ইরান যুদ্ধ যেভাবে ৫০ বছরের একটি চুক্তিকে হুমকির ফেলে দিল
· Prothom Alo

পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) সই করা রাষ্ট্রগুলো ২৭ এপ্রিল নিউইয়র্কে সমবেত হয়েছে। এই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রতি পাঁচ বছর পরপর পর্যালোচনা বৈঠক হয়। ইরান একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে যাচ্ছে—এমন অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটিতে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, সেই যুদ্ধের মধ্যেই এবারের এই সম্মেলন শুরু হলো।
Visit newssport.cv for more information.
এনপিটি চুক্তির ১৯১টি সদস্যরাষ্ট্র যখন পর্যালোচনা বৈঠকে বসছে, তখন এই চুক্তির মূল ভিত্তি চরম পরীক্ষার মুখে। ১৯৭০ সালে কার্যকর হওয়া এই চুক্তিটি মূলত এমন এক কেন্দ্রীয় সমঝোতা, যার মাধ্যমে বেশির ভাগ দেশ বর্তমান পারমাণবিক বিশ্বব্যবস্থাকে মেনে নিয়েছে।
এই চুক্তির আওতাভুক্ত পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন রাষ্ট্রগুলো (যাদের মধ্যে ইরানও রয়েছে) কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন না করার প্রতিশ্রুতিতে একমত হয়েছিল। অন্যদিকে পাঁচটি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পারমাণবিক অস্ত্রধর দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া) পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করার পাশাপাশি নিজেদের মজুতকৃত পারমাণবিক অস্ত্র কমানোর পথে হাঁটতেও সম্মত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সুরক্ষিত নজরদারির আওতায় শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার অধিকার এনপিটি চুক্তির সব সদস্যেরই রয়েছে। চুক্তির শর্তগুলো ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতেই রাষ্ট্রগুলো প্রতি পাঁচ বছরে মিলিত হয়। সে কারণেই এখন বর্তমান সম্মেলনটি আয়োজিত হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার মতো অন্যান্য লঙ্ঘনের ঘটনা এবং বর্তমান এই যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ প্রভাবিত কূটনীতির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এত সব কিছুর পরও এই পর্যালোচনা সম্মেলনে ইরানের প্রতিনিধিদল এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা তুলনামূলকভাবে নীরবে কিন্তু কার্যকর সমান্তরাল এক আলোচনার পথ খুঁজে নিতে পারবেন।
সমস্যা হলো, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা সম্মেলনের সামনে একটি গভীর অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আর তা হলো এনপিটির সদস্যপদ কি এর আওতাভুক্ত পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন রাষ্ট্রগুলোকে কোনো রকম নিরাপত্তা দিতে পারে?
নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে এনপিটির অধীন অন্যান্য পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন রাষ্ট্রের মতো ইরান নয়। দেশটি তাদের পারমাণবিক কর্মকাণ্ড দিয়ে বিশ্বকে উদ্বিগ্ন করার যথেষ্ট কারণ ঘটিয়েছে। আইএইএ ইরানের অমীমাংসিত নিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিদর্শকদের সীমিত প্রবেশের সুযোগ এবং স্বাভাবিক বেসামরিক প্রয়োজনের সীমানা ছাড়িয়ে মাত্রাতিরিক্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এসব সত্ত্বেও সংস্থাটি দেশটিতে কোনো পরিকল্পিত পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রমাণ পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারাও এই একই কথা স্বীকার করেছে। এমন নিশ্চয়তা থাকার পরও স্বীকৃত পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং অঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
পারমাণবিক কার্যক্রমের উদ্বেগ মেটানোর এই জবরদস্তিমূলক পথ এনপিটির জন্য চরম ক্ষতিকর। আসল উদ্বেগের জায়গা যদি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর কার্যক্রম–সংক্রান্ত অনিশ্চয়তাকে ঘিরে হয়ে থাকে, তবে সেখানে বোমা ফেলে সেটার কোনো সুরাহা হয় না।
গতকাল সোমবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) পর্যালোচনা সম্মেলনে প্রতিনিধিদের উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসআবার সমস্যা যদি অস্ত্র পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়া নিয়ে হয়, তবে যুদ্ধ চাপিয়ে দেশটিকে অবরুদ্ধ করে রাখলে সে কাজ কোনোভাবেই সহজ হওয়ার কথা নয়। আর আসল সংকট যদি পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর সুপ্ত ক্ষমতা অর্জন নিয়ে হয়ে থাকে, তবে চুক্তির আওতায় সুরক্ষিত কেন্দ্রগুলোতে হামলার মানে হলো অন্যান্য দেশকে এই শিক্ষাই দেওয়া যে অস্ত্রের সীমানার নিচে অবস্থান করলেও কোনো স্বস্তি বা নিরাপত্তাই মিলবে না।
এবারের নিউইয়র্কের পর্যালোচনা সম্মেলনে ইরানের কার্যপত্র বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। তেহরান চুক্তির ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকারের কথা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
তাদের দাবি, সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনায় এ ধরনের আক্রমণ চুক্তির মূল যৌক্তিকতাকেই লঙ্ঘন করে। একই সঙ্গে তারা চুক্তির বাইরে থাকা ইসরায়েলের অবস্থান এবং পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র থেকে মুক্ত এক মধ্যপ্রাচ্য গড়ে তোলার সেই বহু পুরোনো এবং অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির দিকে আঙুল তুলেছে।
কূটনৈতিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কে কতদূর এগোলইরানের সব কথায় সায় না দিলেও চলবে, কিন্তু তাদের যুক্তিগুলো সম্মেলনে আসা অন্যান্য সদস্যদেশের কাছে কেন এতটা জোরালো মনে হবে তা সহজেই বোঝা যায়। এগুলো পারমাণবিক অস্ত্রহীন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার এক বড় ধরনের হতাশারই বহিঃপ্রকাশ। এই উদ্বেগের মূল কারণ হলো নিয়ম বা আইন কেবল দুর্বলদের ওপর প্রয়োগ করা হয় আর ক্ষমতাশালীদের প্রয়োজনে সেগুলোকে নিজেদের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা যায়।
এসব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ বর্তমান পর্যালোচনা সম্মেলনের স্থান যুক্তরাষ্ট্রে হওয়াটাও এখানে বড় কোনো সমাধান নিয়ে আসছে না। কারণ, এই চলমান সংঘাতে তারা নিজেরাই একটি বড় পক্ষ। যে প্রতিশ্রুতি এনপিটিতে আগে থেকেই পরিষ্কার করে উল্লেখ করা রয়েছে এবং ইরান যাতে সই করে আগেই রাজি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সেটাই গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। যুদ্ধ যদি শুরু না হতো তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে মতপার্থক্য নিরসনে সহায়ক আলোচনা করার জন্য একটি অত্যন্ত অনুকূল স্থান হতে পারত।
আমেরিকার যুদ্ধবিরতিই যেভাবে ইরানের যুদ্ধ জয়ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার মতো অন্যান্য লঙ্ঘনের ঘটনা এবং বর্তমান এই যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ প্রভাবিত কূটনীতির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এত সব কিছুর পরও এই পর্যালোচনা সম্মেলনে ইরানের প্রতিনিধিদল এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা তুলনামূলকভাবে নীরবে কিন্তু কার্যকর সমান্তরাল এক আলোচনার পথ খুঁজে নিতে পারবেন।
আগামী চার সপ্তাহে এনপিটির সদস্যরাষ্ট্রগুলোর হাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। তারা বারবার করে নিশ্চিত করতে পারে যে চুক্তির অধীনে থাকা সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনায় আক্রমণ একদমই অগ্রহণযোগ্য। তদারকির কথা বলে শক্তি প্রয়োগের অজুহাত দেখানো বাদ দিয়ে তারা বরং নিরাপত্তার বিষয়ে ইরানকে চাপ দেওয়া অব্যাহত রাখতে পারে।
তারা চুক্তির প্রকৃত শর্তগুলোর ভিত্তিতেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি আলোচনায় আনতে পারে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকেও মনে করিয়ে দিতে পারে যে এনপিটি কখনোই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনতে বলেনি। একই সঙ্গে তারা ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতার অস্বচ্ছতা ও চুক্তির বাইরে থাকার ফলে যে আঞ্চলিক ভারসাম্যহীনতার জন্ম হয়েছে, সেটিও তুলে ধরতে পারে।
পারমাণবিক অস্ত্রই কি এখন ইরানের একমাত্র পথ?সম্মেলনে সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে এই চুক্তি ৫০ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বিশ্বব্যাপী বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য চুক্তির এই সম্মান টিকিয়ে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এ কারণেই এই বৈঠকে সদস্যদেশগুলোকে একসঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ঘোষণা দেওয়া উচিত, যেন চুক্তির এই মৌলিক শর্তগুলোর পরিণতি কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধের মাধ্যমে নতুন করে লেখার সুযোগ দেওয়া না হয়।
ওলামিদে স্যামুয়েল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত