সুন্দরবনে তখন ভয় ছিল ‘বাঘ মামা’র, এখন ঈমান আলী কাকে ভয় পান

· Prothom Alo

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরার চাঁদনীমুখা গ্রামে ঈমান আলী শেখের বাড়ি। উঠান থেকেই শোনা যায়, খোলপেটুয়া নদীর ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। নদীর পাশেই সুন্দরবন। জীবন–জীবিকার প্রয়োজনে তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন সুন্দরবনে। সেখানে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। নদীর ঢেউয়ের শব্দে ঈমান আলী সুন্দরবনে যাওয়ার আহ্বান শুনতে পান। কিন্তু ভয়ে সেখানে যেতে পারেন না।

Visit bettingx.club for more information.

দুপুরের কাঠফাটা রোদ্দুর গায়ে মেখে কথা হচ্ছিল ঈমান আলীর সঙ্গে। বাড়ির আঙিনায় বসে তিনি এসব কথা বলছিলেন। ভয়ের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাঘে আমার মায়ের পেটের ভাই আর চাচারে খাইছে। আমাকেও ধরছিল, লড়াই কুরে ফিরা আইছি। কিন্তু এখন জঙ্গলে যাতি ভয়—বাঘের জন্যি না, ডাকাতের জন্যি।’

একটানা কথাগুলো বলার সময় ৬৬ বছর বয়সী এই বনজীবীর কণ্ঠে ছিল না কোনো নাটকীয়তা। তবে স্পষ্ট হচ্ছিল তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভার।

শৈশবেই সুন্দরবনের সঙ্গে ঈমান আলী শেখের পরিচয়। বয়স তখন ১০ বা ১২ বছর। বাবা আবদুল মালেক শেখের হাত ধরে প্রথমবার সুন্দরবনে গিয়েছিলেন। বাবা তাঁকে শিখিয়েছিলেন বনের ভাষা—কোথাও হরিণ হঠাৎ দৌড়ালে বুঝতে হবে আশপাশে বাঘ আছে, বানর চিৎকার করলে সতর্ক হতে হবে, পাখির অস্থিরতা মানেই বিপদের আভাস। এই সবই ছিল টিকে থাকার কৌশল। ঈমান আলীর ভাষ্য, ‘তখন ভয় ছিল শুধু “বাঘ মামা”। এ ছাড়া আর কোনো ভয় ছিল না।’

মধুর মৌসুম এলেই সুন্দরবনের গভীরে ঢুকতে হতো। সেই সময়েই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি। প্রতিবছরই ২০-২৫ জন মৌয়াল বাঘের আক্রমণে পড়তেন—এই ছিল বাস্তবতা। তবু থেমে থাকার সুযোগ ছিল না। কারণ, বনের ওপরই নির্ভর করে তাঁদের সংসার-জীবন।

প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা বলতে গিয়ে ঈমান আলীর চোখে ভেসে ওঠে গভীর কোনো শোকের ছায়া। রায়মঙ্গল নদীর গাড়ার বাওনে মধু কাটতে গিয়েছিলেন তাঁর ছোট ভাই রুহুল। সেখানে তাঁকে বাঘে খেয়েছে। এর ঠিক পরের বছর তালপাটির বনে একই পরিণতি হয় চাচা তালেব শেখের। এসব বলতে গিয়ে গলা ধরে আসছিল ঈমান আলীর।

২০১১ সালের এপ্রিল। সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে পাস নিয়ে মধু সংগ্রহে যান ঈমান আলী। সঙ্গে ছিলেন চাচা দাউদ শেখ, ছেলে রব্বানী ও ভাইপো হারুন। সেখানে কয়েক দিনেই ভালো মধু পেয়েছিলেন তাঁরা। সেদিন সকাল আটটার দিকে কাঠেশ্বর নদীর মুল্লির কালি খালের পাশে সবাই মধুর চাক খুঁজতে ব্যস্ত। মুহূর্তেই সবকিছু বদলে গেল।

২০১১ সালের এপ্রিল। সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে পাস নিয়ে মধু সংগ্রহে যান ঈমান আলী। সঙ্গে ছিলেন চাচা দাউদ শেখ, ছেলে রব্বানী ও ভাইপো হারুন। সেখানে কয়েক দিনেই ভালো মধু পেয়েছিলেন তাঁরা। সেদিন সকাল আটটার দিকে কাঠেশ্বর নদীর মুল্লির কালি খালের পাশে সবাই মধুর চাক খুঁজতে ব্যস্ত। মুহূর্তেই সবকিছু বদলে গেল। ঈমান আলীর ভাষ্য, ‘একটা বাঘ হঠাৎ আমার ওপর ঝাঁপ দেয়।’

হকচকিয়ে গিয়ে বাঘের গায়ে আঘাত করেন হাতে থাকা দা দিয়ে। কিন্তু মুহূর্তেই পড়ে যায় সেটি। এবার শুরু হয় খালি হাতে লড়াই—মানুষ আর বাঘের অসম এক যুদ্ধ। বলে যাচ্ছিলেন ঈমান আলী, ‘ভয়ে দমে যাইনি। আল্লাহ আল্লাহ করে বাঘরে জাপটাই ধইরা মাথাডা গাছের সঙ্গে ধাক্কা দিতেছিলাম।’

এই লড়াইয়ে বাঘের দাঁতের চাপে ঈমান আলীর ডান হাত ভেঙে যায়। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় নখ ও দাঁতের গভীর ক্ষত। তবু থামছিলেন না তিনি। চিৎকার করে সঙ্গীদের ডাকতে থাকেন। একসময় বাঘ ক্লান্ত হয়ে তাঁকে ছেড়ে দেয়। সঙ্গীরা ভেবেছিলেন, ঈমান আর বেঁচে নেই। কিন্তু যখন তাঁকে খুঁজে পান, তখনো তিনি রক্তাক্ত।

ঈমান আলী বলেন, ‘তখনো জ্ঞান হারাইনি, সব বুঝতি পারছিলাম।’ নৌকায় করে তাঁকে ঘাটে আনা হয়। এরপর বাড়িতে টানা ছয় মাস চিকিৎসা নেন। শরীর সেরে উঠতেই আবার ছুটেছেন বনে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাদা ছাড়া তো খাওয়া নাই।’

চার ছেলে ও তিন মেয়ের জনক এই বনজীবী বাঘকে কখনো ভয় পাননি। কিন্তু এখন সুন্দরবনের ভয় বদলে গেছে, এই ভয়কে বাঘের চেয়েও বেশি ভয়ংকর মনে করেন ঈমান আলী। তাঁর দাবি, ‘এখন বাঘের ভয় নাই, ডাকাতের ভয়।’

চার ছেলে ও তিন মেয়ের জনক এই বনজীবী বাঘকে কখনো ভয় পাননি। কিন্তু এখন সুন্দরবনের ভয় বদলে গেছে, এই ভয়কে বাঘের চেয়েও বেশি ভয়ংকর মনে করেন ঈমান আলী। তাঁর দাবি, ‘এখন বাঘের ভয় নাই, ডাকাতের ভয়।’ বর্তমানে সুন্দরবনে ঢুকতে গেলে বনদস্যুদের সঙ্গে চুক্তি করতে হয়। ১০-২০ হাজার টাকা দিলে এক দল ছাড় দেয়। কিন্তু অন্য দল এসে আবার ধরে, নির্যাতন করে, ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করে।

এই ভয়ের কারণে অনেকে বনজীবী এখন বনে যেতে সাহস পান না। কিন্তু না গেলেও উপায় নেই। গাবুরার মতো উপকূলীয় জনপদের মানুষের জন্য সুন্দরবন শুধু বন নয়—এটাই জীবনের অন্যতম অবলম্বন। মাছ, কাঁকড়া, মধু—সবই আসে সেই বন থেকে।

ঈমান আলী শেখ এখন সেই বনকে খুব কাছে পেয়েও দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর বাড়ির পাশেই খোলপেটুয়া নদী। ঢেউয়ের শব্দ প্রতিদিন তাঁকে মনে করিয়ে দেয় তাঁর আসল জায়গার কথা। নদীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ঈমান আলী, বলে উঠলেন, ‘বাদায় না গেলে সংসার চলে না। বাদাই আমাগে জীবন, বাদাই আমাগে মরণ।’

Read full story at source