সবজির ব্যবসায় স্বাবলম্বী তিন প্রজন্ম
· Prothom Alo
আতিয়ার রহমান ৪০ বছর ধরে সবজি বেচাকেনা করেন। তাঁর বাবা মহির উদ্দিন বিশ্বাসও ২০ বছর সবজির বাজারে দিনমজুর শ্রমিকের কাজ করেছেন। তাঁর দুই ছেলেকেও তিনি নিজে সবজির ব্যবসায় নামিয়েছেন। এই তিন প্রজন্ম মূলত যশোর সদর উপজেলার বারীনগর পাইকারি মোকামে সবজি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত।
Visit albergomalica.it for more information.
নিরক্ষর আতিয়ার নৈশ বিদ্যালয়ে পড়ে অক্ষর চিনেছেন। এখন তিনি নিজের নাম লেখার পাশাপাশি ব্যবসার হিসাব–কিতাব করতে পারেন।
আতিয়ার সবজির ব্যবসা করে ৬০ শতক জমি কিনে দৌলতদিহি গ্রামে অন্তত ৪ হাজার বর্গফুটের পাকা বাড়ি করেছেন। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সবজি পাঠানোর জন্য দুটি ট্রাক কিনেছেন। প্রতিদিন অন্তত ২০ জন শ্রমিককে ১৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেন। সন্তানদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। তবে প্রথম জীবনে আতিয়ার বাবার পথ ধরে সবজি প্যাকেজিং গ্রেটিংয়ের দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। পরে তিনি নিজেই সবজি কিনে দেশের বিভিন্ন জেলার আড়তে পাঠাতে শুরু করেন।
১২ মার্চ বারীনগর সবজির মোকামে গিয়ে দেখা গেল, আতিয়ার কৃষকদের কাছ থেকে পাইকারি দরে সবজি কিনছেন। তাঁর কর্মচারীরা ওই সবজি বাছাই করে পানিতে ধুয়ে বস্তায় ভরে মুখ সেলাইয়ের কাজ করছেন। এরপর সেগুলো ট্রাকে তুলে সাজানো হচ্ছে। ওই ট্রাক নেওয়া হচ্ছে ঢাকার যাত্রাবাড়ী-কারওয়ান বাজারের আড়তে। আতিয়ার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব দেখভাল করছেন। হিসাবের খাতা নিয়ে তাঁর দুই ছেলে সঙ্গে সঙ্গে থাকছেন।
আতিয়ার সদর উপজেলার দৌলতদিহি গ্রামের বাসিন্দা। পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে রবিউল ইসলামকে স্নাতকোত্তর পাস করিয়াছেন। ছোট ছেলে রোকনুজ্জামান উচ্চমাধ্যমিক পাস করে স্নাতক ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছেন। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়েকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়ে বিয়ে দিয়েছেন। মেজ মেয়ে মাধ্যমিক পাস করেছে। ছোট মেয়ে মাদ্রাসায় পড়ছে।
দুই ছেলেকে নিজের সঙ্গে ব্যবসায় নামিয়েছেন আতিয়ার। ৫৩ বছর বয়সী আতিয়ারের অত্যন্ত কষ্টের জীবন ছিল। বাবা ছিলেন দিনমজুর। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না।
কোনোরকমে খেয়ে না–খেয়ে সংসার চলত। এখন তাঁর সুখের দিন। তিনি বলেন, ‘জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। এরশাদ সরকারের সময়ে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ভালো ব্যবসা হয়েছে। বিআরটিসির গাড়ি চলত। হরতালের মধ্যে ওই গাড়িতে করে ঝুঁকি নিয়ে সবজি নিয়ে যেতাম খুলনায়। ওই সময় অনেক টাকা আয় হয়েছে। এক বছরেই ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা লাভ হয়। ওই টাকা দিয়ে ৬০ শতক জমি কিনেছিলাম। সেখানে বাড়ি করেছি। কিস্তিতে দুটি ট্রাক কিনেছি। ইতিমধ্যে টাকাও পরিশোধ হয়ে গেছে।’
আতিয়ার বলেন, ‘প্রচণ্ড অভাবের সংসার ছিল। বাবা লেখাপড়া করাতে পারেননি। ১০ বছর বয়স থেকেই বাবার সঙ্গে এই বারীনগর সবজির মোকামে পানি টানা, বস্তার মুখ সেলাই, সবজি বাছাইয়ের কাজ করতাম। খেয়ে না–খেয়ে আমাদের দিন কেটেছে। বাবার জায়গাজমি ছিল না। অন্যের জমিতে আমরা থাকতাম। পরে নিজেই কিছু কিছু সবজি কিনে ব্যবসা শুরু করলাম। ২০১০ সাল পর্যন্ত ভালো ব্যবসা হয়েছে। এখন অনেক টাকা বিনিয়োগ করে লাভ হয় কম। তারপরও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। ছেলেদের চোখের আড়াল করতে চাইনি বলে নিজের সঙ্গে ব্যবসায় নামিয়েছি।’
আতিয়ারের ছেলে রবিউল ইসলাম বলেন, ‘যশোর সরকারি সিটি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছি। এসিআই কোম্পানিতে চাকরি হয়েছিল। কিন্তু বাবা চাকরি করতে দেননি। তিনি বলেছেন তাঁর সঙ্গে ব্যবসা করতে। এখন আমি বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করছি। ছোট ভাইও লেখাপড়ার পাশাপাশি সহযোগিতা করছে।’
আতিয়ার বলেন, ‘প্রতিদিন তিনি দু–তিন লাখ টাকার সবজি পাইকারি কেনাবেচা করেন। নতুন কেউ এই ব্যবসায়ে এসে ভালো করা কঠিন। কারণ, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে আমাদের ব্যবসা করতে হচ্ছে। পাইকারি মোকামে খাজনা বাদেও নানা ধরনের টাকা দিতে হয়। আনসিন অনেক খরচ হয়। এসব খরচ কমাতে পারলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সহজ হতো।’