ইসলামে হাসি-ঠাট্টা ও কৌতুকের রূপরেখা

· Prothom Alo

অনেক সময় ধর্মীয় গাম্ভীর্যের ভুল ব্যাখ্যায় মনে করা হয় যে ধর্মপ্রাণ মানেই সর্বদা মুখ ভার করে থাকা বা রসহীন জীবন যাপন করা।

Visit umafrika.club for more information.

কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য হলো এটি মানুষের প্রাকৃতিক চাহিদাকে রুদ্ধ করে না, বরং তাকে একটি মার্জিত ও সুন্দর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে।

হাসি মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্য; যা অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে নেই। কারণ হাসি আসে কোনো পরিস্থিতি বা বক্তব্যের গভীরে থাকা কৌতুকবোধ অনুধাবনের পর।

খ্যাতনামা ইসলামি চিন্তাবিদ ড. ইউসুফ আল-কারাজাভির মতে, মুমিনের ব্যক্তিত্ব হওয়া উচিত আশাবাদী ও হাস্যোজ্জ্বল, বিমর্ষ বা অন্ধকারাচ্ছন্ন নয়।

একবার এক বৃদ্ধা এসে বললেন, “আল্লাহর রাসুল, দোয়া করুন আমি যেন জান্নাতে যেতে পারি।” তিনি হেসে বললেন, “কোনো বৃদ্ধা তো জান্নাতে যাবে না!”

মহানবীর হাস্যরস

আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ মহানবী (সা.)। তিনি সীমাহীন দুশ্চিন্তা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মাঝেও সাহাবিদের সঙ্গে কৌতুক করতেন। তবে তাঁর কৌতুকের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি রসিকতা করলেও কখনো সত্যের বাইরে কিছু বলতেন না।

জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন, নবীজি আমাদের সঙ্গে দুনিয়াদারির আলাপে যেমন শামিল হতেন, তেমনি আখেরাত বা খাবারের আলোচনায়ও অংশ নিতেন। (তাবারানি, মাজমাউজ জাওয়াইদ, ৯/১৭)

তাঁর কৌতুক ছিল বুদ্ধিদীপ্ত ও মার্জিত। একবার এক বৃদ্ধা এসে বললেন, “আল্লাহর রাসুল, দোয়া করুন আমি যেন জান্নাতে যেতে পারি।” তিনি হেসে বললেন, “কোনো বৃদ্ধা তো জান্নাতে যাবে না!”

সামাজিক মাধ্যমে অন্যের সম্মানহানি করার পরিণতি

বৃদ্ধা কেঁদে ফেললেন। তখন তিনি বুঝিয়ে বললেন, জান্নাতে যাওয়ার সময় কেউ বৃদ্ধা থাকবে না, বরং সবাই তরুণী হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯)।

আরেকবার এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে সফরের জন্য একটি উট চাইলেন। তিনি বললেন, “আমি তোমাকে একটি উটের বাচ্চার ওপর সওয়ার করাব।”

লোকটি অবাক হয়ে বলল, “উটের বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব?” তিনি হেসে বললেন, “দুনিয়ার সব উটই তো কোনো না কোনো উটের বাচ্চা!” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৯৮)

কৌতুকের ৫ শর্ত

আধুনিক যুগে আমরা ‘ক্যারিকাচার’ বা ব্যঙ্গচিত্র দেখি, যেখানে একটি ছবির মাধ্যমেই গভীর কোনো বার্তা দেওয়া হয়। ধাঁধা, লোককাহিনি বা প্রচলিত প্রবাদ—সবই মানুষের চিত্তবিনোদনের অংশ।

সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১১মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।

ইসলাম এই সব মাধ্যমকেই স্বাগত জানায়, যতক্ষণ না তা শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করে। হাসি-ঠাট্টা জায়েজ হওয়ার জন্য ইসলামি শরিয়ত কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত ও সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে:

১. মিথ্যা পরিহার: কেবল মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা গল্প বলা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, “ধ্বংস সেই ব্যক্তির জন্য, যে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৯০)

২. কাউকে ছোট না করা: রসিকতার ছলে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা ব্যঙ্গ করা যাবে না। আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১১)

সাংস্কৃতিক সংলাপের ইসলামি ইতিহাস

আয়েশা (রা.) একবার নবীজির অন্য স্ত্রীর খাটো হওয়া নিয়ে বললে নবীজি তাঁকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তাঁর এই কথাটি যদি সমুদ্রের পানিতে মেশানো হতো, তবে সমুদ্রের পানির রং বদলে যেত। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৭৫)

৩. আতঙ্ক সৃষ্টি না করা: মজা করার ছলে কাউকে ভয় দেখানো বা কারো জিনিস লুকিয়ে রাখা জায়েজ নয়। হাদিসে এসেছে, “কোনো মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমকে আতঙ্কিত করা বৈধ নয়।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০০৪)

৪. গাম্ভীর্যের স্থানে কৌতুক নয়: যেখানে গুরুত্ব ও গাম্ভীর্য প্রয়োজন, সেখানে ঠাট্টা করা অনুচিত। যেমন ইবাদতের সময় বা কারো শোকের সময় হাসাহাসি করা প্রজ্ঞার পরিপন্থী। কোরআনে মুশরিকদের সমালোচনা করা হয়েছে এই কারণে যে তারা কোরআন শুনে ক্রন্দন না করে উপহাস করত। (সুরা নাজম, আয়াত: ৫৯-৬১)

খাবারে লবণ যেমন অপরিহার্য কিন্তু অতিরিক্ত হলে তা খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়, কৌতুকও তেমন। অতি মাত্রায় হাসাহাসি মানুষের ব্যক্তিত্ব নষ্ট করে এবং অন্তরকে মৃত করে দেয়।

৫. পরিমিতিবোধ: কৌতুক হবে খাবারের লবণের মতো। খাবারে লবণ যেমন অপরিহার্য কিন্তু অতিরিক্ত হলে তা খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়, কৌতুকও তেমন। অতি মাত্রায় হাসাহাসি মানুষের ব্যক্তিত্ব নষ্ট করে এবং অন্তরকে মৃত করে দেয়।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “বেশি হেসো না, কারণ অতিরিক্ত হাসি অন্তরকে মৃত করে ফেলে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১৯৩)

শেষ কথা

হজরত আলি (রা.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে: “কথার মধ্যে কৌতুক ততটুকুই দাও, যতটুকু খাবারে লবণ দেওয়া হয়।” এটিই হলো ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা।

ইসলাম চায় মানুষ প্রফুল্ল থাকুক, তাদের সামাজিক সম্পর্কগুলো আনন্দময় হোক। কিন্তু সেই আনন্দ যেন কারো চোখের জল বা কারো সম্মানে আঘাতের কারণ না হয়।

ইমান: শক্তি ও শান্তির রহস্য

Read full story at source