বাহরাইনে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র থেকে সেই বিস্ফোরণ ঘটেছিল

· Prothom Alo

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর ১০ম দিনে মার্কিন মিত্রদেশ বাহরাইনে একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কয়েক ডজন বেসামরিক নাগরিক আহত হন। অনেক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। গবেষকদের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই দিন ভোররাতে খুব সম্ভবত মার্কিন বাহিনীর ছোড়া প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র থেকে এই বিস্ফোরণ ঘটেছিল। এ বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে দেখেছে রয়টার্স।

৯ মার্চের ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় বাহরাইন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ইরানের ড্রোন হামলাকে দায়ী করে আসছে। বাহরাইন জানায়, ওই হামলায় শিশুসহ কমপক্ষে ৩২ জন আহত হন, যাঁদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

Visit biznow.biz for more information.

হামলার দিন মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছিল, একটি ইরানি ড্রোন বাহরাইনের একটি আবাসিক এলাকায় আঘাত হেনেছে।

রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে শনিবার বাহরাইন প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে, রাজধানী মানামার উপকূলীয় সিতরা দ্বীপের মাহাজ্জা এলাকায় ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত ছিল। উল্লেখ্য, এই দ্বীপে একটি তেল শোধনাগার রয়েছে।

বিবৃতিতে বাহরাইন সরকারের একজন মুখপাত্র জানান, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রটি মাঝ আকাশে সফলভাবে একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং এর ফলে বহু প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। মুখপাত্র আরও বলেন, ‘যেসব ক্ষয়ক্ষতি এবং আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর বা ইরানি ড্রোনের সরাসরি মাটিতে আছড়ে পড়ার কারণে ঘটেনি।’

তবে মাহাজ্জার ওই ঘটনায় কোনো ইরানি ড্রোনের ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে বাহরাইন বা যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি।

প্রতিরক্ষা এবং সামরিক শিল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ঘটনা বিরল। তবে একেবারেই যে ঘটে না, এমন নয়। এর আগে ২০০৭ সালে একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কাতারের একটি প্রতিষ্ঠানে আঘাত হেনেছিল।

৯ মার্চ বিস্ফোরিত ক্ষেপণাস্ত্রটি বাহরাইনের নিজস্ব বাহিনী নাকি মার্কিন বাহিনী ছুড়েছে, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বাহরাইন সরকার।

তবে ক্যালিফোর্নিয়ার মিডলবারি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেইর, মাইকেল ডুইটসম্যান ও অধ্যাপক জেফরি লুইস এক বিশ্লেষণে জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্ভবত মাহাজ্জা এলাকা থেকে প্রায় ৪ মাইল (৭ কিলোমিটার) দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি থেকে ছোড়া হয়েছিল। তাঁদের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাঁরা ‘মধ্যম থেকে উচ্চ’ মাত্রার আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন।

এই তিনজন আমেরিকান অস্ত্র ও ওপেন-সোর্স ইন্টেলিজেন্স গবেষকের গবেষণালব্ধ তথ্যটি এখানে প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হলো। তাঁরা মূলত ইন্টারনেটে প্রাপ্ত দৃশ্য এবং বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

রয়টার্স মিডলবারির এই বিশ্লেষণ নিশানা নির্ধারণ-বিষয়ক দুজন বিশেষজ্ঞ এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা বিষয়ক একজন গবেষককে দেখিয়েছে। তাঁরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার মতো কোনো কারণ খুঁজে পাননি।

তাঁদের মধ্যে পেন্টাগনের সাবেক সিনিয়র টার্গেটিং অ্যাডভাইজার ও পলিসি অ্যানালিস্ট ওয়েস ব্রায়ান্ট বলেন, লেইর, ডুইটসম্যান ও লুইসের এই সিদ্ধান্ত ‘অস্বীকার করার সুযোগ নেই বললেই চলে’।

মার্কিন ঘাঁটি থেকেই ছোড়া হয় ক্ষেপণাস্ত্রটি

গবেষক লেইর, ডুইটসম্যান ও লুইস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর ভৌগোলিক অবস্থান বাহরাইনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর রিফফার একটি এলাকায় শনাক্ত করেছেন। রয়টার্সও ওই অবস্থানের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভিডিওটি ৯ মার্চ স্থানীয় সময় রাত দুইটার দিকে অনলাইনে প্রথম পোস্ট করা হয়।

বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, ‘রিফফা এলাকার অবস্থান ও অভিমুখ সন্দেহভাজন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।’

৯ মার্চ সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা একাধিক ভিডিওতে মাহাজ্জা এলাকার ‘ব্লক ৬০২’-এর আবাসিক ভবনগুলোর ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে। গবেষকেরা প্রথমে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্র এবং ভিডিওতে দৃশ্যমান সড়ক ও বাড়ির ঠিকানার সঙ্গে মিলিয়ে এলাকাটি শনাক্ত করেন। রয়টার্স আলাদাভাবে এই ভৌগোলিক অবস্থানের সত্যতা যাচাই করেছে।

প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা

পরবর্তী সময়ে গবেষকেরা ‘ব্লক ৬০২’-এ আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রটির গতিপথ অনুসরণ করে সেটির উৎসস্থল খুঁজে বের করেন। বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্রের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, উৎসস্থলটি ছিল রিফফায় অবস্থিত একটি মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি, যা ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়নের ভিডিওটি ধারণ করার স্থান থেকে আধা মাইলের কম দূরে অবস্থিত।

একটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারিতে রাডার ইউনিট, একটি কমান্ড কেন্দ্র এবং আটটি পর্যন্ত লঞ্চার থাকে, যা যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও প্রতিহত করতে সমন্বিতভাবে কাজ করে। বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে গবেষকেরা নিশ্চিত হয়েছেন, ৯ মার্চের ঘটনার দুই দিন আগেও রিফফার ওই স্থানে পাঁচটি লঞ্চার দৃশ্যমান ছিল।

স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ওই স্থানে প্যাট্রিয়ট ব্যাটারিটি ছিল। অন্যদিকে লকহিড মার্টিনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, বাহরাইন প্রতিরক্ষা বাহিনী ২০২৪ সালের আগে তাদের নিজস্ব প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার শুরু করেনি।

গবেষকেরা জানান, রিফফার ওই স্থাপনায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যাটারিগুলোর সঙ্গে হুবহু মিলে যায় এবং বাহরাইনের নিজস্ব প্যাট্রিয়ট ব্যাটারিগুলো থেকে আলাদা। এসব নিরিখে গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্ভবত মার্কিন বাহিনী ছোড়ে। তারা বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটিগুলোর সুরক্ষায় প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে থাকে।

প্রতিরক্ষা এবং সামরিক শিল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ঘটনা বিরল। তবে একেবারেই যে ঘটে না, এমন নয়। এর আগে ২০০৭ সালে একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কাতারের একটি প্রতিষ্ঠানে আঘাত হেনেছিল।

লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনা বাড়াতে সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। তবে ওই দিন প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটির ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা গবেষক বা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি।

গবেষকেরা বলছেন, দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটির নিচু গতিপথ এবং আগের উৎক্ষেপণের পথ থেকে বিচ্যুতি কোনো সম্ভাব্য সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তবে কোনো লক্ষ্যবস্তু নিশানা করে এটি ওই দিকে ছোড়া হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও তাঁরা উড়িয়ে দেননি।

Read full story at source