রাশিয়ার বিরুদ্ধে খেলার ‘তাস’ ফুরিয়ে গেছে জেলেনস্কির

· Prothom Alo

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তাঁর অভিনয়শৈলী ও উপস্থাপনা–দক্ষতার কারণে বহুদিন ধরেই একজন জনসংযোগ–প্রতিভা হিসেবে পরিচিত। বন্ধু-শত্রু দুই পক্ষই তাঁর এই খ্যাতি স্বীকার করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি প্রকাশ্যেই তাঁকে আক্রমণ করেছেন, একসময় ইউক্রেনের এই নেতাকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিক্রয়কর্মী’ হিসেবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ ডেভিড ফ্রেঞ্চ সম্প্রতি সহানুভূতিশীল কণ্ঠে জেলেনস্কিকে বলেছেন, ‘মুক্ত বিশ্বের নতুন নেতা’।

কিন্তু এই জনসংযোগ-দক্ষতা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা বদলাতে খুব বেশি কাজে আসছে না। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জেলেনস্কির প্রশাসন ও তাঁর মিত্ররা যুদ্ধ একধরনের সন্ধিক্ষণের পথে—এমন ধারণা তৈরি করতে জোর চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন গল্প বলছে।

Visit likesport.biz for more information.

জেলেনস্কি প্রশাসনের দুর্নীতি এখন পশ্চিমাদের যুদ্ধ ছাড়ার পথ

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার চেয়ে ইউক্রেন বেশি ভূখণ্ড দখল করেছে—এমন দাবি উঠেছিল। কিছু ইউক্রেনপন্থী যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম এই দাবিকে সমর্থন করেছে, আবার কিছু তা করেনি। এখানে মনে রাখতে হবে, ফ্রন্টলাইনজুড়ে একটি বিস্তৃত ‘নিরপেক্ষ অঞ্চল’ রয়েছে। সেখানকার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে—সেটা স্পষ্ট নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতি মাসে ১৫০ থেকে ২০০ বর্গকিলোমিটার অগ্রগতি হচ্ছে বলে পরিমাপ করা হচ্ছে। অন্যভাবে বলা যায়, পরিমাপের এই পদ্ধতিটাকে কারসাজি করে খুব সহজেই দেখানো সম্ভব—যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের অগ্রগতি হচ্ছে।

বাস্তবে দুই বছর ধরে যুদ্ধের যে গতিপ্রকৃতি তাতে ফ্রন্টলাইনে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দোনেৎস্ক অঞ্চলের উত্তরের একাধিক শিল্পনগরী বর্তমানে রুশ বাহিনীর অবরোধের মুখে। বিশেষ করে উত্তরের সীমান্তজুড়ে রুশদের অগ্রযাত্রা ফ্রন্টলাইনের শত শত কিলোমিটার পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। ইউক্রেনের জনবলসংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।

যুদ্ধের চার বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে, ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী বাধ্যতামূলক নিয়োগ নিশ্চিত করতে কঠোর ও বিতর্কিত পথ অবলম্বন করছে। শহর ও গ্রামের রাস্তা থেকে তরুণদের ধরে এনে সেনাবাহিনীতে জোর করে যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে রাশিয়া এখনো আকর্ষণীয় আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে স্বেচ্ছাসেবকদের সেনাবাহিনীতে টানতে সক্ষম হচ্ছে।

ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, রাশিয়া যত সৈন্য হারাচ্ছে, তার চেয়ে কমসংখ্যক নতুন সৈন্য নিয়োগ করতে পারছে। যদিও এই দাবি প্রশ্নবিদ্ধ তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে জেলেনস্কি বলেছেন, চলতি বছরের মার্চে রুশ বাহিনীর মাসিক হতাহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩৫ হাজারে পৌঁছায়। কিন্তু এই বক্তব্য তাঁর নিজস্ব প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা, সেখানে বলা হয়েছে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে রুশ বাহিনীর মাসিক হতাহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৪৮ হাজার ছাড়িয়েছে।

ইউক্রেন জয়ের কোনো পরিকল্পনা নেই পুতিনের

জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ ও সাবেক সামরিক গোয়েন্দা প্রধান কিরিলো বুদানভ এই বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছেন, রাশিয়ার সেনাবাহিনীর জনবল জোগাড়ের প্রচেষ্টা ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, ইউক্রেন বর্তমানে রাশিয়ার তেল স্থাপনায় ক্ষতি করার জন্য একটি সফল ড্রোন হামলা পরিচালনা করছে। তবে এটি যুদ্ধের চিত্রে খুব বেশি পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সম্ভবত এটি শুধু টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর জন্য জ্বলন্ত তেলের ট্যাঙ্কের নাটকীয় দৃশ্য সরবরাহ করবে।

এপ্রিল মাসে, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল–ইরান সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেল বিক্রি করে রাশিয়ার আয়ে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। বর্তমান এ খাতে রাশিয়ার আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার। এক মাসে রাশিয়া যে অতিরিক্ত আয় করেছে, তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে ইউক্রেন আগামী দুই বছরে যুদ্ধ চালানোর জন্য যে ঋণ পেতে যাচ্ছে, তার প্রায় ১০ শতাংশের সমান।

পুতিন এমন কিছু চান, যা তিনি কখনোই পাবেন না

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে, এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও তা স্বীকার করেছেন। তবে রাশিয়ার মতো ইউরোপের অন্যান্য অর্থনীতিতেও মন্দাভাব তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে মাথাপিছু জিডিপিতে রাশিয়া বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অপেক্ষাকৃত কম সচ্ছল দেশ যেমন রোমানিয়া ও গ্রিসের চেয়ে এগিয়ে। একই সূচকে ইউক্রেনের অবস্থান মঙ্গোলিয়া ও মিসরের সমপর্যায়ে। অথচ ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে চলে গেছে।

ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ যখন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন ইউক্রেনপন্থী লোকজন রাশিয়া থেকে আসা যেকোনো খবরকে ধরে নেয় ‘শাসনব্যবস্থায় ভাঙনের ইঙ্গিত’ হিসেবে। গত মাসে রুশ ইনফ্লুয়েন্সার ভিক্তোরিয়া বনিয়ার একটি ইনস্টাগ্রাম ভিডিও পশ্চিমা গণমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়, যেখানে তিনি সরকারি নীতির সমালোচনা করেছিলেন। রাশিয়ায় অসন্তোষ থাকলেও, শাসনব্যবস্থা পতনের কাছাকাছি পৌঁছেছে—এমন পরিস্থিতি নয়।

ইউক্রেনীয়দের মধ্যে অসন্তোষও ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। দেশটির পার্লামেন্টের অর্থনীতি কমিটির প্রধান দানিলো গেটমানৎসেভ বলেছেন, ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের উচিত ইউক্রেনীয়দের আর ‘কারও ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার’ বা ‘মানবঢাল’ হিসেবে দেখা বন্ধ করা। তাদের অধিকার নেই ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার।

এই ধরনের বয়ান মূলত ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জনগণকে বেদনাপূর্ণ সত্য থেকে মনোযোগ সরাতে সাহায্য করে। আর সবচেয়ে ভালো ধরনের সত্যটি হলো, যুদ্ধ অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছে। আর সবচেয়ে খারাপ সত্যটি হলো, ইউক্রেন ভেঙে পড়তে চলেছে। ইউক্রেনকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ৯০ বিলিয়ন ইউরোর একটি ঋণসহায়তা পেলেও, তাঁর এবং তাঁর মিত্রদের দূরদৃষ্টি ও বিজয়ের কৌশলের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এরই মধ্যে বাস্তবতা ধীরে ধীরে সামনে আসছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধ শেষ করতে হলে ইউক্রেনকে কিছু ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হতে পারে, তবে এর বিনিময়ে দেশটি দ্রুততর প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা প্রধান অ্যান্ড্রিয়াস কুবিলিয়াস আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ কার্যত অসম্ভব এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ একটি ‘জটিল প্রক্রিয়া’ হবে। এর বদলে তিনি ইউক্রেন ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের একটি সামরিক জোটের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা মস্কো ন্যাটোর ‘পরোক্ষ সংস্করণ’ হিসেবে দেখবে এবং প্রত্যাখ্যান করবে।

এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যগুলো মূলত দেখাচ্ছে যে শান্তিচুক্তির শর্ত নিয়ে প্রধান দর–কষাকষি এখন শুধু জেলেনস্কি ও পুতিনের মধ্যে নয়; বরং জেলেনস্কি ও তাঁর পশ্চিমা, বিশেষ করে ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যেও চলছে।

ট্রাম্প ও পুতিন দুজনই কেন ইউরোপকে ‘ধ্বংস’ করতে চান

বুদানভ সম্প্রতি বলেছেন, শান্তি আলোচনায় কিয়েভ ও মস্কোর অবস্থানকে কিছুটা কাছাকাছি আনা সম্ভব। তবে জেলেনস্কিকে এমন কোনো অর্জন দেখাতে হবে, যা ইউক্রেনের জন্য অন্তত কিছু ইতিবাচক ফল হিসেবে বিবেচিত হয়। আদর্শগতভাবে সেই অর্জন হতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ বা বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চয়তা; কিন্তু মের্ৎস ও কুবিলিয়াসের বক্তব্য অনুযায়ী, এ দুইটির সম্ভাবনা খুব কম।

ইউক্রেনীয়দের মধ্যে অসন্তোষও ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। দেশটির পার্লামেন্টের অর্থনীতি কমিটির প্রধান দানিলো গেটমানৎসেভ বলেছেন, ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের উচিত ইউক্রেনীয়দের আর ‘কারও ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার’ বা ‘মানবঢাল’ হিসেবে দেখা বন্ধ করা। তাদের অধিকার নেই ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার।

অন্যদিকে, জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ মহলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বড় ধরনের তদন্তের চাপ রয়েছেন। ফলে রাশিয়া বা পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে দর–কষাকষিতে তাঁর হাতে কার্যত কোনো শক্তিশালী কার্ড নেই।

  • লিওনিদ রাগোজিন লাটভিয়ার রাজধানী রিগা-ভিত্তিক একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

Read full story at source