পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড় যুগ
· Prothom Alo

মনে হয় এই তো সেদিন। প্রায় ৩০ একর জলাভূমি ভরাট করে তৈরি হয়েছিল পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস। এই ক্যাম্পাসের ১৬ বছর তো হলোই, বিশ্ববিদ্যালয়টিও আগামী ৫ জুন পূর্ণ করতে যাচ্ছে দেড় যুগ। নিজস্ব ক্যাম্পাসে চলছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ উদ্যাপনের প্রস্তুতি।
Visit sport-tr.bet for more information.
এখন বড় বড় ভবন হয়েছে। স্বাধীনতা চত্বর, শহীদ মিনার ও মুক্তমঞ্চের সঙ্গে আনন্দ সরোবর লেক যোগ করেছে আলাদা সৌন্দর্য।
মাত্র ১৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু, সেখানে এখন শিক্ষকের সংখ্যাই ২১৩। পাঁচটি অনুষদের অধীনে ২১টি বিভাগে পড়েন প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী। বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, ফার্মেসি, রসায়ন ও পরিসংখ্যান বিভাগ; প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের অধীনে কম্পিউটার প্রকৌশল, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, তথ্য ও যোগাযোগ প্রকৌশল, পুরকৌশল, স্থাপত্য এবং নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ; ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে ব্যবসায় প্রশাসন এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজম্যান্ট বিভাগ; মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে অর্থনীতি, বাংলা, ইংরেজি, সমাজকর্ম, লোকপ্রশাসন এবং ইতিহাস বিভাগ; জীব ও ভূ–বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ।
সিজিপিএ–২.৭১, অফার পেয়েছেন ১২ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে২০২৫ সালে ইনস্টিটিউট অব ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট নামে একটি ইনস্টিটিউট এবং রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজি ট্রান্সফার সেল ও সেল ফর ন্যাশনাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল কোলাবোরেশন নামে দুটি সেল গঠন করা হয়েছে। শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, পাঠদান পদ্ধতিকে ‘স্মার্ট’ করে তোলার কার্যক্রম চলছে। সেন্ট্রাল লাইব্রেরিকে যেমন অনলাইন পাবলিক অ্যাকসেস ক্যাটালগের আওতায় আনা হয়েছে, ফলে স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বই নিতে পারছেন। অফিস ব্যবস্থাপনায়ও ‘অটোমেশন’ চালু করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, শিগগিরই প্রশাসনিক সব কার্যক্রম হবে ‘পেপারলেস’।
এ অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর পাবনার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করেই বদলেছে আশপাশের এলাকার শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন কিংবা যোগাযোগের পরিবেশ।
লোকপ্রশাসন বিভাগের প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন টাঙ্গাইলের সুমনা খানম। তিন বন্ধুর সঙ্গে ক্যাম্পাসের স্বাধীনতা চত্বরে বসে গল্প করছিলেন। তিনি জানালেন, ভর্তির পর কিছুটা ভয় ছিল; নতুন ক্যাম্পাস, নতুন বন্ধুদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারব তো! তবে কয়েক দিনেই সবাই আপন হয়ে গেছে। একই বিভাগে পড়েন রংপুরের সানজিদা ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, ‘ছোট হলেও আমাদের ক্যাম্পাসটা খুব সুন্দর। নানা রঙের ফুল মন ভালো করে দেয়।’
এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ হাজারের বেশিকুষ্টিয়ার সামিউল আজম পড়েন পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষে। ক্যাম্পাসজীবনে বেশ কিছু পরিবর্তন চোখের সামনেই দেখেছেন। জানালেন, তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন জট নেই। শিক্ষকেরাও বেশ আন্তরিক। শারমিন আক্তার ফার্মেসিতে পড়েছেন। এখন ইন্টার্নশিপ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড় যুগ পূর্তিতে শুভকামনা জানিয়ে বলেন, ‘প্রিয় প্রতিষ্ঠান আরও এগিয়ে যাবে, এটাই প্রত্যাশা।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. ফারুক হোসেন চৌধুরী জানালেন, পড়ালেখার পাশাপাশি নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক, বিতর্ক কিংবা খেলাধুলাতেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ উৎসাহ দেওয়া হয়। এই দপ্তরের উপপরিচালক মো. বাবুল হোসেনের বক্তব্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা গবেষণায় যুক্ত আছেন। অ্যালামনাইরা কাজ করছেন দেশে-বিদেশে।
শিক্ষকতা, সরকারি-বেসরকারি চাকরির পাশাপাশি নিজস্ব সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগও নিয়েছেন অনেকে। মুঠোফোনে কথা হয় প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কয়েজনের সঙ্গে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী জ্যোতি পাল ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস থেকে ডক্টর অব ফিলোসফি ডিগ্রি নিয়েছেন। নিঝুম রহমান যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছেন দশম ব্যাচের মাহবুবুল আলম। বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন কম্পিউটার বিজ্ঞানেরই আরেক শিক্ষার্থী মনিরুল ইসলাম। তিনি কম্পিউটার ভিশন, মেশিন নার্নিং, ডিপ লার্নিংসহ নানা বিষয়ে গবেষণা করছেন।
গবেষণা ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু সাফল্য আছে। প্রথম ব্যাচের ছাত্র তরুণ দেবনাথ আবিষ্কার করেছেন ‘স্মার্ট হুইলচেয়ার’। মুঠোফোনে নিয়ন্ত্রিত এই চেয়ার মানুষের জীবন সহজ করবে। অহিদুর রহমান উদ্ভাবন করেছেন পরিত্যক্ত পলিথিন থেকে জ্বালানি গ্যাস। এর মাধ্যমে একদিক দিয়ে পরিবেশে পলিথিন কমবে, অন্যদিকে সাশ্রয় হবে জ্বালানি খরচ। ‘প্যারেন্ট লিংক’ নামে একটি অ্যাপ তৈরি করেছেন ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী খায়রুল বাসার। এই অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই সন্তানের পড়ালেখার খবরাখবর পাবেন অভিভাবকেরা।
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। উচ্চতর ডিগ্রি নিতে দেশের বাইরে আছেন কেউ কেউ।
সদ্যই এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপচার্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব অ্যাগ্রিকালচাল অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্টের (এসএআরডি) মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল হাসনাত মোহা শামীম। তিনি বলেন, ‘বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শ্রমবাজারের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র নেই। কোথায় কত লোক লাগবে, কোথায় চাকরির সুযোগ আছে, সে বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই। ফলে দিন দিন শিক্ষিত বেকার বাড়ছে। আমরা শিক্ষিত বেকার বানাতে চাই না। পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ করতে চাই। আমি মনে করি, কারগরি কোনো বিদ্যা বৃথা যায় না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আশপাশের গ্রাম ও স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীদেরও বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে চাই, যেন ছোটবেলা থেকেই তারা দক্ষ হয়ে ওঠে। পাশাপাশি আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের মানবিক ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ করে গড়ে তুলতে চাই যেন তাঁরা দেশ ও দেশের মানুষ নিয়ে ভাবে। আশা করছি ১৮ বছরের এই বিশ্ববিদ্যালয় একদিন বিশ্বদরবারের নজর কাড়বে।’
পূর্ণ বৃত্তিসহ যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করছেন মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজের সাব্বির