অবশেষে নাহিদা বৃষ্টির মরদেহও শনাক্ত, হত্যাকাণ্ডের নতুন আরও কী তথ্য জানাল পুলিশ

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় (এইচসিএসও) জানিয়েছে, গত ২৬ এপ্রিল উদ্ধার হওয়া মরদেহের খণ্ডিত অংশ ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদ সুলতানা বৃষ্টির।

Visit forestarrow.help for more information.

গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ চ্যাড ক্রোনিস্টার এই মামলার ঘটনাপ্রবাহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

ক্রোনিস্টার বলেন, ‘এই মরদেহ শনাক্তকরণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলেও এই ঘটনা গভীর শোক নিয়ে এসেছে। নাহিদা বৃষ্টি এবং জামিল লিমন শুধু শিক্ষার্থীই ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন উদ্যমী ও সফল ব্যক্তি, যাঁরা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের যোগ্য ছিলেন এবং সেই পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।’

গত ১৬ এপ্রিল দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হন। দুজনেরই বয়স ২৭ বছর।

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জানায়, এ ঘটনায় তারা লিমনের আবাস অ্যাভালন হাইটসের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তদন্ত শুরু করেছে। লিমনের দুজন রুমমেট ছিলেন—এক রুমমেট সহযোগিতা করেন, অন্যজন হিশাম আবুঘরবেহ সহযোগিতা করেননি।

শেরিফ ক্রোনিস্টার বলেন, ‘তাঁর (আবুঘরবেহ) আচরণ বিরক্তিকর হওয়ায় এবং তিনি যেসব মন্তব্য করতেন তার কারণে অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ করা হয়েছিল।’

২৩ এপ্রিল তদন্তে বড় অগ্রগতি

লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর তদন্তে বড় অগ্রগতি আসে বলে জানান শেরিফ ক্রোনিস্টার। তিনি বলেন, গত ২৩ এপ্রিল গোয়েন্দারা লিমনের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের কাছের একটি বড় ডাস্টবিনের ভেতর রক্তমাখা কিছু জিনিসপত্র খুঁজে পান। এরপরই হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয় লিমন ও বৃষ্টিকে ‘নিখোঁজ ও বিপদাপন্ন ব্যক্তি’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে।

সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহ

সেখান থেকে গোয়েন্দারা আরও তদন্তের জন্য ‘সার্চ ওয়ারেন্ট’ বের করেন এবং লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালিয়ে তাঁর রান্নাঘর ও আবুঘরবেহর শোবার ঘরের ভেতর রক্তের চিহ্ন খুঁজে পান।

শেরিফ বলেন, ‘সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিছানার পাশের মেঝেতে আমরা একটি মানুষের দেহের ছাপ দেখতে পাই, যেটি ভ্রূণের মতো গুটিয়ে থাকা অবস্থায় ছিল।’

আবুঘরবেহর গাড়ি তল্লাশি করে সেখানে বৃষ্টির রক্ত পাওয়া যায় বলেও জানান শেরিফ।

আবুঘরবেহর সাম্প্রতিক কেনাকাটার ইতিহাসও হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ের গোয়েন্দাদের নজরে আসে।

আবুঘরবেহ সম্প্রতি আবর্জনা ফেলার বড় আকারের কালো রঙের পলিথিন ব্যাগ, ওয়াইপস, দাহ্য তরল ও একটি লাইটার কিনেছিলেন।

দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার আগে সন্দেহভাজন নিজের ফোনে উদ্বেগজনক নানা বিষয় নিয়ে খোঁজখবর করেছেন বলেও তদন্তকারী কর্মকর্তারা দেখতে পান।

শেরিফ ক্রোনিস্টার বলেন, ‘তিনি এমন কিছু খোঁজ করেন—যেমন—একটি ছুরি কি মাথার খুলি ভেদ করতে পারে? প্রতিবেশী কি বন্দুকের শব্দ শুনতে পায়?…একটি মরদেহ কি ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে ডাম্পস্টারে (বড় ডাস্টবিন) ফেলে দেওয়া যায়?’

ডেপুটিরা জানিয়েছেন, আবুঘরবেহর ফোনের ‘লোকেশন হিস্টোরি’ থেকেও তথ্য পাওয়া যায়, যা শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দাদের লিমনের মরদেহের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

২৪ এপ্রিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার

পরের দিন ২৪ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর একটি কালো ব্যাগের ভেতর লিমনের মরদেহ পাওয়া যায়।

শেরিফ জানান, তাঁকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে এবং তাঁর হাত ও পা বাঁধা অবস্থায় ছিল। আঙুলের ছাপ মিলিয়ে গোয়েন্দারা নিশ্চিত করেন, মরদেহটি লিমনেরই।

শেরিফ ক্রোনিস্টার বলেন, ‘লিমনের পা নিতম্বের দিকে ভাঁজ করা ছিল এবং প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল, যাতে মরদেহ ভাঁজ করে একবারে আবর্জনার ব্যাগে ভরা সহজ হয়। একটি হত্যাকাণ্ড যতটা ভয়াবহ হতে পারে, এটা ঠিক তাই ছিল। লিমনের মরদেহ এমনভাবে মহাসড়কের পাশে ফেলে রাখা হয়েছিল, ঠিক যেভাবে আবর্জনা ভর্তি ব্যাগ ফেলে রাখা হয়।’

একই দিনে লাটজ এলাকা থেকে একটি পারিবারিক সহিংস ঘটনার জন্য সন্দেহভাজনের পরিবার ৯১১ নম্বরে ফোন করেন। পরে সেখানে গিয়ে পুলিশ আবুঘরবেহকে হেফাজতে নেয়।

২৬ এপ্রিল মরদেহের খণ্ডিত অংশ উদ্ধার

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে আরও বলা হয়, দুদিন পর রোববার কায়াক চালানোর সময় কয়েকজন ব্যক্তি ম্যানগ্রোভ এলাকায় কালো ব্যাগের ভেতর মানবদেহের খণ্ডিত অংশ খুঁজে পান। যেখানে লিমনের মরদেহ পাওয়া যায়, এই জায়গাটি তার কাছাকাছি।

একটি ফৌজদারি রিপোর্টের হলফনামায় বলা হয়েছে, ২৬ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের দক্ষিণে যে মরদেহের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে, সেটিতে মোড়ানো পোশাকের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজে নাহিদা বৃষ্টির পরনে শেষবার দেখা পোশাকের মিল রয়েছে।

পুলিশ ঘিরে ফেরার পর একটি বাড়ি থেকে দুই হাত ওপরে তুলে বেরিয়ে আসছেন হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ

শুক্রবার শেরিফ ক্রোনিস্টার জানান, বৃষ্টির মরদেহের অবস্থার কারণে তাঁকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে পুলিশকে ডেন্টাল রেকর্ড ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ৩০ এপ্রিল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।

শেরিফ ক্রোনিস্টার বলেন, ‘তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রথমে জানাতে হয়েছে, তাঁদের প্রিয়জন নিখোঁজ। পরে আবার কল করে জানাতে হয়েছে, তাঁদের খুঁজে পাওয়া গেছে, কিন্তু তাঁরা মারা গেছেন। এরপর আরও কিছু বিস্তারিত জানাতে হয়েছে—কীভাবে তাঁদের হত্যা করা হয়েছে। কারণ, তাঁদের বহুবার ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল। এটি মার্কিনদের যেসব মূল্যবোধ রয়েছে, তার সম্পূর্ণ বিপরীত।’

সর্বশেষ পাওয়া খণ্ডিত মরদেহের অংশ কি তাহলে বৃষ্টির

তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখনো নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন, লিমন ও বৃষ্টিকে একই সময়ে হত্যা করা হয়েছিল কিনা।

একজন সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করেন, কীভাবে বৃষ্টি লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছায়, শেরিফ ক্রোনিস্টার উত্তর দেন, ‘তাঁরা ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে যোগাযোগ করছিল।’

পুলিশের কাছে তাঁদের মধ্যে হওয়া বার্তা রয়েছে জানিয়ে শেরিফ আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে তাঁদের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া সেই বার্তাগুলো রয়েছে, যেগুলো থেকে আমরা বিশ্বাস করি, কোনো এক পর্যায়ে তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন।’

যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ পিএইচডি শিক্ষার্থী বৃষ্টিও বেঁচে নেই, জানালেন ভাই

শেরিফ জানিয়েছেন, তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখনো হত্যাকাণ্ডের ‘মোটিভ’ নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন।

লিমন ও বৃষ্টির মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

২৬ বছর বয়সী আবুঘরবেহকে করাবন্দী করে রাখা হয়েছে। আদালত তাঁকে জামিন দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার (ফার্স্ট ডিগ্রি) দুটি হত্যার অভিযোগসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সন্দেহভাজন কে এই হিশাম আবুঘরবেহ

Read full story at source