাত
ট্রাম্প যে সময়সীমাই পছন্দ করুন না কেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার মতো সাধারণ শর্তগুলো আর নেই। দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার জন্য সাধারণত প্রয়োজন হয় স্পষ্ট সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, আলোচনায় বসতে আগ্রহী প্রতিপক্ষ এবং সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য। এ তিনটির কোনোটিই এই সংঘাতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না।
ইসরায়েলের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারাও যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে, এমন আশাবাদ দেখাননি। তাঁদের মতে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালাতে হবে। ইসরায়েলের দৃষ্টিতে এই যুদ্ধের লক্ষ্য হলো ইরান থেকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত হুমকি কমিয়ে আনা।
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ইসরায়েলের সামরিক প্রত্যাশার এই পার্থক্য সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যেই বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ যে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়, সেটি এখন যুদ্ধের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ফলে তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে এবং উৎপাদক দেশগুলো মজুত তেল ছাড়লেও দাম বাড়ছে।
উপসাগর অঞ্চলে দীর্ঘ অস্থিরতার আশঙ্কা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক বাজারেও চাপ তৈরি হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করার ক্ষমতা ইরানের এখনো রয়েছে।
এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রকে একদিকে সামরিক চাপ বজায় রাখতে বাধ্য করছে, অন্যদিকে সংযমের বার্তা দেওয়ারও প্রণোদনা তৈরি করছে।
যুদ্ধের জটিলতা ক্রমেই বাড়ছে। এমন খবরও এসেছে যে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে। একই সঙ্গে আশঙ্কা রয়েছে যে চীনও ইরানকে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে পারে, যেমনটি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সমর্থনের ক্ষেত্রে করেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইউক্রেনের কাছেও সহায়তা চেয়েছে ইরানের ড্রোন মোকাবিলায় করতে।
জাতীয়তাবাদী ঐক্য
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে যুক্ত করার কোনো পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে। সম্প্রতি ছয়টি কুর্দি রাজনৈতিক দল একটি জোট গঠন করেছে। খবরে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ইরানের পশ্চিম সীমান্তে প্রবেশ করানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পতবে ট্রাম্প এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন এবং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই। তবু কুর্দিদের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে জল্পনা থামেনি। কয়েকজন কুর্দি নেতা বলেছেন, তাঁরা বিচ্ছিন্নতাবাদ চান না; বরং তাঁরা নিজেদের বৃহত্তর ইরানি জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবেই দেখেন।
যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে বাইরের শক্তি ইরানের ভেতরের জাতিগত সংখ্যালঘুদের অস্ত্র দিচ্ছে, তাহলে তা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে। এতে সরকারবিরোধী অনেক মানুষও দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা বিদেশি আধিপত্যের আশঙ্কায় সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।
জাতীয়তাবাদী আবেগ অনেক সময় অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সাময়িকভাবে চাপা দিতে পারে। ১৯৮০–এর দশকের ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময়ও এমনটি হয়েছিল। তখন সরকার বহিরাগত শত্রুর বিরুদ্ধে জনরোষ কাজে লাগিয়ে ব্যাপক জনসমর্থন সংগঠিত করতে পেরেছিল।
এসব বাস্তবতা বিবেচনায় ট্রাম্পের বক্তব্য এখন একধরনের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার ইঙ্গিত দেয়। তিনি একদিকে দ্রুত বিজয়ের সম্ভাবনার কথা বলছেন, অন্যদিকে দীর্ঘ যুদ্ধের জন্যও রাজনৈতিক প্রস্তুতি তৈরি করছেন।
ট্রাম্পের এই অবস্থানই হয়তো যুদ্ধ শেষ করার পথ আরও জটিল করে তুলছে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য যা-ই হোক না কেন, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের মূল্য দেওয়া কি সত্যিই সার্থক হবে?
পল পোয়াস্ট ও পেগাহ বানিহাশেমি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
টাইম সাময়িকী থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত