ভিয়েতনামের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র: ইতিহাস, রাজনীতি ও মনস্তত্ত্ব
· Prothom Alo

১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ইতিহাসের এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে ভিয়েতনামের অবিসংবাদিত নেতা হো চি মিন হ্যানয়ের ঐতিহাসিক বা দিন স্কয়ারে লাখো জনতার সামনে দাঁড়িয়ে এক যুগান্তকারী ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামের স্বাধীনতা এবং একটি নতুন ‘ভিয়েতনাম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’-এর জন্ম ঘোষণা করেন। এই সিরিজের চতুর্থ পর্বে আমরা দৃষ্টি দেব ভিয়েতনামের দিকে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত ডামাডোল এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানি সাম্রাজ্যের পতনের ঠিক পরপরই ভিয়েতনামের স্বাধীনতার ঘোষণা আসে। সেই সময় ইন্দোচীনে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ চরমভাবে শিথিল হয়ে পড়েছিল এবং জাপানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের কারণে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। ঠিক সেই অভাবনীয় সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি পাঠ করা হয়।
এটি কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাই ছিল না; বরং দীর্ঘ আশি বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ঔপনিবেশিক শোষণ, বঞ্চনা ও চরম নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি জাতির পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত আইনি, রাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বহিঃপ্রকাশ ছিল এই দলিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বব্যবস্থাকে যখন নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছিল, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে রচিত এই ঘোষণাপত্রটি কেবল অভ্যন্তরীণ জনগণের জন্যই নয়; বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি নবীন ও স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের যৌক্তিকতা প্রমাণের সুচিন্তিত কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র: বিশ্বরাজনীতিতে নতুন ধারার জন্মভিয়েতনামের স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রের একেবারে শুরুতেই অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্ট। তারা তাদের স্রষ্টার দ্বারা কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকারে ভূষিত, এগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের সন্ধান।’
আদর্শিক ভিত্তি
ভিয়েতনামের স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো এর আদর্শিক ভিত্তি, যা অত্যন্ত সুকৌশলে পশ্চিমা বিশ্বের দুই মহান বিপ্লবের আদর্শের ওপর স্থাপন করা হয়েছিল। ঘোষণাপত্রের একেবারে শুরুতেই অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্ট। তারা তাদের স্রষ্টার দ্বারা কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকারে ভূষিত, এগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের সন্ধান।’
একটি এশীয় দেশের ঔপনিবেশিকতাবিরোধী সংগ্রামে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের এই ব্যবহার কোনো আকস্মিক বা আলংকারিক বিষয় ছিল না; এর পেছনে নিহিত ছিল হো চি মিনের গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক লক্ষ্য। তিনি এই অমর উক্তিটিকে ব্যক্তিস্বাধীনতার গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে, একটি বৃহত্তর ও বৈশ্বিক অর্থে ব্যাখ্যা করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে এর প্রকৃত অর্থ হলো পৃথিবীর সব জাতি জন্মগতভাবে সমান এবং প্রতিটি জাতির স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার ও নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার রয়েছে।
হাইতি: স্বাধীনতা অথবা মৃত্যু১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর ভিয়েতনামের হ্যানয়ের বা দিন স্কয়ারে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন হো চি মিনব্যক্তিগত মানবাধিকারের এই পশ্চিমা ধারণাকে সামষ্টিক জাতীয় অধিকারে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়াটি ছিল রাজনৈতিক দর্শনের এক অনন্য প্রয়োগ।
জানা যায়, ঘোষণাপত্রটি চূড়ান্ত করার আগে হো চি মিন আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা ওএসএসের কর্মকর্তা আর্কিমিডিস পাত্তির সঙ্গে এর খসড়া নিয়ে নিবিড়ভাবে আলোচনা করেছিলেন। এর মাধ্যমে ভিয়েতনামের বিপ্লবকে একটি বৃহত্তর, বৈশ্বিক ও পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরার সুস্পষ্ট প্রয়াস লক্ষ করা যায়, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সদ্য বিজয়ী পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সহানুভূতি ও রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করা।
এই ঘোষণাপত্রে ১৭৯১ সালের ফরাসি বিপ্লবের ‘মানুষ ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র’-এর কথাও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়। স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে খোদ ফরাসিদের ঘোষণাপত্রেই স্পষ্ট বলা হয়েছিল, ‘সব মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে এবং সম-অধিকার নিয়ে জন্মায়।’
ফরাসি দ্বিচারিতা ও শোষণের খতিয়ান
আমেরিকান দলিলের পাশাপাশি এই ঘোষণাপত্রে ১৭৯১ সালের ফরাসি বিপ্লবের ‘মানুষ ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র’-এর কথাও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়। স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে খোদ ফরাসিদের ঘোষণাপত্রেই স্পষ্ট বলা হয়েছিল, ‘সব মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে এবং সম-অধিকার নিয়ে জন্মায়।’
পশ্চিমা বিশ্বের এই দুটি সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক আদর্শের উদ্ধৃতি দেওয়ার পর, ঘোষণাপত্রে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও ক্ষুরধার ভাষায় ফরাসি উপনিবেশবাদের চরম দ্বিচারিতা, কপটতা ও নিষ্ঠুরতা উন্মোচন করা হয়। যুক্তি দেখানো হয় যে ‘স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ব’—এই মহান ফরাসি আদর্শগুলো চিরন্তন সত্য হলেও বাস্তবে গত আশি বছরেরও বেশি সময় ধরে ফরাসি সাম্রাজ্যবাদীরা এই মানদণ্ডগুলোকে চূড়ান্তভাবে কলুষিত ও অবমাননা করেছে।
১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর ভিয়েতনামের হ্যানয়ের বা দিন স্কয়ারে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের অনুষ্ঠানে সামরিক বাহিনীর সদস্যরারাজনৈতিক দিক থেকে ফরাসিদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, তারা ভিয়েতনামের জনগণকে প্রতিটি মৌলিক গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করেছিল। জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করার হীন উদ্দেশ্যে ফরাসিরা সুপরিকল্পিতভাবে দেশটিকে টোনকিন, আন্নাম এবং কোচিন চায়না—এই তিনটি ভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত করে শাসন করত। শিক্ষা ও সভ্যতার আলো থেকে ভিয়েতনামের জনগণকে দূরে রাখার জন্য স্কুল নির্মাণের চেয়ে দেশজুড়ে অনেক বেশিসংখ্যক কারাগার নির্মাণ করা হয়েছিল। ভিয়েতনামের জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য ফরাসিরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জনগণকে আফিম ও অ্যালকোহলের মতো মারণনেশা সেবনে বাধ্য করেছিল, যা ছিল মানবতার বিরুদ্ধে এক চরম অপরাধ।
উপনিবেশবাদ-উত্তর তাত্ত্বিকেরা এই ঘোষণাপত্রকে দেখেন ‘প্রভুর অস্ত্র দিয়ে প্রভুরই ঘর ভাঙার’ মোক্ষম উদাহরণ হিসেবে। ঔপনিবেশিক শক্তির ভাষাকেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে একটি শোষিত জাতি কীভাবে নিজেদের অধিকারের স্বর নির্মাণ করে এবং পশ্চিমাদের নৈতিক পরাজয় নিশ্চিত করে, এটি তার এক ধ্রুপদি দৃষ্টান্ত।
ভিয়েতনামে অর্থনৈতিক শোষণের সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতি দেখা যায় ১৯৪৪-৪৫ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে। ঘোষণাপত্রে প্রায় ২০ লাখ মানুষের অনাহারে মৃত্যুর যে উল্লেখ রয়েছে, তা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি ফরাসি-জাপানি শোষণের এক অকাট্য দলিল।
দুর্ভিক্ষ ও দ্বৈত শাসন
শোষণের এই চিত্রটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ছিল আরও ভয়াবহ। ফরাসি পুঁজিপতি এবং শাসকেরা অত্যন্ত নির্দয়ভাবে ভিয়েতনামের সাধারণ জনগণের কাছ থেকে উর্বরতা শক্তি সম্পন্ন ধানখেত, খনিজ সম্পদে ভরপুর খনি এবং বিস্তীর্ণ বনভূমি জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়েছিল। এই অর্থনৈতিক শোষণের সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতি দেখা যায় ১৯৪৪-৪৫ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে। ঘোষণাপত্রে প্রায় ২০ লাখ মানুষের অনাহারে মৃত্যুর যে উল্লেখ রয়েছে, তা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি ফরাসি-জাপানি শোষণের এক অকাট্য দলিল। ১৯৪০ সালে যখন জাপানি ফ্যাসিস্ট বাহিনী ফরাসি নিয়ন্ত্রিত ইন্দোচীনে প্রবেশ করে, তখন ফরাসি সাম্রাজ্যবাদীরা ভিয়েতনামের জনগণকে রক্ষা করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে জাপানিদের হাতে গোটা ভিয়েতনামের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়।
ভেনেজুয়েলা: শৃঙ্খল ভাঙার ইশতেহারএর ফলে ভিয়েতনামের নিরীহ জনগণ একই সঙ্গে ফরাসি ও জাপানি—এই দুই পরাশক্তির দ্বৈত শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকে। যখন এই দুই শক্তির খাদ্য মজুত ও লুণ্ঠন নীতির কারণে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছিল, তখন উপনিবেশিক প্রভুরা সাধারণ মানুষের জীবনের ন্যূনতম সুরক্ষাও দিতে ব্যর্থ হয়। ১৯৪৫ সালের ৯ মার্চ যখন জাপানি বাহিনী ফরাসি সৈন্যদের সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র করে ফেলে, তখন ফরাসি ঔপনিবেশিকেরা হয় পালিয়ে যায়, নয়তো বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করে।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ফরাসিরা দু-দুবার দেশটিকে জাপানি আগ্রাসনকারীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল। এর বিপরীতে, ভিয়েতনামের মুক্তিকামী মানুষের সংগঠন ‘ভিয়েত মিন লিগ’-এর নৈতিক অবস্থান ও মানবিকতা ছিল প্রশংসনীয়। ফরাসিদের চরম বিশ্বাসঘাতকতা এবং নিষ্ঠুরতার শিকার হওয়া সত্ত্বেও ভিয়েতনামের সাধারণ নাগরিকেরা ফরাসিদের প্রতি সর্বদা অভাবনীয় সহনশীলতা প্রদর্শন করেছিল এবং অনেক ফরাসি নাগরিককে নিরাপদে সীমান্ত পার হতে সাহায্য করেছিল।
ভিয়েতনামের স্বাধীনতাসংগ্রামের নায়ক হো চি মিন স্বদেশবাসীর কাছে ‘আংকেল হো’ নামেই পরিচিতসার্বভৌমত্বের নতুন আইনি দাবি ও ‘স্বর্গীয় ম্যান্ডেট’
এই ঘোষণাপত্রের একটি অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী দিক হলো, আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটে সার্বভৌমত্বের সম্পূর্ণ নতুন এক দাবি উত্থাপন। ঘোষণাপত্রে যৌক্তিকভাবে এই আইনি অবস্থান পরিষ্কার করা হয় যে ১৯৪০ সালের শরৎকাল থেকেই ভিয়েতনাম আর ফরাসিদের কলোনি ছিল না; বরং এটি কার্যত জাপানি সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী সময় মিত্রবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে জাপানিরা যখন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়, ঠিক তখনই ভিয়েতনামের জনগণ তাদের এই মহার্ঘ স্বাধীনতা সরাসরি জাপানিদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতা বা ‘ট্র্যাডিশনাল লেজিটিমেসি’ অর্জনের এক অনন্য সমীকরণ। ভিয়েতনামের সম্রাট বাও দাই যখন তাঁর রাজকীয় তরবারি ও সিলমোহর আনুষ্ঠানিকভাবে ভিয়েত মিনের প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দিয়ে পদত্যাগ করেন, তখন ভিয়েতনামের হাজার বছরের ঐতিহ্য অনুযায়ী সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছায় যে, কনফুসীয় দর্শনের ‘স্বর্গীয় ম্যান্ডেট’ বা ‘ম্যান্ডেট অব হেভেন’ রাজতন্ত্রের হাত থেকে নতুন প্রজাতন্ত্রের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। এর ফলে ফরাসিদের আবার ভিয়েতনামে ফিরে আসার ও নতুন করে শাসনভার গ্রহণ করার সব আইনি, রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তি চিরতরে নস্যাৎ হয়ে যায়।
ভাষাতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ ও মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি
ভাষাতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ ও সাংস্কৃতিক মুক্তির দিকটিও এই ঘোষণার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। হো চি মিন ফরাসি বা ধ্রুপদি চীনা ভাষার বদলে রোমান হরফে লেখা ভিয়েতনামি ভাষা বা ‘কুওক ঙ্গু’-তে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। ঔপনিবেশিক আমলে ফরাসি ভাষা ছিল অভিজাত এবং শাসকদের ভাষা। নিজেদের মাতৃভাষায় স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করার মাধ্যমে হো চি মিন মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যবাদের দীর্ঘদিনের শিকল ভেঙে দিয়েছিলেন। এর ফলে রাজনীতির ভাষা প্রথমবারের মতো সাধারণ কৃষক এবং শ্রমিক শ্রেণির দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।
একই সঙ্গে উপনিবেশবাদ-উত্তর আত্মপরিচয় নির্মাণের ক্ষেত্রে এই ঘোষণাপত্র এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটিয়েছিল। দীর্ঘদিনের পরাধীনতার কারণে ভিয়েতনামের সাধারণ জনগণের মধ্যে যে গভীর হীনম্মন্যতা তৈরি হয়েছিল, এই দলিলটি তা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। এটি ভিয়েতনামের প্রত্যেকটি মানুষকে ‘উপনিবেশের প্রজা’ থেকে একটি ‘সার্বভৌম রাষ্ট্রের গর্বিত নাগরিক’-এ রূপান্তরিত করেছিল, যা পরবর্তী সময় ফরাসি ও আমেরিকানদের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের মূল জীবনীশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
হো চি মিনের নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ ও ঘোষণাপত্রের ভাষার মধ্যকার বৈপরীত্য ইতিহাসবিদদের কাছে একটি কৌতূহলোদ্দীপক আলোচনার বিষয়। হো চি মিন নিজে একজন কট্টর মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী হলেও এই ঘোষণাপত্রে কমিউনিজমের কোনো উল্লেখ ছিল না। এটি ছিল মূলত পশ্চিমাদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করার একটি সুচিন্তিত ভূরাজনৈতিক কৌশল।
স্নায়ুযুদ্ধের কূটনীতি
হো চি মিনের নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ এবং ঘোষণাপত্রের ভাষার মধ্যকার বৈপরীত্য ইতিহাসবিদদের কাছে একটি কৌতূহলোদ্দীপক আলোচনার বিষয়। হো চি মিন নিজে একজন কট্টর মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী হলেও এই ঘোষণাপত্রে কমিউনিজমের কোনো উল্লেখ ছিল না। এটি ছিল মূলত পশ্চিমাদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করার একটি সুচিন্তিত ভূরাজনৈতিক কৌশল।
ঘোষণাপত্রের শেষাংশে মিত্রশক্তির কাছে, বিশেষ করে তেহরান ও সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনের চেতনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে, ভিয়েতনামের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দাবি করা হয়। আটলান্টিক চার্টারে প্রতিশ্রুত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে হো চি মিন মিত্রশক্তির বিরুদ্ধেই এক অকাট্য নৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণ ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর। এই ঘোষণার পর হো চি মিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানকে একাধিক চিঠি লিখে সমর্থন চাইলেও স্নায়ুযুদ্ধের সমীকরণে আটকে পড়া যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ নীরব থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকাতে ও ইউরোপে নিজেদের জোট মজবুত করতে যুক্তরাষ্ট্র উল্টো ফরাসিদেরই সমর্থন জোগায়। যেসব আমেরিকান গোয়েন্দা একসময় হো চি মিনকে সহায়তা করেছিল, সেই আমেরিকার এই পিঠটান দেওয়া নীতি বিশ্বরাজনীতির অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি, যা পরবর্তী সময় ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী ভিয়েতনাম যুদ্ধের বীজ বপন করেছিল।
উপসংহার
সুদীর্ঘকালের শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়নের ইতিহাসকে অত্যন্ত পরিশীলিত আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও শাশ্বত মানবাধিকারের ভাষায় রূপান্তরের মাধ্যমে ভিয়েতনামের নেতারা প্রমাণ করেছিলেন যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় বা পশ্চিমা বিশ্বেই আবদ্ধ থাকে না। তৎকালীন পরাশক্তিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে এই ঘোষণাকে স্বীকৃতি প্রদান না করলেও ইতিহাসের পাতায় এটি এমন এক অমোঘ ও শক্তিশালী দলিল হিসেবে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছে, যা পরবর্তী সময় এশিয়া ও আফ্রিকার প্রতিটি মুক্তিকামী সংগ্রামকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে এবং স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের কাছে চিরন্তন এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।