তরমুজ ফল নাকি সবজি
· Prothom Alo

গ্রীষ্মের দুপুরে এক ফালি রসালো তরমুজের জুড়ি মেলা ভার! প্রচণ্ড গরমে এক ফালি তরমুজ যেন শরীরে প্রাণ ফিরিয়ে আনে। আমাদের কাছে এটি স্রেফ একটি ফল হলেও উদ্ভিদবিজ্ঞানের পাতায় তরমুজ নিয়ে বেশ মজার পরিচয়-বিভ্রাট আছে। শসা ও কুমড়োর সঙ্গে একই গোত্রের এই তরমুজ কি আসলে ফল, নাকি সবজি? উত্তরটা কিন্তু বেশ চমকপ্রদ।
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
উদ্ভিদবিজ্ঞানের মতে, গাছের যে অংশটি তার ফুলের গর্ভাশয় থেকে জন্মায় এবং যার ভেতরে বীজ সংরক্ষিত থাকে, তাকেই ফল বলে। সহজ করে বললে, ফলের মূল কাজ হলো তার বীজের দেখভাল করা এবং একসময় সেই বীজ ছড়িয়ে দিয়ে গাছের বংশধারা টিকিয়ে রাখা। আপেল, নাশপাতি কিংবা আমের শাঁসের ভেতর বীজ থাকে বলেই এরা নির্ভেজাল ফল। এমনকি বেগুন, শসা, কুমড়ো কিংবা টমেটোকে যে আমরা লবণ দিয়ে তরকারি হিসেবে রান্না করে খাই, এগুলোও কিন্তু উদ্ভিদবিজ্ঞানের চোখে ফল! কারণ, এদের প্রত্যেকের ভেতরেই বীজ থাকে।
যে টমেটোকে আমরা লবণ দিয়ে তরকারি হিসেবে রান্না করে খাই, এটি আসলে উদ্ভিদবিজ্ঞানের চোখে একটি ফল!সাধারণত রান্নার জগতে স্বাদ ও ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ফল ও সবজিকে আলাদা করা হয়। সাধারণত যেগুলো মিষ্টি স্বাদের, সেগুলো ফল হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে যেগুলো ঝাল বা নোনতা পদ হিসেবে রান্না হয়, সেগুলো সবজি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বিজ্ঞানের হিসাবটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তাহলে সবজি কোনগুলো? বিজ্ঞানের ভাষায়, ফলের অংশটুকু বাদ দিয়ে গাছের বাকি সব খাওয়ার যোগ্য অংশই সবজি। এটি গাছের মূল, কাণ্ড বা পাতা হতে পারে। এই অংশগুলোর কাজ বংশবৃদ্ধি নয়, বরং গাছের খাদ্য সঞ্চয় করা বা কাঠামো ধরে রাখা। তাই এদের মধ্যে আপনি কখনোই প্রাকৃতিক উপায়ে লুকানো কোনো বীজ খুঁজে পাবেন না।
তরমুজ খাওয়ার যত উপকারিতাউদ্ভিদবিজ্ঞানের মতে, গাছের যে অংশটি তার ফুলের গর্ভাশয় থেকে জন্মায় এবং যার ভেতরে বীজ সংরক্ষিত থাকে, তাকেই ফল বলে।
উদ্ভিদবিজ্ঞানের চোখে তরমুজ
উদ্ভিদবিজ্ঞানের নিয়ম খুব পরিষ্কার, যা ফুল থেকে জন্মায় এবং ভেতরে বীজ থাকে, তা-ই ফল। সেই হিসেবে তরমুজ নির্ঘাত একটি ফল। কিন্তু এখানেও একটি টুইস্ট আছে। তরমুজ আসলে একধরনের বিশেষায়িত বেরি, যাকে বিজ্ঞানীরা পিপো বলেন। এর বৈশিষ্ট্য হলো, বাইরে একটি শক্ত খোসা থাকে, ভেতরে রসালো শাঁস ও সারা ফলজুড়ে ছড়িয়ে থাকে বীজ। মজার ব্যাপার হলো, তরমুজের নিকটাত্মীয় মেলন বা বাঙ্গির বীজের গহ্বর থাকে ফলের ঠিক মাঝখানে। কিন্তু তরমুজ তার বীজ ছড়িয়ে রাখে পুরো শরীরজুড়ে।
তরমুজ চাষের পদ্ধতি মূলত সবজি চাষেরই প্রধান বৈশিষ্ট্যতরমুজ যখন সবজি
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও অনেক দেশে তরমুজকে সবজি হিসেবেই গণ্য করা হয়। চীনের কথাই ধরুন, সেখানে তরমুজের বাইরের শক্ত খোসা ফেলে না দিয়ে রান্না করে বা আচার বানিয়ে রীতিমতো সবজির মতো খাওয়া হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্য ২০০৭ সালে তরমুজকে আনুষ্ঠানিকভাবে সবজি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে! এর মূল কারণ, তরমুজ চাষের পদ্ধতি। এটি শসা বা কুমড়োর মতো একই পদ্ধতিতে চাষ করা হয় এবং ফসল তোলার পর মাঠ থেকে গাছ পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়। এগুলো মূলত সবজি চাষেরই প্রধান বৈশিষ্ট্য। এছাড়া তরমুজ যে কিউকারবিটেসি গোত্রের সদস্য, সেই গোত্রের প্রায় সব সদস্যই সবজি হিসেবে পরিচিত। যেমন লাউ, কুমড়ো, শসা বা ঝিঙে। তাই কৃষিতাত্ত্বিক দিক থেকেও এটিকে সবজির দলেই ধরা যায়।
তরমুজ কেন লাল হয়তরমুজ আসলে একধরনের বিশেষায়িত বেরি, যাকে বিজ্ঞানীরা পিপো বলেন। এর বৈশিষ্ট্য হলো, বাইরে একটি শক্ত খোসা থাকে, ভেতরে রসালো শাঁস ও সারা ফলজুড়ে ছড়িয়ে থাকে বীজ।
পুষ্টির খনি
অনেকে ভাবেন তরমুজ মানেই কেবল মিষ্টি পানি। আসলে এতে প্রায় ৯২ শতাংশ পানি থাকলেও এর পুষ্টিগুণ মোটেও নগণ্য নয়। এটি ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি-এর চমৎকার উৎস। এতে থাকা লাইকোপেন আমাদের হৃৎপিণ্ড ও ত্বককে সুরক্ষা দেয়। এক কাপ তরমুজ থেকে আপনি পাবেন বায়োটিন, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড এবং ভিটামিন বি-১ ও বি-৬ এর মতো প্রয়োজনীয় উপাদান। তরমুজের বীজও কিন্তু ফেলে দেওয়ার মতো নয়! এতে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। প্রতি কাপ ফালি করা তরমুজে ক্যালরির পরিমাণ ৫০-এরও কম। তাই ওজন কমাতে চাইলেও এটি দারুণ সঙ্গী।
তরমুজ ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি-এর চমৎকার উৎসতরমুজের বহুমুখী ব্যবহার
রাশিয়া থেকে দক্ষিণ আমেরিকা—পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তরমুজ খাওয়ার ধরন ভিন্ন। কেউ এটি সালাদে ব্যবহার করেন, কেউ ককটেল বানান, আবার কেউ এর খোসা দিয়ে তৈরি করেন মুখরোচক আচার। এর খোসা এবং শাঁসও কিন্তু খাওয়া যায় এবং খাওয়া হয়। যেহেতু তরমুজে প্রাকৃতিকভাবেই চিনি থাকে, তাই ডায়াবেটিস রোগীদের এটি খাওয়ার সময় পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। তরমুজ এমন একটি শস্য, যা একই সঙ্গে বেরি, ফল এবং সবজির বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এর পরিচয় আপনি যে নামেই দিন না কেন, এর রসালো স্বাদ ও পুষ্টিতে কোনো কমতি নেই।
লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: এ-জেড অ্যানিম্যালসতরমুজ লাল হয় কেন