অ্যালিয়েন অ্যাটাক - ৯
· Prothom Alo

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের গোপন ইউএফও ফাইলগুলো প্রকাশ করেছে। এরপর থেকেই সারা বিশ্বে নতুন করে শুরু হয়েছে জল্পনাকল্পনা। এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কি আসলেই একা? নাকি ভিনগ্রহে লুকিয়ে আছে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী? যদি সত্যিই তাদের অস্তিত্ব থাকে, তারা যদি হলিউড মুভির মতো হঠাৎ পৃথিবী আক্রমণ করে, তাহলে কী হবে? বিজ্ঞান কী বলে? সত্যিই কি ভিনগ্রহের প্রাণীরা আমাদের জন্য হুমকি হতে পারে?
Visit turconews.click for more information.
এসব কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ে। সূক্ষ্ম রসিকতা ও নিখাদ বিজ্ঞানের দারুণ মিশেলে লেখা রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কয়েকটি অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ভিনগ্রহীদের আক্রমণ নিয়ে লেখা এই অধ্যায়টি অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ। আজ পড়ুন ষষ্ঠ অধ্যায়ের নবম পর্ব।
অসীম সাহসে যাত্রা
ধরুন, আমরা মানুষেরা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম, মহাকাশ গবেষণায় প্রচুর টাকা ঢালব। সত্যিই অনেক টাকা! আমরা অন্য নক্ষত্রগুলোতে আমাদের মহাকাশযান বা প্রোব পাঠাতে চাই। কাজটা মোটেও সহজ নয়। আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র হলো আলফা সেন্টাউরি। সেখানে সূর্যের মতো একটি নক্ষত্র আছে এবং এটি পর্যবেক্ষণ করার মতো একটা জায়গা। কিন্তু এটিও আমাদের থেকে প্রায় ২৬ লাখ কোটি মাইল দূরে! এখন পর্যন্ত মানুষের তৈরি সবচেয়ে দ্রুতগতির মহাকাশযানেরও সেখানে পৌঁছাতে কয়েক হাজার বছর লেগে যাবে। তাই খুব শিগগিরই সেখান থেকে সুন্দর সুন্দর ছবি পাওয়ার কোনো আশা আমরা করতে পারি না।
তবে এটা হলো এখন পর্যন্ত তৈরি করা সবচেয়ে দ্রুতগতির মহাকাশযানের হিসাব। বিজ্ঞানীদের ড্রয়িং বোর্ডে এমন অনেক নতুন যানের নকশা আছে, যেগুলো আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ছুটতে পারবে। এগুলোর মধ্যে আছে ফিউশন চালিত যান ও আয়ন ড্রাইভ। আয়ন ড্রাইভে শুরুতে ধীরে চললেও বছরের পর বছর ধরে একটানা গতি বাড়িয়ে এক ভয়ংকর গতিতে পৌঁছাতে পারে। এমনকি এমন ধারণাও আছে যে, রকেটের পেছনে একের পর এক পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রচন্ড গতির ধাক্কা তৈরি করবে।১ এই পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করলে কয়েক হাজার বছরের যাত্রাপথ মাত্র কয়েক দশকে নেমে আসতে পারে।
কাজটা করার মতো। হ্যাঁ, এটা অনেক ব্যয়বহুল। কিন্তু এই ধারণার পথে কোনো প্রযুক্তিগত বাধা নেই। বাধাগুলো হলো সামাজিক। ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করে বলি। আমাদের যদি সত্যিই সদিচ্ছা থাকে, তবে আমরা এখনই এমন মহাকাশযান তৈরি করতে পারি। এক শতাব্দীরও কম সময়ের মধ্যে আমরা অন্য নক্ষত্রগুলোতে ডজন ডজন আন্তঃনক্ষত্র দূত পাঠাতে পারি। সেগুলো গ্যালাক্সিতে আমাদের আপন প্রতিবেশীদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে পারে।
বিজ্ঞানীদের ড্রয়িং বোর্ডে এমন অনেক নতুন যানের নকশা আছে, যেগুলো আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ছুটতে পারবে। এগুলোর মধ্যে আছে ফিউশন চালিত যান ও আয়ন ড্রাইভ।
অবশ্য যাতায়াতের সময় এবং এত বিশাল মহাকাশযানের বহর তৈরি করাটা বেশ কঠিন কাজ। গ্যালাক্সিতে হাজার হাজার কোটি নক্ষত্র আছে। এত মহাকাশযান বানানো একেবারেই অসম্ভব। প্রতিটি নক্ষত্রের জন্য একটি করে যান পাঠানোও আর্থিকভাবে লাভজনক নয়। এমনকি আমরা যদি একটি যানকে এক নক্ষত্র থেকে শুধু ছবি তুলে পরের নক্ষত্রের দিকে পাঠিয়েও দিই, তবুও পুরো গ্যালাক্সি ঘুরে দেখতে অনন্তকাল লেগে যাবে। কারণ মহাকাশ অনেক বিশাল।
কিন্তু এর একটা চমৎকার সমাধান আছে। নিজে নিজেই প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে এমন মহাকাশযান বানাতে হবে!
দৃশ্যটা একটু কল্পনা করুন। পৃথিবী থেকে পাঠানো মানবহীন একটি মহাকাশযান ৫০ বছর যাত্রা করার পর টাউ সেটি নামে একটি নক্ষত্রের কাছে পৌঁছাল। সেখানে সে বেশ কয়েকটি ছোট গ্রহ খুঁজে পেল এবং তার বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ শুরু করল। এর মধ্যে একধরনের শুমারিও আছে। সে ওই নক্ষত্রজগতের গ্রহ, ধূমকেতু, চাঁদ এবং গ্রহাণুগুলোর পরিমাপ নিল। কয়েক মাস জরিপ করার পর প্রোবটি তার তালিকার পরের নক্ষত্রের দিকে উড়াল দেবে। তবে যাওয়ার আগে সে নিকেল-লোহার তৈরি সম্ভাবনাময় একটি গ্রহাণুর বুকে একটি ছোট বাক্স ছুড়ে দেবে।
দৃশ্যটা একটু কল্পনা করুন। পৃথিবী থেকে পাঠানো মানবহীন একটি মহাকাশযান ৫০ বছর যাত্রা করার পর টাউ সেটি নামে একটি নক্ষত্রের কাছে পৌঁছাল। সেখানে সে বেশ কয়েকটি ছোট গ্রহ খুঁজে পেল।
এই বাক্সটি আসলে নিজে নিজে চালু হতে পারে এমন একটি কারখানা। গ্রহাণুতে নামার পরই সে পাথর খুঁড়তে শুরু করবে, ধাতু গলাবে, প্রয়োজনীয় পদার্থগুলো আলাদা করবে এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন প্রোব বা মহাকাশযান তৈরি করতে শুরু করবে। ধরে নিই, সে মাত্র একটি নতুন যান তৈরি করল। কয়েক বছর ধরে তৈরি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সেই নতুন যানটি অন্য আরেকটি নক্ষত্রের দিকে উড়ে গেল। এখন আমাদের হাতে দুটি মহাকাশযান আছে। কয়েক দশক পর তারা যার যার গন্তব্যে পৌঁছাল, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল খুঁজে পেল এবং আবারও নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করল। এখন আমাদের যান হয়ে গেল চারটি। আর এভাবেই চক্রটা চলতে থাকবে।
এই রোবট দূতগুলোর সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়তে থাকবে। বৃদ্ধির হারটা হবে জ্যামিতিক হারে। যদি প্রতিটি যান তৈরি হতে ঠিক একশ বছরও সময় লাগে, তবে এক হাজার বছর শেষে আমাদের কাছে ১০২৪টি মহাকাশযান থাকবে। দুই হাজার বছর পর এই সংখ্যা দাঁড়াবে দশ লাখে। আর তিন হাজার বছর পর ১০০ কোটিরও বেশি যান থাকবে! বাস্তবতায় বিষয়টা অবশ্য এত সহজ নয়। কিন্তু সবচেয়ে নিরাশাবাদী হিসাব করলেও দেখা যায়, এই গ্যালাক্সির প্রতিটি নক্ষত্র ঘুরে দেখতে আমাদের বড়জোর ৫ কোটি বছর বা তার চেয়েও কিছুটা কম সময় লাগবে।
সময়টা বেশ দীর্ঘ মনে হচ্ছে, তাই না? আর এই কাজটা করার সক্ষমতা অর্জন করতেও আমাদের এখনো অনেক দেরি। এর প্রযুক্তি বেশ ভয়ংকর এবং জটিল।
যদি প্রতিটি যান তৈরি হতে ঠিক একশ বছরও সময় লাগে, তবে এক হাজার বছর শেষে আমাদের কাছে ১০২৪টি মহাকাশযান থাকবে। দুই হাজার বছর পর এই সংখ্যা দাঁড়াবে দশ লাখে।
কিন্তু একটু দাঁড়ান। আমাদের চেয়ে ১০ কোটি বছর এগিয়ে থাকা সেই সভ্যতার কথা মনে আছে? এত বিশাল একটা সময় পেলে তারা খুব সহজেই মিল্কিওয়ের প্রতিটি নক্ষত্রে প্রাণের সন্ধান করে ফেলতে পারত। তারা যদি আমাদের এই উষ্ণ ও নীল পৃথিবীটাকে দেখত, তবে নিশ্চয়ই কোথাও তা টুকে রাখত। এমনও হতে পারে, তারা হয়তো ৫ কোটি বছর আগেই পৃথিবীতে এসেছিল এবং আমাদের অর্থাৎ মানুষকে দেখতে পায়নি। অথবা এমনও হতে পারে, তারা এখনো আমাদের এখানে এসে পৌঁছায়নি।
কিন্তু সময়ের এই বিশাল হিসাব বিবেচনা করলে, তারা এখনো এসে পৌঁছায়নি; এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ পুরো গ্যালাক্সির মানচিত্র তৈরি করা এবং উপযুক্ত গ্রহগুলোতে ঘুরে আসার জন্য এত লম্বা সময়ের প্রয়োজন নেই। আর ঠিক এ কারণেই আমার মনে হয় না, ড্রেক সমীকরণের ওই লাখ লাখ সভ্যতার হিসাবটা সঠিক। এত দিনে আমরা নিশ্চয়ই তাদের দেখতে পেতাম, বা অন্তত তাদের কোনো সাড়াশব্দ পেতাম।২
চলবে…ফিলিপ প্লেইট, ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনেটীকা১. ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে প্রজেক্ট অরায়ন নামে নাসার এমন একটি গোপন প্রকল্প সত্যিই ছিল। এই প্রকল্পে পরমাণু বোমা ফাটিয়ে মহাকাশযান চালানোর নকশা করা হয়েছিল, যা তাত্ত্বিকভাবে মহাকাশযানকে আলোর গতির কাছাকাছি বেগে নিয়ে যেতে পারত।২. মহাবিশ্বের বিশাল আকার ও বয়স বিবেচনায় ভিনগ্রহীদের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা প্রবল, কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের কোনো প্রমাণ না পাওয়ার এই আপাত বিরোধিতাকেই বিজ্ঞানের ভাষায় ফার্মি প্যারাডক্স বলা হয়। আমরা যদি তাদের সাড়াশব্দ না পাই, তবে তার অর্থ হতে পারে আমরা সত্যিই মহাবিশ্বে একা, অথবা আন্তঃনক্ষত্র ভ্রমণ এতই কঠিন যে কোনো সভ্যতাই তা করে উঠতে পারেনি।অ্যালিয়েন অ্যাটাক – ১অ্যালিয়েন অ্যাটাক – ২অ্যালিয়েন অ্যাটাক – ৩অ্যালিয়েন অ্যাটাক - ৪ অ্যালিয়েন অ্যাটাক - ৫