আইনি জটিলতায় দ্বিমুখী জট: প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি দুই-ই আটকে

· Prothom Alo

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকট কাটাতে সরাসরি নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১ হাজার ১২২টি পদের সেই নিয়োগ পরীক্ষা নিয়েও কোনো সুখবর নেই। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এই পরীক্ষার প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছিল। তবে আইনি জটিলতার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি এখন স্থগিত হয়ে গেছে।

একই সঙ্গে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়াটিও আইনি জটিলতায় বন্ধ রয়েছে। ফলে সরাসরি নিয়োগ এবং পদোন্নতি—দুই পথেই প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া এখন পুরোপুরি আটকে আছে। এতে দেশের অর্ধেকের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে।

Visit milkshakeslot.lat for more information.

আদালতের স্থগিতাদেশ ও পিএসসির বক্তব্য—

পিএসসি সূত্র জানায়, ১ হাজার ১২২টি পদের বিপরীতে প্রায় ৭ লাখ চাকরিপ্রার্থী প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন করেছেন। বিপুলসংখ্যক এই পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ও প্রস্তুতির প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে পিএসসির চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মে মাসে এই নিয়োগ পরীক্ষার ওপর আদালত থেকে একটি ছয় মাসের স্টে অর্ডার (স্থগিতাদেশ) এসেছে। ফলে আমরা ইচ্ছা করলেও এখন পরীক্ষাটি নিতে পারছি না। নিয়োগ পরীক্ষা শুরু করার আগে আদালতের বিষয়টি নিষ্পত্তি হতে হবে।’

পরীক্ষার খরচ ও চ্যালেঞ্জের বিষয়ে পিএসসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘প্রায় সাত লাখ প্রার্থীর পরীক্ষা নিতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১১ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা ঢাকা কেন্দ্রে নেওয়া একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে পিএসসি সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেওয়ার সক্ষমতা ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে। আমরা আশা করছি, আদালতের বিষয়টি দ্রুত সুরাহা হলে আমরা পরীক্ষা নেওয়ার তারিখ ঘোষণা করতে পারব।’

অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই

বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি ও মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে অনুমোদিত প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে ৬৫ হাজার ৪৫৭টি। এর বিপরীতে বর্তমানে ৩৪ হাজার ১৫৯টি প্রধান শিক্ষকের পদই শূন্য রয়েছে। এর অর্থ হলো, দেশের অর্ধেকের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।

স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়গুলোর পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশের প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা তদারকিতে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বিশাল এই শূন্য পদের বিপরীতে পিএসসির মাধ্যমে মাত্র ১ হাজার ১২২টি পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। শূন্য পদের তুলনায় এই বিজ্ঞপ্তি অত্যন্ত অপ্রতুল হলেও এখন সেটিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

৮০ শতাংশ পদোন্নতির প্রক্রিয়াও আটকে—

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদের মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার নিয়ম রয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। গত বছর এই বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেতে হলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে অন্তত ১২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে মৌলিক প্রশিক্ষণ ও চাকরি স্থায়ীকরণ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সারা দেশে এমন হাজার হাজার যোগ্য সহকারী শিক্ষক আছেন। কিন্তু একটি চলমান মামলার কারণে মন্ত্রণালয় তাঁদের পদোন্নতি দিতে পারছে না। ফলে পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্যপদ পূরণের প্রক্রিয়াটিতেও কোনো সুখবর নেই। এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে কথা হয় গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সঙ্গে। তিনি বলেন, মূলত আদালতের একটি মামলার কারণে পদোন্নতির প্রক্রিয়াটি থমকে আছে। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই আদালতের মামলার নিষ্পত্তি হবে। মামলার জট খুললেই আমরা বড় আকারে পদোন্নতি দিতে পারব। এই সংকট সমাধানে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং দ্রুতই এর সমাধান হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

বর্তমানে অনেক বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। এতে তাঁদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ছে। স্থায়ী পদ না থাকায় তাঁরা পূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও নিতে পারছেন না।

১ পদের বিপরীতে লড়ছেন ৬২৪ জন—

শিক্ষকসংকট কাটানোর লক্ষ্যে গত বছরের ৩১ আগস্ট ১ হাজার ১২২টি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল পিএসসি। শুরুতে বিজ্ঞপ্তিতে ২ হাজার ১৬৯টি পদের কথা বলা হলেও বিধিমালা সংশোধনের পর পদের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১২২টিতে।

আবেদনের প্রক্রিয়া গত বছরের অক্টোবরে শেষ হয়। এই সামান্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন প্রায় ৭ লাখ চাকরিপ্রার্থী। এই হিসাবে প্রতিটি পদের জন্য গড়ে ৬২৪ জন প্রার্থীকে লড়াই করতে হবে। আবেদনের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা না হওয়ায় চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

পিএসসি জানিয়েছে, এই নিয়োগ পরীক্ষা হবে মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে। এর মধ্যে ৯০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হবে। লিখিত পরীক্ষায় পাসের জন্য ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা পরবর্তী ধাপে ১০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে এবং বিদ্যালয়গুলোতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে দ্রুত এই আইনি জট খোলা জরুরি। আদালতের নির্দেশনা ও সরকারের বিশেষ উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

Read full story at source