অনুবাদে কেন কোরআনের স্বাদ মেলে না
· Prothom Alo

পবিত্র কোরআন কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি অলৌকিক ভাষাশৈলীর এক অনন্য মোজিজা। অনেকেই কোরআনের অর্থ বোঝার জন্য অনুবাদের ওপর নির্ভর করেন, কিন্তু সত্য এই যে, কোরআনের গভীর ব্যঞ্জনা ও সূক্ষ্ম অলঙ্কার অন্য কোনো ভাষায় হুবহু ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব।
একটি সাধারণ সম্বোধনও অনুবাদে গিয়ে কীভাবে তার প্রাণ হারায়, তা নিয়ে আলোচনা করা হলো।
Visit extonnews.click for more information.
‘ইয়া আইয়্যুহান নাস’
সুরা হজের শুরুতে আল্লাহ–তাআলা মানুষকে ডাক দিয়েছেন ‘ইয়া আইয়্যুহান নাস’ বলে। এই ছোট্ট একটি বাক্যাংশে এমন কিছু ভাষাগত বৈশিষ্ট্য আছে যা অনুবাদে একেবারেই ধরা পড়ে না:
সম্মানের আতিশয্য: আরবিতে ‘ইয়া’ এবং ‘আইয়্যুহা’—এই দুই স্তরের সম্বোধনের মাধ্যমে গভীর মমতা, সম্মান এবং দূর-নিকট নির্বিশেষে সবাইকে মনোযোগ দেওয়ার এক বৈপ্লবিক আহ্বান থাকে।
অনুবাদের সীমাবদ্ধতা: ইংরেজি বা ল্যাটিন অনুবাদকরা এখানে কেবল ‘O’ ব্যবহার করেন। ফলে আরবির সেই কোমলতা ও শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে গিয়ে তা কেবল একটি শুষ্ক ডাকে পরিণত হয়।
‘নাস’
আরবিতে ‘নাস’ শব্দের মূলগত সম্পর্ক রয়েছে ‘উন্স’ শব্দের সঙ্গে, যার অর্থ হলো মমতা, হৃদ্যতা বা একাকীত্ব দূর হওয়া। অর্থাৎ মানুষ হলো সেই জাতি যারা পরস্পর মমতায় আবদ্ধ।
কিন্তু অনুবাদকরা যখন একে মানুষ, মানব বা মানবজাতি (People, Mankind, Human beings) বলেন, তখন সেই আবেগীয় বা আত্মিক সম্পর্কটি মুছে যায়।
আরও বড় সংকট দেখা দেয় যখন ল্যাটিন বা ফরাসি অনুবাদে একে ‘Men’ বা ‘Hommes’ বলা হয়। এর দ্বারা অর্থের সংকোচন ঘটে, কারণ ‘Men’ মানে পুরুষ—যা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পুরো মানবজাতিকে ডাকার মূল কোরআনি উদ্দেশ্যকে আড়াল করে ফেলে।
‘ইত্তাকু’: ভয় নাকি সুরক্ষা
অধিকাংশ অনুবাদক এই শব্দের অর্থ করেন ‘ভয় করো’ (Fear/Craignez)। কিন্তু আরবির ‘তাকওয়া’ আর সাধারণ ‘ভয়’ এক জিনিস নয়।
তাকওয়া মানে সুরক্ষা: তাকওয়া এসেছে ‘বিকায়া’ থেকে, যার অর্থ হলো নিজেকে কোনো বিপদ থেকে রক্ষা করার ঢাল তৈরি করা। এটি একটি ইতিবাচক ও সক্রিয় কর্ম—অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ পালন ও নিষেধ বর্জনের মাধ্যমে জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে বাঁচানো।
ভয় বনাম ভক্তি: ‘ভয়’ একটি নেতিবাচক অনুভূতি যা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়, কিন্তু ‘তাকওয়া’ হলো এক প্রকার প্রেমময় সতর্কতা যা মানুষকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যায়। অনুবাদের ভয় (Fear) শব্দটি কোরআনের এই বিশাল দর্শনকে একটি সংকীর্ণ গণ্ডিতে আটকে ফেলে।
কোরআন কি আসলেই অনুবাদযোগ্য
বিখ্যাত ফরাসি গবেষক সিলভেট লারজোল তাঁর গবেষণার শিরোনাম দিয়েছিলেন—“অ-অনুবাদযোগ্যকে অনুবাদ করা”। অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে কোরআন অনুবাদ করা সম্ভব নয়। স্প্যানিশ গবেষক অস্কার ডি লা ক্রুথ পালমা ঠিকই বলেছেন, “কোরআনের অনুবাদ বড়জোর একটি 'ব্যাখ্যা' হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই মূল ওহির স্থলাভিষিক্ত নয়।”
সারকথা
কোরআনের অলৌকিকত্ব বুঝতে হলে এবং এর প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে হলে আরবি ভাষা শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। অনুবাদ কেবল আমাদের অর্থের একটি সাধারণ ধারণা দেয়, কিন্তু সেই শব্দের অন্তরালে থাকা জ্যোতি পেতে হলে মূল ভাষার কাছেই ফিরে যেতে হবে।
এজন্যই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, একে ‘কোরআনের অনুবাদ’ না বলে ‘কোরআনের ভাবানুবাদ’ বা ‘অর্থের কাছাকাছি ব্যাখ্যা’ বলা যুক্তিযুক্ত।
ইসলাম অনলাইন ডটকম অবলম্বনে
কোরআনের ব্যাখ্যায় এআই ব্যবহারে সতর্কতা