অপ্রতিসম যুদ্ধ: ইরানের রণকৌশল থেকে আমাদের যা শিক্ষণীয়
· Prothom Alo

হাজার ক্ষতের মাধ্যমে জয়লাভ বা ‘উইনিং বাই আ থাউজেন্ড কাটস’ ধারণাটি ঐতিহাসিকভাবে চীনের লিংচি তথা ধীর পদ্ধতিতে কেটে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রথা থেকে এসেছে। তবে কৌশলগত ক্ষেত্রে এটি এক শক্তিশালী ধারণায় রূপ নিয়েছে। বিশেষত সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এ দর্শন অত্যন্ত কার্যকর।
এ রণকৌশল শুধু একটি যুদ্ধপদ্ধতি নয়; বরং এটি সময়, মনোবল ও ধৈর্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দীর্ঘমেয়াদি বিজয়ের এক বিশেষ দর্শন। অপ্রতিসম যুদ্ধ বা অ্যাসিমেট্রিক্যাল ওয়ার মূলত এমন এক কৌশল, যেখানে অপেক্ষাকৃত দুর্বল পক্ষ শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে জয়ী হয়। মাও সে–তুংয়ের একটি লেখায় বিষয়টি প্রথম গুরুত্ব পায়। তিনি খুব সহজ এক গল্পের মাধ্যমে এটি বুঝিয়েছিলেন।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
সেই গল্পে শত্রুপক্ষ ছিল সিংহের মতো বিশাল ও শক্তিশালী আর গেরিলা বাহিনী ছিল মৌমাছির মতো ছোট ও তুচ্ছ। সিংহের শক্তির সামনে মৌমাছি বড়ই অসহায়, যার একমাত্র অস্ত্র হলো সামান্য একটি হুল। সিংহের এক থাবায় বড় কোনো হিংস্র প্রাণী কুপোকাত হয়ে গেলেও মৌমাছি এতই ক্ষুদ্র যে সিংহ তাকে নাগালে পায় না। একটি মৌমাছি সিংহকে মারতে না পারলেও অনবরত হুল ফুটিয়ে তাকে ব্যতিব্যস্ত ও কাবু করতে পারে। একসময় হাজারো হুলের দাপটে বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়ে সিংহ সেই জায়গা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। এভাবেই জয় হয় মৌমাছির।
ইরান যুদ্ধে ক্লজউইটজ-তত্ত্ব: ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ঐতিহাসিক ভুলঠিক একইভাবে ইব্রাহিমীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের ডেভিড ও গোলিয়াথের প্রাচীন গল্পটিতে আমরা দেখি, অল্প বয়সী ডেভিড বিশালদেহী দৈত্য গোলিয়াথকে পরাজিত করে। ডেভিডের কাছে কোনো তলোয়ার বা বর্ম ছিল না। সে জানত, গোলিয়াথের কাছে যাওয়া মানেই মৃত্যু, তাই সে দূর থেকে গুলতির পাথর মেরে গোলিয়াথকে পরাস্ত করে।
ইহুদিদের কাছে এই কাহিনি অত্যন্ত পবিত্র। এমনকি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার নাম রাখা হয়েছে ‘ডেভিডস স্লিং’ বা ডেভিডের গুলতি। কিন্তু ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস, আজ কয়েক হাজার বছর পর ইসরায়েল নিজেই এক গোলিয়াথে পরিণত হয়েছে এবং ইরান আবির্ভূত হয়েছে ডেভিড রূপে। আপাতদৃষ্টিতে এই যুদ্ধে ইরানের পরাজয় সময়ের ব্যাপার মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন রূপ নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী দুটি বিমানবাহী জাহাজের স্ট্রাইক গ্রুপে কয়েক শ ফাইটার জেট মোতায়েন থাকে। সাবমেরিন ও ডেস্ট্রয়ারে মজুত থাকে কয়েক হাজার মিসাইল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইসরায়েলের বিশাল বিমানবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। বিপরীতে ইরান দুই দশক ধরে মাটির নিচে মিসাইল ও ড্রোন শহর তৈরি করেছে। তারা জানত যে সম্মুখযুদ্ধে আকাশপথের আক্রমণ ঠেকানো অসম্ভব। গত ২০ দিনে হাজার হাজার বোমা ফেলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের ভূগর্ভস্থ মিসাইল শহর বা আণবিক স্থাপনার ক্ষতি করতে পারেনি। উল্টো ইরান কোনো বাধা ছাড়াই নির্ভুল নিশানায় মিসাইল ছুড়ে প্রতিপক্ষকে রীতিমতো পর্যুদস্ত করছে।
ইরান যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অনেক কিছু শেখার আছে। আমরা যেহেতু বড় আণবিক শক্তিসম্পন্ন প্রতিবেশী দেশের পাশেই অবস্থান করছি, তাই আমাদের প্রচলিত সক্ষমতায় ঘাটতি থাকা স্বাভাবিক।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিয়মিতভাবে দাবি করে যাচ্ছেন যে তাঁরা ইরানের নৌ ও বিমান সক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছেন। সাত হাজারের বেশি আক্রমণ পরিচালনার পরও ইরান নির্বিঘ্নে ড্রোনের ঝাঁক ছুড়ে মারছে। এমনকি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ড্রোন দিয়ে শত্রুর ব্যয়বহুল তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত করা ইরানের নতুন রণকৌশল। তারা সরাসরি লড়াই না করে লেবানন, ইয়েমেন বা ইরাকি প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করছে, যা আধুনিক রিমোট কন্ট্রোল গেরিলা যুদ্ধের নামান্তর। এটি মূলত মাও সে–তুংয়ের সেই মৌমাছি দর্শনের এক আধুনিক ডিজিটাল রূপান্তর। স্বল্প মূল্যের ড্রোন ব্যবহার করে শত্রুর কয়েক মিলিয়ন ডলারের আয়রন ডোম মিসাইল নিষ্ক্রিয় করার মধ্য দিয়ে তারা একটি চরম অপ্রতিসম পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এ যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অনেক কিছু শেখার আছে। আমরা যেহেতু বড় আণবিক শক্তিসম্পন্ন প্রতিবেশী দেশের পাশেই অবস্থান করছি, তাই আমাদের প্রচলিত সক্ষমতায় ঘাটতি থাকা স্বাভাবিক।
এ ক্ষেত্রে মাও সে–তুংয়ের মৌমাছি তত্ত্ব আমাদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। আমাদের প্রতিরক্ষার সনাতন চিন্তাধারা পাল্টে একটি ‘হাইব্রিড প্রতিরক্ষা মডেল’ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর প্রক্সি হুমকির কথা মাথায় রেখে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে স্মার্ট অপ্রতিসম ডকট্রিন।
যিশুখ্রিষ্টের সঙ্গে চেঙ্গিসের তুলনা, নেতানিয়াহুর ঔদ্ধত্যের শেষ কোথায়আমাদের কৌশল হওয়া উচিত সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে শত্রুর ওপর অবাস্তব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়া। প্রচলিত প্রতিরক্ষা স্তরে আমাদের ছোট অথচ চৌকস সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী থাকবে। তবে গুরুত্ব দিতে হবে অপ্রতিসম স্তরে।
একটি শক্তিশালী ড্রোন কমান্ড তৈরি করতে হবে, যার সক্ষমতা থাকবে তথ্য সংগ্রহ ও ড্রোনের ঝাঁক দিয়ে আক্রমণ করার। এ ছাড়া জাহাজবিধ্বংসী মিসাইলসহ কোস্টাল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং উন্নত সাইবার কমান্ডের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
নৌবাহিনীর ক্ষেত্রে বৃহৎ জাহাজের বদলে ‘সি ডিনায়াল’ নীতি অনুসরণ করে ছোট ছোট ফাস্ট মিসাইল ক্র্যাফট ও সাবমেরিন ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। কয়েক স্তরবিশিষ্ট সাশ্রয়ী আকাশ প্রতিরক্ষা এবং আধুনিক বিশেষায়িত গেরিলা বাহিনী গড়ার জন্য দেশের তরুণ জনশক্তিকে যথাযথ সামরিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি।
দামি ফাইটার জেটের চেয়ে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি দিয়ে শত্রুর বিশাল আয়োজন ব্যাহত করার যে পথ ইরান দেখিয়েছে, তা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক শিক্ষা।
আমার এ প্রস্তাব অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অপ্রতুল। তবে এ বিষয়ে আমাদের সবার চিন্তা আর গবেষণার জরুরি প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
তুষার কান্তি চাকমা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)
মতামত লেখকের নিজস্ব