লুটপাট ও পরিবেশ ধ্বংস বন্ধ হোক
· Prothom Alo

উন্নয়নকাজের জন্য নির্মাণসামগ্রী প্রয়োজন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য সাগর চ্যানেল থেকে ৬ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের যে প্রশাসনিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। উন্নয়নের নামে যদি রাষ্ট্রীয় রাজস্বের বিপুল ক্ষতি করা হয় এবং সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়, তবে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
Visit mwafrika.life for more information.
প্রথম আলোর খবরে এসেছে, এই বিপুল বালু উত্তোলনের ফলে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন সোনাদিয়া দ্বীপ ও গোরকঘাটার জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। শুধু তা-ই নয়, সাগরবক্ষে সম্প্রসারিত হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন রানওয়েটিও ধসে পড়ার চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
তা ছাড়া এমন স্পর্শকাতর একটি চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র বা পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) করা হয়নি। জেলা প্রশাসন পুরোনো একটি ইআইএর দোহাই দিলেও পরিবেশ অধিদপ্তর স্পষ্ট জানিয়েছে, যেকোনো চ্যানেল বা নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য আলাদা ইআইএ বাধ্যতামূলক। ইআইএ ছাড়া কীভাবে জেলা প্রশাসন বালু তোলার অনুমতি দিল, সেটি বিরাট প্রশ্ন।
পরিবেশ ধ্বংসের এই শঙ্কার পাশাপাশি এখানে বড় ধরনের আর্থিক লুটপাটের আয়োজনও দৃশ্যমান। বাজারে প্রতি ঘনফুট বালুর দাম যেখানে ১৬ টাকা, সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তা দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সায়! উত্তোলন খরচের খোঁড়া যুক্তি দিয়ে প্রায় সাত গুণ কম দরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি করে কার স্বার্থ উদ্ধার হচ্ছে? এর আগে এই বালু মাত্র ৪৪ পয়সায় বিক্রির অপচেষ্টা আটকে দিয়েছিল দুদক। সড়ক নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ২২৫ কোটি টাকার বিশাল ব্যয় ধরা হলেও ঠিকাদারকে এভাবে কেন বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে?
ইতিমধ্যে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এই বালু উত্তোলনের প্রক্রিয়া বন্ধে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। কক্সবাজারের বিভিন্ন সংগঠনও এই অনুমোদন বাতিলের জোরালো দাবি তুলেছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য, স্রোত ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে এবং রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বিসর্জন দিয়ে কোনো ঠিকাদারকে লাভবান করার এমন অন্যায্য সুযোগ প্রশাসনের এখতিয়ারে পড়ে না।
যেকোনো জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পই দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাময়িক উন্নয়নের দোহাই দিয়ে প্রকৃতির এমন অপূরণীয় ক্ষতিসাধন এবং সরকারি রাজস্বের এমন ক্ষতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জেলা প্রশাসনকে অবিলম্বে পরিবেশবিধ্বংসী এই অনুমোদন বাতিল করতে হবে। ইআইএ ছাড়া পানির দরে কীভাবে এ কার্যাদেশ দেওয়া হলো, তার উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। প্রকৃতির ভয়াবহ প্রতিশোধের মুখে পড়ার আগেই নীতিনির্ধারকদের টনক নড়ুক, পরিবেশ ও অর্থনীতি—দুই–ই রক্ষা পাক।