বিজেপির হিন্দুত্ববাদ মোকাবিলায় মমতা কোথায় ভুল করলেন

· Prothom Alo

ভারতের স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে প্রথম কোনো দক্ষিণপন্থী দলের ক্ষমতায় আসার এবং একটি মধ্যপন্থী দলের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে লিখেছেন শুভজিৎ বাগচী

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের এবং বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হার নিয়ে শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত নয়, বিশ্বের পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হলো, বিশ্লেষণ হলো। নানা কারণ খুঁজে পাওয়া গেল। সেই সব কারণ খতিয়ে দেখে এবং সব পক্ষের অনেকের সঙ্গে কথা বলে মূলত তিনটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে। তিনটি কারণকে এভাবে ভাগ করা যায়: এক, বিজেপির সার্বিক পরিকল্পনা; যার অংশ হলো প্রশাসনকে ব্যবহার করে নির্বাচন জেতা। দুই, পশ্চিমবঙ্গের একটা বড় অংশের মানুষের দক্ষিণপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া। তিন, তৃণমূলের দুর্নীতি ও দল পরিচালনায় বিভ্রান্তি।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

‘এবার রাম, পরে বাম’: বাম ভোটাররা যেভাবে নীরবে বিজেপিকে জেতালেন

বিজেপির সার্বিক পরিকল্পনা

বিজেপির সার্বিক পরিকল্পনা এবং প্রশাসনকে ব্যবহার করে নির্বাচন করানোর বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে নানা লেখালেখি হয়েছে। কারণ, এবারের নির্বাচনের কেন্দ্রে যে বিষয়টি এসে গিয়েছিল, সেটি হলো ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। এই সংশোধনের ফলেই তৃণমূল কংগ্রেস হেরেছে কি না, সেই প্রশ্নের থেকেও বড় কথা হলো, ৩৫ লাখ মানুষকে তালিকাচ্যুত করে একটা ‘গণতান্ত্রিক’ নির্বাচন হলো। বলা হয়েছিল, বাদ পড়া মানুষের ভোটাধিকার আছে কি না, সেটা পরে পরীক্ষা হবে। কিন্তু তাঁদের এবারের নির্বাচনে কেন বাদ দেওয়া হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

তৃণমূল কংগ্রেসের বক্তব্য, নির্দিষ্ট আসনে বেছে বেছে এমনভাবে ভোটারদের, বিশেষত সংখ্যালঘুদের বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের হারানো সম্ভব হয়। বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে বিবেচনাধীন। তবে এ কথাও ঠিক, হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ এবং প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে বিজেপি দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে যেভাবে নির্বাচনের পরিকল্পনা করেছিল, সে সম্পর্কে তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো ধারণাই ছিল না।

এর সঙ্গে আরও নানা স্তরে ব্যবহার করা হয়েছে কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে, বিপুল সংখ্যায় মোতায়েন করা হয়েছে আধা সামরিক বাহিনী। তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধীদের বক্তব্য, এর ফলে ভোট হয়েছে শান্তিপূর্ণ; কেউ মারা যাননি। যদিও এমন বক্তব্যের বিরোধীদের অভিমত, অসংখ্য মানুষ নিজেদের ভোটার প্রমাণ করতে গিয়ে মারা গেছেন। কলকাতার চলচ্চিত্র পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘খুব শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে বলে যাঁরা আহ্লাদিত হয়েছেন, তাঁদের অবশ্যই এসআইআরের সময় এক শর ওপরে মৃত্যু চোখে পড়ছে না।’

তৃণমূল কংগ্রেসের বক্তব্য, এসবের ওপর গণনার সময় নির্বিচার কারচুপি করা হয়েছে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং বারবার এই অভিযোগ করেছেন, যার বিরোধিতা করেছে নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপি। কারচুপি হয়েছে, এ কথা যদি মেনেও নেওয়া যায়, তাহলেও প্রশ্ন ওঠে যে গত ১৫ বছরে এই অভিযোগ তৃণমূল কংগ্রেস কেন করেনি?

নির্বাচনে হারের পর সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মিশল হিন্দুত্ববাদী ভারতের সঙ্গে

তৃণমূল কংগ্রেস গত ১৫ বছরে কারচুপির অভিযোগ করেনি। কারণ, তারা জিতেছিল। এবারে হেরেছে। কারণ, দ্রুত জনভিত্তি হারিয়েছে। কেন হারাল? পশ্চিমবঙ্গের সমাজ সম্পর্কে বাইরের বিশ্বের, এমনকি ভারতের অন্য প্রদেশের মানুষেরও ধারণা যে এরা সাংঘাতিক ‘উচ্চ মেধার প্রাণী’, সংস্কৃতি এদের জনজীবনের ভিত্তি এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে এরা ঘৃণা করে। এর চেয়ে ভিত্তিহীন ধারণা আর হয় না।

বাইরের মানুষ যখন বড় বড় পণ্ডিতকে দেখেন—রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেন—তখন তাঁরা যেটা দেখেন না সেটা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদী পণ্ডিতও অসংখ্য তৈরি হয়েছেন—বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, তারিণীচরণ চট্টোপাধ্যায়, চন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ। উনিশ শতকে একদিকে যেমন নবজাগরণ হয়েছিল, তেমনি অন্যদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও পুনরুজ্জীবনবাদও মাথা তুলেছিল। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নির্বাচনে (১৯৫২) ২৩৮ বিধানসভা আসনের মধ্যে দক্ষিণপন্থী দল হিন্দু মহাসভা এবং জনসংঘ (যা আজকের বিজেপি) ১৩টি আসন পেয়েছিল, বামপন্থী জোট পেয়েছিল ৩৯টি আসন; অর্থাৎ হিন্দুবাদীরা ভোটে পিছিয়ে থাকলেও, ভালো রকমভাবে মাঠে ছিল।

এখান থেকে পটপরিবর্তন শুরু হলো। প্রথমত হিন্দু মহাসভার প্রধান নির্মল চট্টোপাধ্যায় (তিনি বিশিষ্ট বামপন্থী নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পিতা) একটু বাম ভাবধারার দিকে চলে গেলেন, জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মারা গেলেন আর দেশভাগ হয়ে শরণার্থীরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে হু হু করে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে শুরু করলেন। তাঁদের আশ্রয় দিতে শুরু করলেন বামপন্থীরা।

রাতারাতি তাদের জনপ্রিয়তা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভোট বাড়ল। আর অন্যদিকে ১৯৪৩-এর মন্বন্তর, তেভাগা আন্দোলন, খাদ্যসংকট ও আন্দোলন থেকে ভূমিহীনদের ভেতরে আংশিকভাবে জমিবণ্টনসহ একাধিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বামরা ক্ষমতায় এল। হারিয়ে গেলেন দক্ষিণপন্থীরা, কিন্তু মানুষের মন থেকে কি হারিয়ে গেলেন? একেবারেই নয়।

২০১৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জয় এবং তারপর সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পর আমি বাংলাদেশ লাগোয়া উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট জেলায় গিয়েছিলাম। সেই নির্বাচনে ১৯৫২ সালের পর সবচেয়ে ভালো ফল করেছিল বিজেপি, পেয়েছিল তিনটি আসন। কেন বিজেপির পশ্চিমবঙ্গে এই উত্থান, তা জিজ্ঞাসা করেছিলাম প্রায় ৮০ ছুঁই ছুঁই এক আসবাবনির্মাতা সুধাংশু মণ্ডলকে। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (সিপিআই) ভগ্নপ্রায় অফিস চত্বরে দাঁড়িয়ে মণ্ডল বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের মুলাদী থেকে দেশভাগের সময় তাঁরা এসে ওঠেন বসিরহাটে।

এই প্রবীণ কমিউনিস্ট বলেন, ‘আমাদের মনে প্রবল ক্ষোভ ছিল। সেই ক্ষোভ ঠান্ডা করে আমাদের থাকার জমিজায়গা দিয়েছিল সিপিআই। আমরা ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট হয়ে গেলাম। কিন্তু মনে ক্ষোভ রয়ে গেল… সেই ক্ষোভ যে সবার মন থেকে চলে গেছে, এ কথা বলা যাবে না। সেই রাগের পরিণতি আজ বিজেপির তিনটি আসন।’

এই ‘ ক্ষোভ’ কিসের ক্ষোভ, তা বুঝতে আজ আর অসুবিধা হয় না—এই ক্ষোভ পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। এই ক্ষোভ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পুষে রেখেছেন ১৯৪৭ থেকে—বিজেপি বেড়ে ৩ থেকে ২০৭ হয়েছে। এই কারণেই ২০২৬-এর নির্বাচনের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু ‘অনুপ্রবেশ’।

আবার শুধু শরণার্থীদের ক্ষোভের কারণেই যে এটা হয়েছে, এমনটা বলা যাবে না। যাঁরা দেশভাগের শিকার নন, যেমন পশ্চিমবঙ্গের মূল নিবাসী ঘটিরা। তাঁরাও প্রবল ‘মুসলমানবিদ্বেষী’। এর কারণ পশ্চিমবঙ্গের বহু লেখক তাঁদের লেখায় ব্যাখ্যা করেছেন। নির্যাস যেটা সেটা হলো, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের, বিশেষত ভদ্রলোকদের ‘নিরাপত্তাহীনতা’, সাড়ে ৫০০ বছর মুসলমান শাসনে থাকার নিরাপত্তাহীনতা। তাঁরা ব্রিটিশের অনুরক্ত। কারণ, ব্রিটিশরা তাঁদের ‘মুসলমানমুক্ত’ ভারত দিয়েছিল। যে কারণে হিন্দুত্ববাদীরা অতীতে অনেক সময়ই সরাসরি ব্রিটিশের বিরোধিতা করেননি।

দক্ষিণ এশিয়ার এই যে হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের রাজনীতি, এটা ইতিহাসের অংশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এটা ভুলে গিয়েছিলেন বা জানতেন না। ভারতে মুসলমান সমাজের ধর্মপ্রচারকদের ইমাম ভাতা দিলে কী হয়, সেটা কমিউনিস্টরা ভালোভাবে জানতেন। তাই তাঁরা কখনো পার্টির তরফ থেকে মসজিদ মেরামত করাননি বা সরকারের তরফ থেকে ইমাম ভাতা দেননি।

মুসলমান সমাজের অবস্থা বাম ফ্রন্টের আমলে যথেচ্ছ খারাপ ছিল, যেটা বিচারক সাচার কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল। সেই রিপোর্ট দেখিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা একটা রাজনৈতিক কল্পনার জগতে ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, কোনো আদর্শ ছাড়া একধরনের নরম হিন্দুত্বের বাঁধ দিয়ে কড়া হিন্দুত্বের প্লাবন ঠেকাতে পারবেন। পেরেছিলেন, অন্তত ১০ বছর। কিন্তু আর পারলেন না।

ভোটে হারলেন মমতা, রাজনীতিতে হার মানবেন কি

তৃণমূলের উদ্দেশ্যহীন এবং দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি

ভারতে হিন্দুত্বের একটা প্লাবন উনিশ শতকের পরে আবার ফিরে এসেছে। এটা রাজনৈতিক দলগুলো হয়তো বুঝতে পারছে, কিন্তু কিছু করতে পারছে না। তৃণমূল কংগ্রেসের বিশেষত্ব হলো, তারা তেমনভাবে বুঝতেও পারেনি। তাই ধারাবাহিকভাবে মন্দির বানিয়ে, ক্লাবের ছেলেদের দুর্গাপুজা করার টাকা দিয়ে, মঞ্চে দাঁড়িয়ে হিন্দু স্তোত্র পাঠ করে (কখনো মুসলমান অঞ্চলে ‘আমি যাব মদিনা’ বলে গান গেয়ে) একে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু যেটা করার প্রয়োজন ছিল সেটা হলো, একটা সামগ্রিক সর্বভারতীয় বিজেপিবিরোধী জোট তৈরি করা। এই জোট গঠনে বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারত তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু তারা সেটা তো করেইনি, উল্টো জোট ব্যর্থ করতে চেষ্টা চালিয়ে গেছে। এটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝলেন, কিন্তু পরাজয়ের পর। তখন বললেন, সব দল—এমনকি বাম ও অতিবামদের নিয়েও জোট গঠনে তিনি উৎসাহী। প্রশ্ন হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে কংগ্রেসকে বেশ কিছু আসন ছেড়ে নির্বাচনের আগে কেন পশ্চিমবঙ্গে একটা জোট তারা গঠন করল না? কংগ্রেস তিন শতাংশ ভোট পেয়েছে, তৃণমূল ৫ শতাংশে হেরেছে।

এটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল করেনি। কারণ, তাদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস; যে আত্মবিশ্বাসের আসলে কোনো ভিত্তি এবারে ছিল না। তাদের চিরাচরিত সমীকরণ—৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ মুসলমান ভোট আর ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ হিন্দু ভোট—এই দিয়ে মোট ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করা, এবারে কাজ করেনি।

এর কারণ দুটি। এক, এই প্রথম দেখা গেল, মুসলমান সমাজ নির্দিষ্ট অঞ্চলে জোট বেঁধে মুসলমানপ্রধান দুটি দল—দক্ষিণবঙ্গে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট এবং উত্তরবঙ্গে আমজনতা উন্নয়ন পার্টিকে— ভোট দিয়েছে। চারের দশকে ফজলুল হকের উত্থানের পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান জনগোষ্ঠীর দুই নেতা নওশাদ সিদ্দিকী ও হুমায়ুন কবিরের পেছনে দাঁড়াল মুসলমান সমাজ। ধর্মের ভিত্তিতে এই ভোট ভাগ অতীতে সাংঘাতিক সুবিধা আসামে করে দিয়েছে বিজেপিকে। সেখানে বাঙালি মুসলমানের ভোট দুই টুকরা হয়ে কংগ্রেস এবং ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টে চলে যাওয়ায় হেরেছে কংগ্রেস, জিতেছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখল, মুসলমান সমাজের মধ্যেও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া কাজ করায়।

দুই, হিন্দু ভোট অনেকটাই একত্র হয়ে বিজেপিতে চলে গেছে।

কিন্তু এটা যে হচ্ছে, সেটা তৃণমূলের মতো দল, যাদের অন্তত গত মাস পর্যন্ত একটা সংগঠন ছিল, তারা বুঝতে পারল না কেন? কেনই–বা এটাও বুঝতে পারল না যে পশ্চিমবঙ্গে বড় সংখ্যক হিন্দু ধীরে ধীরে বিজেপির দিকে চলে যাচ্ছে? এর কারণ, মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল। মানুষ একেবারে তিতিবিরক্ত হয়ে গিয়েছিল তৃণমূলের অঞ্চলভিত্তিক দুর্নীতির কারণে। এটা মানুষকে ক্ষেপিয়ে দিয়েছিল; বিশেষ করে তৃণমূলের প্রধান ভোটার—সমাজের নিম্নবিত্ত এবং নিম্নবর্গের মানুষকে। সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের টাকা পেতে তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে বলে এখন তারা অভিযোগ করছে।

কিন্তু এসব যে হচ্ছে, তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝতে পারলেন না কেন? কারণ, এগুলো জানা এবং বোঝার জন্য তাঁরা আর দলীয় কর্মী- নেতাদের ওপরে ভরসা করছিলেন না। তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, চুরি হচ্ছে এবং দল করছে; কিন্তু কীভাবে রোখা যায়, সেটা তাঁদের জানা ছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁরা আগের নির্বাচনেই নিয়োগ করেছিলেন একটি রাজনীতি ও নির্বাচনবিষয়ক উপদেষ্টা সংস্থাকে—ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (আইপ্যাক)। দলের নেতা–কর্মীরা এখন নিয়মিত বলছেন যে শীর্ষ নেতৃত্বের অতিরিক্ত আইপ্যাক–নির্ভরতা পার্টিকে ভেতর থেকে ফাঁকা করে দিয়েছে, বড় ধরনের ধাক্কা সে আর সামলাতে পারেনি।

আইপ্যাক তৃণমূলের ভেতরের খবর নেতৃত্বকে দিচ্ছিল, কীভাবে দল বা প্রচার চলবে, তার পরিকল্পনা করছিল—এমনকি কাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তও নিচ্ছিল; অর্থাৎ রাজনীতি ‘আউটসোর্সিং’ করে দেওয়া হয়েছিল।

যেসব নেতা–কর্মী এত দিন ‘ক্ষীর’ খাচ্ছিলেন, তাঁরাই সমালোচনায় নেমেছেন, হয়তো তাঁদের প্রকৃত উদ্দেশ্য তৃণমূল কংগ্রেসের সমালোচনা করে বিজেপিতে যোগদান করা। প্রশ্ন হলো, সার্বিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতির এবারে কী হবে, ভারতের বিরোধী রাজনীতিরই–বা কী হবে? আপাতত এর কোনো উত্তর নেই। আর সেই উত্তর না থাকাই ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তি।

  • শুভজিৎ বাগচী প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা

  • মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source