কারুনের ফেতনা থেকে সংগঠন গড়ার শিক্ষা

· Prothom Alo

কোরআনে বর্ণিত কারুনের কাহিনীটি কেবল অঢেল ঐশ্বর্য আর ভূমিধসের কোনো সাধারণ উপাখ্যান নয়; বরং এটি একটি সূক্ষ্ম শিক্ষামূলক পাঠ। এই গল্পের মূল শিক্ষা হলো—কীভাবে অভ্যন্তরীণ ‘ফেতনা’ বা বিভ্রান্তি একটি আদর্শবাদী দলের পতন ঘটাতে পারে।

বাহ্যিক শক্তির চেয়ে অনেক সময় ভেতরের বিচ্যুতি বেশি ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়।

Visit afnews.co.za for more information.

ভেতর থেকে যখন আঘাত আসে

কোরআন এই গল্পের সূচনাতেই আমাদের একটি ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই কারুন ছিল মুসার কওমেরই একজন, কিন্তু সে তাদের ওপর জুলুম করেছিল।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৬) 

অর্থাৎ কারুন কোনো বাইরের শত্রু ছিল না, সে ছিল খোদ ‘সংগঠনে’র ভেতরের মানুষ। সে দলের ভাষা জানত, পরিচয়ে ছিল ঘনিষ্ঠ, অথচ তার আঘাতটিই ছিল সবচেয়ে মারাত্মক।

এই গল্পের সংলাপে কোথাও ফেরাউন বা মুসার সরাসরি উপস্থিতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে কারুনের সঙ্গে তার স্বজাতির বিতর্ক।

সাকিফ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

‘আমার জ্ঞান’ ও স্বচ্ছতার অনুপস্থিতি

কারুনকে যখন তার স্বজাতি নসিহত করল যে “আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে আখেরাত গড়ে নাও এবং দুনিয়ার অংশও ভুলে যেও না” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৭), তখন সে এক অহংকারী উত্তর দিয়েছিল। বলেছিল, “এসব তো আমি আমার নিজস্ব জ্ঞান ও দক্ষতার মাধ্যমেই পেয়েছি।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৮)

একটি বাক্যই মূলত যেকোনো সংগঠনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে গলা টিপে হত্যা করে। যখন সম্পদ বা সাফল্যকে আল্লাহর দান হিসেবে না দেখে ব্যক্তির নিজস্ব কারিশমা হিসেবে দেখা হয়, তখন সেই ব্যক্তি নিজেকে সব ধরনের সমালোচনা, পরামর্শ ও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে।

এভাবেই দলের ভেতরে এমন এক শ্রেণির জন্ম হয় যারা নিজেদের ‘অস্পর্শী’ মনে করে।

আদর্শ ধ্বংসের ত্রয়ী শক্তি

কোরআনের বিভিন্ন স্থানে ফেরাউন, হামান ও কারুনের নাম একত্রে এসেছে। এটি মূলত একটি অশুভ চক্রের প্রতীক, যারা আদর্শকে ভেতর ও বাইরে থেকে ধ্বংস করে:

  • ফেরাউন: ক্ষমতার দাপট ও জুলুমের প্রতীক, যা মানুষকে আতঙ্কিত রাখে।

  • হামান: প্রচারণা ও চটকদার আবহের কারিগর, যে মিথ্যার চাকচিক্য দিয়ে সত্যকে আড়াল করে।

  • কারুন: অর্থনৈতিক অনুপ্রবেশকারী, যে অর্থের বিনিময়ে আনুগত্য কেনে এবং ভেতর থেকে ঐক্য বিনষ্ট করে।

কারুনের ফেতনাটি ছিল বহুমুখী। বর্ণনা অনুযায়ী সে ছিল মুসার নিকটাত্মীয় (চাচাতো ভাই) এবং অত্যন্ত সুকণ্ঠী কারী। অর্থাৎ তার মধ্যে ছিল ধর্মীয় পরিচিতি এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের এক বিপজ্জনক সংমিশ্রণ।

যখন ‘ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব’ ও ‘অর্থদাতা’র পরিচয় এক হয়ে যায়, তখন গঠনমূলক সমালোচনাকেও ‘সম্মানিত ব্যক্তির অবমাননা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। ফলে শুরা বা পরামর্শ সভা হয়ে যায় স্রেফ আলংকারিক।

শত্রুর ঘরে নবীর পালন ও কারুনের ধ্বংসের গল্প

মোহ বনাম প্রজ্ঞা

কারুন যখন তার জাঁকজমক নিয়ে বের হলো, তখন দলের ভেতরে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হলো। একদল তার ঐশ্বর্য দেখে মোহিত হয়ে বলতে লাগল, “হায়, কারুন যা পেয়েছে আমাদের যদি তেমন থাকত!” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৯)

অন্যদিকে প্রজ্ঞাবানরা বলেছিলেন, “ধিক তোমাদের, যারা ইমান আনে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৮০)।

এটিই হলো আদর্শিক সংগঠনের জন্য বড় পরীক্ষা—বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে মানদণ্ড বদলে ফেলা নাকি সত্যের ওপর অবিচল থাকা।

শেষ কথা

কারুনের ফেতনা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে এবং আদর্শের মানদণ্ড যখন অর্থের মোহে ঝাপসা হয়ে যায়, তখনই আল্লাহর কুদরত সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, “অতঃপর আমি তাকে ও তার প্রাসাদকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিলাম।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৮১)

এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের গড়া জবাবদিহি যখন ব্যর্থ হয়, তখন খোদায়ী বিচারই সত্য-মিথ্যার পার্থক্য পরিষ্কার করে দেয়।

কোনো আদর্শবাদী সংগঠন যদি ভেতর থেকে অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে যায়, তবে তার পতন অনিবার্য। সুতরাং অর্থের চেয়েও বড় মানদণ্ড হলো তাকওয়া এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা।

দুনিয়াকে দেখার নববি দৃষ্টিভঙ্গি

Read full story at source