বিরোধীদের নিশ্চিহ্নের চেষ্টা কোরো না, এই পরামর্শ কোনো দল শোনেনি: রওনক জাহান
· Prothom Alo

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো রওনক জাহান বলেছেন, ‘দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলকে বহু বছর আগে থেকে বলেছি, তোমরা পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় যেতে পারো, কিন্তু দয়া করে একে অপরকে নির্মূল করার চেষ্টা কোরো না। কিন্তু এত বছরেও তারা এই পরামর্শ শোনেনি।’
গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের একটি অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে রওনক জাহান এ কথা বলেন। তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ছিল গতকাল।
Visit mwafrika.life for more information.
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্তে স্থিতিশীলতা, শৃঙ্খলা ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মির্জা এম হাসান ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন।
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, ‘নাগরিকদের সাধারণ ভাবনা হচ্ছে দেশের রাজনীতিবিদেরা একটা র্যাশনাল বা যুক্তি মেনে কাজ করবেন। কিন্তু গত ৫৪ বছরের ইতিহাসে দেখেছি, আমরা সিভিল সোসাইটি (নাগরিক সমাজ) যেটাকে ভাবি র্যাশনাল (যৌক্তিক), রাজনীতিবিদেরা সে রকমটা ভাবেন না ও কাজ করেন না। তাঁদের (রাজনীতিবিদ) একটা র্যাশনালিটি আছে, তাদের একটা যুক্তি আছে, তারা সেটা দিয়েই কাজ করে।’
রওনক জাহান বলেন, ‘আমরা বহু বছর ধরে, বিশেষত ১৯৯০ সালের পর থেকে দেশের দুইটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে বলে আসছি—তোমরা পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় যেতে পারো, কিন্তু দয়া করে একে অপরকে নির্মূল করার চেষ্টা কোরো না। কিন্তু এত বছরেও তারা এই কথা শোনেনি। এখন ভবিষ্যতে তারা এটি মানবে, সেটি কীভাবে ধারণা করা যায়?’
‘টেকসই স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন’
অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, নতুন সরকারের কাছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই হবে প্রথম অগ্রাধিকার। এর সঙ্গে সঙ্গে সরকার চেষ্টা করবে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে। তারপর সে যাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে। বড় আকারে প্রবৃদ্ধি তথা কর্মসংস্থান বাড়াতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ লাগবে, সেটা সরকার এই মুহূর্তে করবে না। বরং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুসারে সামাজিক সুরক্ষাসেবাগুলো তারা দেবে। তবে পরিধি হয়তো খুব বাড়াবে না।
কাজী মারুফুল ইসলাম মনে করেন, বিরোধী দলও সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার বিষয়টি মানবে। তিনি বলেন, এটাতে তাদের (বিরোধী দল) লাভ আছে। বিরোধী দলের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন রাজনীতির বাইরে ছিল। তাদের গ্রহণযোগ্যতার সংকট রয়েছে; দল গোছানোর বিষয় আছে। একটা স্বাভাবিক পরিবেশ থাকলে তারা কাজগুলো করতে পারবে। এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) দুর্বলতা হলো তাদের তৃণমূল সংগঠন সেভাবে নেই। ফলে তারাও স্থিতিশীলতা চাইবে।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে সুযোগ দেওয়া ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা স্থায়ী হবে, সেই প্রশ্ন তোলেন রওনক জাহান। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা গত ১৫ বছরে একধরনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করেছিলেন। এই স্থিতিশীলতা এনেছিলেন সব রাজনৈতিক বিরোধীদের বাদ দিয়ে, কিন্তু সেটি স্থায়ী হয়নি। বর্তমানেও যদি বিরোধী দলের সংজ্ঞা শুধু জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপি হয় এবং আওয়ামী লীগের জন্য কোনো রাজনৈতিক জায়গা না থাকে; তাহলে সেই স্থিতিশীলতা কত দিন টেকসই করা যাবে, সেটি একটি প্রশ্ন।
বিচার ও জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, ‘দেশে ট্রানজিশনাল জাস্টিসের (অতীত অন্যায়ের বিচার) কথা আমরা বহু বছর আগে থেকেই বলেছি। কিন্তু সেটা আমরা শুরু করতে পারিনি। আমার মনে পড়ে, ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরেও আমরা এটি নিয়ে কথা বলেছিলাম। তখন ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে কথা চলছিল। সে সময় ব্যারিস্টার সারা হোসেন প্রস্তাব করেছিল যে আমরা ট্রানজিশনাল জাস্টিস এবং ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন কেন শুরু করছি না। কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত মানা হয়নি। এখনো আওয়ামী লীগ যদি অপরাধ স্বীকার করে ও ক্ষমা চায়, তাহলে ট্রানজিশনাল জাস্টিস করা যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগের কেউ সেটি না করলে এই পদ্ধতি তো কাজ করবে না। এখানে আরেকটা বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই ট্রানজিশনাল জাস্টিস ধারণা শুধু কি আওয়ামী লীগের জন্যই প্রযোজ্য, নাকি অন্য যেসব দল আছে, তাদের জন্যও প্রযোজ্য হবে।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, জুলাই গণহত্যার পর গত ১৮ মাসে যত গ্রেপ্তার হয়েছেন, তার কিছু যৌক্তিক হতে পারে; কিন্তু অনেকগুলোই যৌক্তিক নয়। এ সময়ে গ্রেপ্তার ও আটক রাখা নিয়ে এখন একটা নতুন ভিকটিম ন্যারেটিভ (ভুক্তভোগী বয়ান) তৈরি হয়েছে। এই ন্যারেটিভ আরেক ধরনের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন, অযৌক্তিক বা ইচ্ছামতো আটককে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তিরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন; জেলখানায় থাকতে থাকতে বেশ কয়েকজন মারা গেছেন।
সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার ও জামিন নিয়ে কথা বলেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি হঠাৎ রহস্যজনকভাবে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হলেন, আবার জামিন পেলেন। এটি কীভাবে হলো, কোন যোগাযোগে, কোন রাজনৈতিক ফায়দায় এটি হলো, তা নিয়ে সবার মনে কিছু প্রশ্ন জাগছে। প্রশ্ন জাগছে উনি ছাড়া পাচ্ছেন, অন্যরা কেন ছাড়া পাচ্ছেন না।
সারা হোসেন আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মানবতাবিরোধী অপরাধ যা-ই হোক না কেন, জবাবদিহির ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত হয় না।’
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মির্জা এম হাসান বলেন, জুলাইয়ের পর প্রত্যাশা ছিল নতুন সরকার যৌক্তিকভাবে, কৌশলগতভাবে দেশ পরিচালনা করবে। কিন্তু সেটি ঘটেনি। বরং আওয়ামী লীগের মতো একই পথে হাঁটছে বিএনপি। রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ হাসিনার সিংহরা এখন বিএনপির সিংহে পরিণত হয়েছে।
মির্জা এম হাসান বলেন, দেশে গত ৫৪ বছরে আইনের শাসন দেখা যায়নি। জুলাই সনদের অন্যতম মূল বক্তব্য ছিল, প্রচলিত উদারপন্থী ক্ষমতার ভারসাম্যব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করছে না। তাই একাধিক ও বহুমাত্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে বিএনপির অবস্থানে মনে হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত বহুমাত্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না।