নাসিরনগরে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত আরেকজনের মৃত্যু, আটক ২০
· Prothom Alo

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর নির্বাচনী পূর্ববিরোধের জেরে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত মাফাজুল মিয়া নামের আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে সংঘর্ষে তিনজন নিহত হলো। এ ঘটনায় পুলিশ ২০ জনকে আটক করলেও এখনো কোনো মামলা হয়নি।
নিহত মাফাজুল মিয়া (৫০) নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের সিমেরকান্দি আবদুন নূরের ছেলে। তিনি এলাকার একটি পক্ষের নেতৃত্বদানকারী গোয়ালনগর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি কাশেম মিয়ার পক্ষের লোক। গোয়ালনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আজহারুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, বুধবার বিকেলে কাশেম মিয়ার পক্ষের মাফাজুল মিয়ার মৃত্যু হয়েছে।
Visit mwafrika.life for more information.
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার সংঘর্ষের সময় আরও দুজন নিহত হয়েছিলেন। তাঁরা হলেন গোয়ালনগর ইউনিয়নের হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিবুল্লাহ (৪০) ও আক্তার মিয়া (৫০)। হাবিবুর গোয়ালনগর ইউনিয়নের সিমেরকান্দি জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন এবং স্থানীয় হান্নান মিয়ার ছেলে। আক্তার গোয়ালনগর গ্রামের হাছন আলীর ছেলে। তিনি চট্টগ্রামে শ্রমিকের কাজ করতেন। আক্তার মিয়া স্থানীয় রহিম তালুকদারের পক্ষের এবং হাবিবুর কাশেম মিয়ার পক্ষের লোক ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের বিএনপির প্রার্থী ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নানের পক্ষে গোয়ালনগর ইউনিয়নে কাজ করেন বিএনপির সমর্থক রহিম তালুকদারের লোকজন। অন্যদিকে একই ইউনিয়নে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সহসভাপতি কে এম কামরুজ্জামানের পক্ষে কাজ করেন ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি কাশেম মিয়ার লোকজন। রহিম ও কাশেমের মধ্যে নির্বাচনের আগে থেকেই প্রবাসে লোক পাঠানো, আধিপাত্য বিস্তারসহ নানা বিষয় নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। নির্বাচনের সময় বিরোধ আরও তীব্র হয়। ভোটের দিন সকালে গোয়ালনগর উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়ার প্ররোচনার অভিযোগে রহিম তালুকদার পক্ষের সমর্থক জিয়া মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে সেনাবাহিনী। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে ১০ দিনের কারাদণ্ডাদেশ দেন। ১৪ মার্চ কারামুক্ত হয়ে এলাকায় ফেরেন জিয়া।
নাসিরনগরে নির্বাচনী বিরোধে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুজন নিহত, আহত অর্ধশতাধিকপ্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারামুক্ত জিয়ার সন্দেহ ছিল, কাশেম মিয়ার পক্ষের শিশু মিয়া সেনাবাহিনীকে তথ্য দিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সহযোগিতা করেছেন। ওই সন্দেহ থেকে ১৬ মার্চ বিকেলে শিশু মিয়াকে মারধর করার পাশাপাশি তাঁর মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এরপর ১৭ মার্চ সকাল থেকে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ওই দিন বিকেলে উভয় পক্ষের মধ্যে পাঁচ ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ৩০ জন আহত হন।
ওই ঘটনার জেরে গত সোমবার রাত থেকে আবার সংঘর্ষের প্রস্তুতি নেয় উভয় পক্ষ। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, হবিগঞ্জের লাখাই ও মাধবপুর উপজেলাসহ নাসিরনগরের বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে উভয় পক্ষ ভাড়া করে বহিরাগত লোকজন এলাকায় আনে। পাশাপাশি রহিম তালুকদারের পক্ষে গোয়ালনগর ইউনিয়নের গোয়ালনগর, মাছমা ও রামপুর গ্রামের লোকজন জড়ো হন এবং কাশেম মিয়ার পক্ষে গোয়ালনগর গ্রামের একাংশ, স্কুলপাড়া, লালুয়ারটুকু, কদমতলী, দক্ষিণদিয়া, শিবপুরসহ সাত গ্রামের লোকজন জড়ো হন। গতকাল সকাল ৯টার দিকে উভয় পক্ষের লোকজন টেঁটা, বল্লম, এককাইট্টা, ছুরি, চায়নিজ কুড়াল, লাঠিসোঁটা ও দেশি অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান। পরে নাসিরনগর থানা–পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা গোয়ালনগরে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে গতকাল দুজন নিহতের পাশাপাশি অর্ধশতাধিকের বেশি লোক আহত হন। তাঁদের মধ্যে মাফাজুল মিয়া উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ বিকেলে মারা যান।
নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে হাবিবুর রহমানের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অন্যজনের লাশের ময়নাতদন্ত এখনো শেষ হয়নি। মাফাজুল মিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি শুনেছেন। সত্যতা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। সংঘর্ষের ঘটনায় কোনো পক্ষই থানায় কোনো এজাহার জমা দিতে আসেনি। ঘটনাস্থল থেকে সংঘর্ষে জড়িত সন্দেহে ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হলে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে।