মায়ের ভবিষ্যদ্বাণীই সত্যি হলো
· Prothom Alo

ছোটবেলায় এক বন্ধুর নানির কাছে গল্প শুনে এসে বাড়িতে মাকে যখন শোনাতেন, তখন তাতে অনেক নতুন কিছু যোগ করতেন ছোট্ট ফয়সাল। ছেলের গল্প বলার অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে মা তখনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘তুই একদিন বড় হয়ে লেখক হবি।’ মায়ের কথা আজ সত্যি হয়েছে। ছোট্ট ফয়সাল আজ দেশের অন্যতম চিত্রনাট্যকার সিদ্দিক আহমেদ। মেরিল-প্রথম আলো সমালোচক পুরস্কারে সীমিতদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ‘তোমাদের গল্প’-এর জন্য এবার সেরা চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। সিদ্দিক আহমেদের গল্প শুনেছেন নাজমুল হক
Visit turconews.click for more information.
পারিবারিক ভিটা খুলনাতে হলেও বাবার চাকরির সুবাদে কুষ্টিয়াতেই ছিল সিদ্দিক আহমেদের মূল বসতি। পরে কলেজের পড়াশোনার জন্য আবার খুলনায় ফিরে আসেন। সেখানে পড়ার সময়ই ২০০৯ সালে খুলনা ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হন। নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের অ্যাপ্রিসিয়েশন ক্লাস এবং নুরুল আলম আতিকের সান্নিধ্য তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। সিদ্দিক আহমেদের কথায়, ‘মূলত আতিক ভাইয়ের স্ক্রিপ্ট রাইটিং ওয়ার্কশপ থেকেই চিত্রনাট্য লেখায় হাতেখড়ি।’ এরপর চিত্রগ্রাহক রাশেদ জামানের ফিল্ম মেকিং ওয়ার্কশপেও অংশ নেন।
২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্টে পড়াশোনা শুরু করলেও ক্লাসরুমের চেয়ে ফিল্মের সেটেই তাঁর সময় কাটত বেশি। ওই বছর দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘সেলিব্রেটিং লাইফ’-এর ওয়ার্কশপে তাঁর মেন্টর ছিলেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী ও মেজবাউর রহমান সুমন। সেখানে সুমনের তত্ত্বাবধানে কয়েকজনের সঙ্গে মিলে প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমার কাজ। তখন থেকেই সুমনকে ‘গুরু’ মানেন। বিজ্ঞাপনে দীর্ঘ সময় তাঁর সহকারী হিসেবে কাজও করেন। এরপর কিছুদিন শরাফ আহমেদ জীবনের সঙ্গেও কাজ করেছেন।
চিত্রনাট্য রচনার কৌশল আরও পোক্তভাবে শিখতে অনম বিশ্বাসের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তাঁর নির্দেশনায় ইউনিসেফের একটি মেগা সিরিজের কাজ করার সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ সন সাউদির কাছ থেকে সিরিজ ডিজাইনের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেন। সিদ্দিক মনে করেন, এই প্রশিক্ষণই বদলে দেয় তাঁর জীবন।
গ্রাফিক নভেল থেকে থ্রিলারের জগৎ
চিত্রনাট্যকার পরিচয়ের বাইরে লেখক হিসেবেও সিদ্দিক আহমেদের আলাদা পরিচিতি আছে। তাঁর লেখক হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এক মজার গল্প। কার্টুনিস্ট তন্ময়ের সঙ্গে গ্রাফিক নভেল নিয়ে কাজ করার সময় কার্টুনিস্ট আহসান হাবীবের সঙ্গে পরিচয়। তাঁর লেখা একটি ছোট পাণ্ডুলিপি পড়ে নিজেই প্রকাশকের ব্যবস্থা করে দেন উন্মাদ সম্পাদক। বইয়ের প্রকাশনা বিষয়ে কোনো ধারণাই তখন সিদ্দিকের ছিল না। আহসান হাবীবের সুপারিশে এভাবেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই ‘ছায়ামানব’। পরে তিনি উপহার দেন ‘নটরাজ’, ‘দশগ্রীব’, ‘ধনুর্ধর’–এর মতো আলোচিত বই। আহসান হাবীবের সঙ্গে লিখেছেন গ্রাফিক নভেল ‘টাইম ট্রাবল’। তাঁর আরও দুটি গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব’ ও ‘ন ডরাই’ও বেশ আলোচিত হয়েছিল।
তবে সিদ্দিক আহমেদের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় বাতিঘর থেকে প্রকাশিত থ্রিলার ‘দশগ্রীব’। উপন্যাসটি দুই বাংলাতেই তাঁকে থ্রিলার লেখক হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের নির্মাতা সৃজিত মুখার্জি বইটি নিয়ে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে এটি থেকে ওয়েব সিরিজ নির্মাণের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। যদিও সিরিজটি শেষ পর্যন্ত হয়নি।
সাফল্যের সিঁড়ি
তাঁর লেখক হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এক মজার গল্প। কার্টুনিস্ট তন্ময়ের সঙ্গে গ্রাফিক নভেল নিয়ে কাজ করার সময় কার্টুনিস্ট আহসান হাবীবের সঙ্গে পরিচয়। তাঁর লেখা একটি ছোট পাণ্ডুলিপি পড়ে নিজেই প্রকাশকের ব্যবস্থা করে দেন উন্মাদ সম্পাদক।‘তোমাদের গল্প’–এর শিল্পীরা
অনম বিশ্বাসের নির্দেশনায় ইউনিসেফের ৭৮ পর্বের মেগা সিরিজ ‘ইচ্ছে ডানা’ দিয়ে পেশাদার চিত্রনাট্যকার হিসেবে সিদ্দিক আহমেদের যাত্রা শুরু। শিক্ষা ও বিনোদনমূলক সিরিজটির জন্য তিনি নিউইয়র্কের ফর্টি টেলি অ্যাওয়ার্ডও পান। এরপর তিনি সৈয়দ আহমেদ শাওকীর কারাগার’ ১, রায়হান রাফীর ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘টান’ ও ‘৭ নাম্বার ফ্লোর’-এর মতো আলোচিত ওটিটি প্রকল্পে কাজ করেন। ‘লটারি’ নামে মঞ্চনাটকও লিখেছেন সিদ্দিক আহমেদ। তাঁর পরিচালিত প্রথম টিভি ফিকশন ‘কিছু বিস্মরণের নদী’, প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘সুন্দরী’।
সিদ্দিক আহমেদের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় বাতিঘর থেকে প্রকাশিত থ্রিলার ‘দশগ্রীব’। উপন্যাসটি দুই বাংলাতেই তাঁকে থ্রিলার লেখক হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের নির্মাতা সৃজিত মুখার্জি বইটি নিয়ে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে এটি থেকে ওয়েব সিরিজ নির্মাণের ঘোষণাও দিয়েছিলেন।
চরকির অমনিবাস চলচ্চিত্র ‘জাগো বাহে’ লিখেছেন, একটি পর্ব নির্দেশনাও দেন। ’৫২, ’৭০ ও ’৭১-এর পটভূমিতে অ্যান্থলজিটি তৈরি হয়, যা তাঁকে মেরিল-প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পুরস্কারে একাধিক ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন এনে দেয়। এ ছাড়া বিঞ্জের ‘অগোচরা’ সিরিজ ওই প্ল্যাটফর্মে সে বছরের সবচেয়ে বড় হিট ছিল। এটা রচনা ও নির্দেশনা দুটিই ছিল সিদ্দিক আহমদের। মোস্তফা কামাল রাজের সিনেমা ওমর, মেহেদী হাসানের ব্যবসাসফল ‘বরবাদ’–এর চিত্রনাট্য বড় পর্দায় তাঁকে পরিচিত করে। আসছে ঈদুল আজহায় মুক্তি পাবে তাঁর চিত্রনাট্যে মেজবাউর রহমান সুমনের রইদ।
কার হাতে কোন পুরস্কারবাংলা নাটক ও সিনেমা থেকে পারিবারিক গল্প যেন হারিয়ে যাচ্ছিল। সেই অভাব থেকেই ‘তোমাদের গল্প’ লেখেন সিদ্দিক আহমেদ। ইচ্ছা ছিল নিজেই বানাবেন। কিন্তু কোনো ওটিটিই আগ্রহ দেখায়নি। পরে নির্মাতা মোস্তফা কামাল রাজকে এক আড্ডায় গল্পটা শোনান সিদ্দিক। শুনেই রাজের পছন্দ হয়ে যায়।
বাবার স্মৃতি থেকে ‘তোমাদের গল্প’
বাংলা নাটক ও সিনেমা থেকে পারিবারিক গল্প যেন হারিয়ে যাচ্ছিল। সেই অভাব থেকেই ‘তোমাদের গল্প’ লেখেন সিদ্দিক আহমেদ। ইচ্ছা ছিল নিজেই বানাবেন। কিন্তু কোনো ওটিটিই আগ্রহ দেখায়নি। পরে নির্মাতা মোস্তফা কামাল রাজকে এক আড্ডায় গল্পটা শোনান সিদ্দিক। শুনেই রাজের পছন্দ হয়ে যায়। রাজ নির্মাণের অনুমতি চাইলে সিদ্দিকও আর না করেননি। এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় আর এখন এনে দিল মেরিল–প্রথম আলো পুরস্কার।
‘তোমাদের গল্প’ সিদ্দিক আহমেদের নিজের জীবনের গল্প। তাঁর বাবার মৃত্যুর পর গ্রামে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এবং সেখানে নতুন করে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে রক্তের টান আবিষ্কার করার অনুভূতি থেকেই এই গল্পের জন্ম। সিদ্দিক আহমেদ বলেন, ‘ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো যখন কেবল থ্রিলার আর হররের পেছনে ছুটছিল, তখন আমার মনে হতো, মানুষ এখনো পারিবারিক গল্পের জন্য তৃষ্ণার্ত। কাজটি রিলিজ হওয়ার পর এত পরিমাণ ভালোবাসা পেয়েছি, আমার অন্য কোনো কাজের চেয়ে তা অনেক বেশি।’
মেরিল–প্রথম আলো পুরস্কার হাতে সিদ্দিক আহমেদ। ছবি: মীর হোসেন‘তোমাদের গল্প’ সিদ্দিক আহমেদের নিজের জীবনের গল্প। তাঁর বাবার মৃত্যুর পর গ্রামে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এবং সেখানে নতুন করে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে রক্তের টান আবিষ্কার করার অনুভূতি থেকেই এই গল্পের জন্ম।
পুরস্কারের আনন্দ
এবারের মেরিল–প্রথম আলো পুরস্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা আর আবেগ। জাগো বাহের জন্য সমালোচক পুরস্কার সেরা পরিচালক হিসেবে মনোনীত হলেও শেষ পর্যন্ত পুরস্কারটি তাঁর হাতে ওঠেনি। এটা নিয়ে স্ত্রী নিশাত বিনতে আমিনের কষ্ট ছিল। সেবার অনুষ্ঠান থেকে বের হতে হতে স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে সিদ্দিক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘একদিন বাংলাদেশের সব পুরস্কারই আমি পাব।’
চরকির অমনিবাস চলচ্চিত্র ‘জাগো বাহে’ লিখেছেন, একটি পর্ব নির্দেশনাও দেন। ’৫২, ’৭০ ও ’৭১-এর পটভূমিতে অ্যান্থলজিটি তৈরি হয়, যা তাঁকে মেরিল-প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পুরস্কারে একাধিক ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন এনে দেয়। এ ছাড়া বিঞ্জের ‘অগোচরা’ সিরিজ ওই প্ল্যাটফর্মে সে বছরের সবচেয়ে বড় হিট ছিল। এটা রচনা ও নির্দেশনা দুটিই ছিল সিদ্দিক আহমদের।
এবারের জয়ে তাই সিদ্দিকের চেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন নিশাত, যদিও স্বামী সেই পুরোনো প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিতেই রসিকতা করে বললেন, ‘আগেরবার তো পরিচালক হিসেবে মনোনীত হয়েছিলে, এবার তো পুরস্কার পেলে লেখক হিসেবে। আগে পরিচালক হিসেবে জিতে নাও, তারপর বলো।’ কেবল স্ত্রী নন, ছেলের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি তৃপ্ত তাঁর মা, যিনি সেই ছোটবেলায় ফয়সালের গল্প বলার ঢং দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ছেলে বড় হয়ে লেখক হবে। পুরস্কার পাওয়ার খবর শুনে মা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘বলেছিলাম না, তুই একদিন বড় লেখক হবি।’