বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত : যুদ্ধক্ষেত্র যেভাবে বিস্তৃত হচ্ছে

· Prothom Alo

সম্প্রতি আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রারত রোহিঙ্গা শরণার্থীবাহী একটি নৌকা ডুবে গিয়ে শতাধিক প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা  সরকার, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের প্রবলভাবে নাড়া দেওয়ার মতো ছিল। কিন্তু বাস্তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তা প্রায় উপেক্ষিতই থেকে গেছে।

Visit aportal.club for more information.

অথচ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বের হচ্ছেন—যার অধিকাংশই মর্মান্তিক পরিণতিতে শেষ হয়। এসব মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা বা কিছু সংখ্যার হিসাব নয়; বরং একটি গভীর ও দৃষ্টির আড়ালে থাকা সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন এবং সাম্প্রতিক গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে; যা একসময় জরুরি মানবিক সহায়তার বিষয় ছিল, তা এখন দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে। ডুবে যাওয়া নৌকার ছবি এই সংকটের দৃশ্যমান দিক মাত্র। এর অন্তর্নিহিত বাস্তবতা হলো অনিরাপত্তা, বঞ্চনা এবং একধরনের চাপিয়ে দেওয়া স্থবিরতা, যা মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। যখন ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই এবং সামনে কোনো বাস্তবসম্মত ভবিষ্যৎ নেই, তখন ঝুঁকি নেওয়াই অনেকের কাছে একমাত্র পথ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির গবেষকদের সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের গবেষণা দেখায়, এই সংকট আর শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখা যায় না। এটি এখন একটি বিস্তৃত সংঘাত-ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, যা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অতিক্রম করে আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে।

প্রথমত, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ সরাসরি বাংলাদেশের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে, বিশেষ করে শরণার্থীশিবির ও সীমান্তবর্তী এলাকায়। এই সংঘাত কার্যত সীমান্ত অতিক্রম করেছে, ফলে যে স্থানগুলো একসময় মানবিক সহায়তার পরিসর ছিল, তা এখন বিস্তৃত এক সংঘাতময় বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।

ক্রমবর্ধমান ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে রাখাইন রাজ্যের সহিংসতা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরের অভ্যন্তরীণ অনিরাপত্তার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দুর্বল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সুযোগে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো শিবিরে নিয়োগ, চাঁদাবাজি এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। ফলে রোহিঙ্গারা আর কেবল অতীতের সহিংসতার শিকার নন; অনেকেই এখন চলমান সংঘাতের ভেতরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছেন।

এই অস্থিরতার প্রভাব আশপাশের বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও পড়ছে। সশস্ত্র উপস্থিতি, অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সীমান্তনির্ভর নেটওয়ার্ক এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে অনিরাপত্তা আর শিবিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। ফলে শরণার্থীশিবিরকে বিচ্ছিন্ন ও নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে দেখার ধারণা আর টেকসই নয়।

কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা শিবির

দ্বিতীয়ত, আরাকান আর্মি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীসহ অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় কার্যক্রম বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে মারাত্মক অস্থিরতা ও অনিরাপত্তাবোধ তৈরি করেছে। মিয়ানমারের কিছু অঞ্চলে প্রশাসনিক কাঠামোর ভাঙন এবং আরাকান (রাখাইন) অঞ্চলে ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য এক অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। সীমান্ত অঞ্চলের এ ধরনের প্রশাসনিক শূন্যতায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মানব পাচার থেকে শুরু করে জবরদস্তিমূলক নানা কার্যক্রম—সবই দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং দুর্গম সীমান্ত ভূখণ্ডের কারণে সহজতর হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ ও সীমিত সম্পদের শরণার্থীশিবিরগুলোতে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অনিরাপত্তা কেবল স্থানীয় নয়; এটি প্রকৃতিগতভাবে সীমান্তপারের। কিন্তু নীতিগত প্রতিক্রিয়ায় শিবিরের সহিংসতাকে প্রায়ই অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, ফলে এর আঞ্চলিক কারণগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও টেকসই কূটনৈতিক উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা না করলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তৃতীয়ত, এই সংকটের একটি গভীর কিন্তু তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত দিক হলো লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নারী ও কন্যাশিশুর ওপর যে নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছে, তা থেমে যায়নি; বরং শিবিরেও তা অব্যাহত রয়েছে—কিছু ক্ষেত্রে আরও তীব্র হয়েছে। শারীরিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, জোরপূর্বক বিয়ে ও শোষণের মাত্রা উদ্বেগজনক। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্বে নারী ও কিশোরীরা প্রায়ই আটকা পড়ে। নারী অপহরণ ও ধর্ষণের মতো অপরাধ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতাও বিদ্যমান, যা সামাজিক কাঠামো ও জবাবদিহির দুর্বলতার কারণে আরও জটিল হয়ে ওঠে। শিশুরাও এর গভীর প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। ভয়, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষার সুযোগের অভাবে তারা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও বিকাশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে শিবিরগুলো অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার জায়গা না হয়ে ট্রমার পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। সীমিত পরিসরে চলমান মানবিক সহায়তা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা প্রায়ই সমস্যার লক্ষণগুলোকে মোকাবিলা করে—মূল কারণগুলোকে নয়।

চতুর্থত, অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান কিন্তু সমানভাবে উদ্বেগজনক একটি প্রবণতা হলো রোহিঙ্গা পুরুষদের মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে জোরপূর্বক নিয়োগ। সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রগুলো তরুণদের অপহরণ করছে এবং রাখাইন রাজ্যের সংঘাতে অংশ নিতে বাধ্য করছে। এটিও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার একটি ভিন্ন মাত্রা। অনেক  মানুষকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর হয়ে লড়াই করার জন্য পাচার করা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ নৌযান মিয়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে ছেড়ে যায়

আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ৫ হাজারের বেশি তরুণ রোহিঙ্গা পুরুষকে জোরপূর্বক বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। যারা প্রতিরোধ করে, তারা হুমকি ও সহিংসতার শিকার হয়। আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়। অনেকেই শিবির ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং কোনো উপায় না দেখে সেই একই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে পা বাড়ায়, যা প্রায়ই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রত্যাবাসন নিয়ে কিছু আশাব্যঞ্জক আলোচনা হয়েছিল। এমনকি এই আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল যে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে ঈদ উদ্‌যাপন করতে পারবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেছে। মিয়ানমারের অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা ও অধিকারের বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তার অভাবে প্রত্যাবাসন এখনো অনিশ্চিত। ফলে শরণার্থীদের মধ্যে হতাশা ও স্থবিরতা আরও বেড়েছে।

নতুন সরকার এবং পরিবর্তিত নীতিগত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বর্তমান রোহিঙ্গা নীতি, যা মূলত শরণার্থীদের ক্যাম্পে আটকে রাখা এবং মানবিক সহায়তা প্রদানকেন্দ্রিক, এই দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি সক্রিয় ও কৌশলগত কাঠামো প্রয়োজন। এর মধ্যে সংকটের বহুমাত্রিক প্রকৃতি মোকাবিলায় বিশেষায়িত টাস্কফোর্স গঠন অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, পাশাপাশি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মিয়ানমারকেন্দ্রিক অংশগুলোকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা জোরদার করতে হবে—শুধু দ্বিপক্ষীয় নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। সীমান্তের উভয় পাশের রাখাইন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার আন্তসম্পর্ককেও বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে ব্যবহার করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কণ্ঠ আরও জোরালো করতে হবে। আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও অর্থায়নের হ্রাস এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন শিবিরের পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে, যা বিশেষভাবে বিপজ্জনক। রোহিঙ্গাবিষয়ক অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা খালিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বিবেচনায়, কূটনীতি, নিরাপত্তা ও মানবিক নীতির সংযোগস্থলগুলো পরিচালনায় তাঁর সক্ষমতা বাংলাদেশের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

  • ড. আনাস আনসার, সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ এবং সদস্য, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

  • ড. বেঞ্জামিন এটজোল্ড, সামাজিক ভূগোল ও অভিবাসনবিশেষজ্ঞ, সিনিয়র গবেষক, বন বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানি

    মতামত লেখকদের নিজস্ব

Read full story at source