রাজশাহী বিভাগে হামের সংক্রমণ বাড়ছে

· Prothom Alo

রাজশাহীর মোহনপুর থেকে ছয় মাস বয়সী শিশু ইভাকে সামান্য জ্বরের জন্য মা-বাবা গত শুক্রবার রাজশাহী শহরে এনেছিলেন। বাইরের বেসরকারি রোগনির্ণয় কেন্দ্রে কোনো চিকিৎসক না পেয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। শিশুটির বাবা ইলিয়াস হোসেন বলছেন, এর মধ্যে জ্বর তো সারেইনি; বরং গত শনিবার থেকে তাঁর বাচ্চার গায়ে হাম উঠেছে। রোববার সকালে তাঁর বাচ্চাকে হাম ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাচ্চার কোনো উন্নতি নেই, একেবারে নিস্তেজ হয়ে আছে।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

তিন মাস থেকে হামের প্রকোপ দেখা দিলেও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল শনিবার রাত থেকে আইসোলেশন ওয়ার্ড, তথা হাম ওয়ার্ডে রোগী পাঠানো শুরু হয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ল্যাব টেস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আট দিনে রাজশাহী বিভাগে হামের সংক্রমণ বেড়েছে ২ দশমিক ৩০ শতাংশ।

ছড়িয়ে পড়েছে হাম, আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা চার শিশুর তিনজনই মারা গেল

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ল্যাব টেস্টের প্রতিবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজশাহী বিভাগে ২৪৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৭৭ জনকে হাম পজিটিভ পাওয়া গেছে। সংক্রমণের হার দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৩০ শতাংশ। গত ২৬ মার্চ পর্যন্ত এই নমুনা নেওয়া হয়। এর আগে ১৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫৩ জনের নমুনা থেকে ৪৪ জন হাম পজিটিভ রোগী পাওয়া যায়। সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ২৯ শতাংশ। আট দিনে রাজশাহী বিভাগে হামের সংক্রমণ বেড়েছে ২ দশমিক ৩০ শতাংশ।

হাবিবুর রহমান বলেন, সংক্রমণের শুরু থেকে তিনি আলাদা ওয়ার্ডে রেখে হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও পাবনায় হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শিশু ওয়ার্ডে ২০০ শয্যার বিপরীতে এবারের ঈদের আগে ৭০০–এর বেশি রোগী ভর্তি ছিল। এর মধ্যে হামের রোগী ছিল। হাসপাতালেই অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে রোগীর স্বজনদের ভাষ্য। হাম পরিস্থিতি সামাল দিতে গতকাল শনিবার রাত থেকে হাসপাতালের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডকে হামের রোগীদের জন্য ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ ঘোষণা করা হয়েছে। আজ রোববার দুপুর পর্যন্ত এই ওয়ার্ডে ২৬ জন রোগী দেখা গেছে।

রাজশাহী মেডিকেলে ছোঁয়াচে হামের রোগীদের রাখা হচ্ছে অন্য রোগীদের সঙ্গেই 

শনিবার বিকেলে হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দার ৩ নম্বর বেডে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বারোরসিয়া গ্রামের ৯ মাস বয়সী ইয়ানা নামের একটা বাচ্চাকে পাওয়া যায়। তার বাবা মোহাম্মদ ওয়াসিম জানান, তিন দিন আগে যখন হাসপাতালে আসেন, তখন তাঁর বাচ্চার হামের সমস্যা ছিল না। ঠান্ডা–জ্বর, নিউমোনিয়ার সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন। এখানে আসার পর বাচ্চার গায়ে হাম উঠেছে। তিনি বললেন, হাম মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। ওয়ার্ডের নার্সদের কাছ থেকে শুনেছেন। আরও অনেক শিশু এই রোগে এই ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে। রোববার তাঁদের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে দেওয়া হয়েছে। মেয়ের অবস্থা আগের দিনের চেয়ে একটু ভালো। চোখ মেলে তাকাচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে তিন দিন থাকার পর রোববার ১০ মাস বয়সী বাচ্চা ইশরাতকে নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে নাচোলে। শিশুটির বাবা ওয়াসিম বলেন, তাঁর বাচ্চার হাম, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া হয়েছে। রাজশাহীতে আসার পর ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে দিয়েছে। বাচ্চার এখনো কোনো উন্নতি হয়নি।

নতুন ওয়ার্ডে ৮ মাস ১২ দিন বয়সী একটি শিশুকে পাওয়া যায়। তার নাম আহাদ। বাড়ি রাজশাহী নগরের সাধুর মোড় এলাকায়। শিশুটির মা মরিয়ম বেগম জানান, তাঁর বাচ্চাকে নিয়ে অনেক দিন থেকে ভুগছেন। রমজান মাসে বাচ্চাকে এই হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। ১০ দিন থাকার পর ২৫ রমজানে তাঁর বাচ্চাকে ছুটি দেওয়া হয়। তখন ওষুধের সাতটা ডোজ দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে মাত্র তিনটি দিয়ে ছুটি দেওয়া হয়। ঈদের পরদিন ছেলের গায়ে হাম উঠছে। গত বৃহস্পতিবার এসে আবার হাসপাতালে ভর্তি  হয়েছিলেন। শনিবার রাতে সাধারণ ওয়ার্ড থেকে নতুন ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত রোগীদের জন্য করা হয়েছে আইসোলেশন ওয়ার্ড

শিশু এহিয়া বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট। তার মা শাহিদা বেগম জানান, তাঁর বাচ্চার নিউমোনিয়া হয়েছিল এক মাস আগে থেকে। গত রোজার মধ্যে হাসপাতালে ৯ দিন ভর্তি ছিলেন, তারপর ছুটি দিয়েছিল। ঈদের আগে বাড়িতে থাকার সময় বাচ্চার দুয়েকটি  হাম উঠেছিল। বাচ্চাকে ঈদের দিন থেকে আবার হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছিল। হাসপাতালে আসার পর বাচ্চার সারা শরীরে হাম উঠেছে। আজ রোববার সকালে ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে।

এর মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালে হামে আক্রান্ত চার শিশুর জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সুপারিশ করা। এর মধ্যে জহির ও হুমায়রা নামের দুই শিশু শুক্রবার সকাল হতেই মারা যায়। আর হিয়া নামের আরেক শিশু শুক্রবার দিবাগত রাতে মারা যায়। চার শিশুর মধ্যে অবশিষ্ট শিশু জান্নাতুল মাওয়াকে শনিবার বিকেলে আইসিইউতে নেওয়া হয়। আইসিইউ ওয়ার্ডে ইনর্চাজ আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, এক দিনেই জান্নাতুল মাওয়ার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। তাকে রোববারই সাধারণ ওয়ার্ডে দিয়ে দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ড থেকে ১ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত হামের ৮৪ জন রোগীকে আইসিইউ ওয়ার্ডের পাঠানোর জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে আইসিইউ সাপোর্টের পরও ৯ জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর দাবি

রাজশাহীতে শিশুমৃত্যু রোধ, সহজলভ্য ও সুচিকিৎসা নিশ্চিতে অবিলম্বে বিশেষায়িত রাজশাহী শিশু হাসপাতাল চালু এবং অতি সংক্রামক রোগ হাম প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, ‘স্বাধীন ও স্থায়ী স্বাস্থ্য কমিশন’ গঠনসহ পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের যুব ও উন্নয়ন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহের বৃহৎ ঐক্য বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও রাজশাহীর সিভিল সার্জন এস আই এম রাজিউল করিম বরাবর পৃথক স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। আজ রোববার দুপুর ১২টায় রাজশাহীর সিভিল সার্জনের পক্ষে স্মারকলিপি গ্রহণ করেন ডেপুটি সিভিল সার্জন মোসা. মাহবুবা খাতুন।

স্মারকলিপির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার, পরিচালক (স্বাস্থ্য), রাজশাহী, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে।

স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, চিকিৎসা অন্যতম একটি মৌলিক অধিকার। তারপরও দেশব্যাপী সহজলভ্য ও সুচিকিৎসার অভাবে প্রতিনিয়ত প্রচুর মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। এভাবে শিশুরাও অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। আইসিইউ সেবার অপ্রতুলতার কারণে ২২ মার্চ পর্যন্ত ১১ দিনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা ৩৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আইসিইউ সেবা পেলে এই শিশুগুলো বেঁচেও যেতে পারত।

স্মারকলিপির দাবিগুলো হলো রাজশাহীর বিশেষায়িত ২০০ শয্যার রাজশাহী শিশু হাসপাতালটিতে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা চালু করতে হবে; রাজশাহীসহ দেশব্যাপী অতি সংক্রমক রোগ হামের বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে; অসুস্থদের সহজলভ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে; রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে; সব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা, যেমন চিকিৎসকের অবহেলা-অনুপস্থিতি, দালালের দৌরাত্ম্য, রোগীদের ভোগান্তি নিরসন করতে হবে; রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন করতে হবে; আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্তকরণসহ আইসিইউ কমপ্লেক্সের অনুমোদন ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ১০ শতাংশের জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; একটি স্বাধীন ও স্থায়ী স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করাসহ স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।

Read full story at source