পাথরঘাটায় জেলেদের জালে ধরা সামুদ্রিক যান নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
· Prothom Alo

বরগুনার পাথরঘাটা উপকূলে জেলেদের জালে ধরা পড়া রহস্যময় সামুদ্রিক যানটি নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জেলা পুলিশ জানিয়েছে, যানটি এখন নৌবাহিনীর হেফাজতে আছে। বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা আজ মঙ্গলবার বেলা পৌনে একটার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যানটি আমরা নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছি।’
Visit tr-sport.click for more information.
জেলেদের কাছ থেকে খবর পেয়ে বস্তুটি উদ্ধার করেন পাথরঘাটা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সোহান। তিনি আজ দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল সোমবার রাতেই কোস্টগার্ডের মাধ্যমে বস্তুটি ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে কোস্টগার্ডের দক্ষিণ জোনের মিডিয়া কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা মন্তব্য করতে চাননি। তবে কোস্টগার্ডের একটি অসমর্থিত সূত্র জানিয়েছে, যানটি প্রথমে কোস্টগার্ডের হেফাজতে নেওয়া হয় এবং পরে নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। নৌবাহিনী এর ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
গত রোববার বিকেলে বরগুনার পাথরঘাটার একটি মাছ ধরার ট্রলারের জেলেরা বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার সময় জালে একটি যান্ত্রিক বস্তু পান। বস্তুটি দেখতে অনেকটা পানির নিচে চলাচলকারী স্বয়ংক্রিয় যানের মতো। প্রায় আট ফুট দীর্ঘ লাল-হলুদ রঙের যন্ত্রটি উদ্ধারের পর স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়, প্রশাসন ও গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়।
বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে উঠে আসা ‘স্বয়ংক্রিয় সামুদ্রিক যান’ নিয়ে কৌতূহলগবেষণা যান হওয়ার ধারণা বিশেষজ্ঞদের
দেশের সামুদ্রিক প্রাণিবিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি ‘অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল’ (এইউভি) বা পানির নিচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলকারী গবেষণা যান হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমুদ্র গবেষণা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, সমুদ্রতলের মানচিত্রায়ণ, জলবায়ুবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ এবং সামরিক নজরদারির কাজে এ ধরনের যান ব্যবহার করা হয়। তবে বাংলাদেশের উপকূলসংলগ্ন সমুদ্রে এমন একটি যান কীভাবে এল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উদ্ধার হওয়া যানটি টর্পেডোর মতো দীর্ঘ সিলিন্ডার আকৃতির। এর দুই প্রান্ত গোলাকার ও পেছনের অংশে স্থিতিশীলতার জন্য ফ্যান বা পাখা আছে। ওপরের অংশ খুললে ভেতরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মডিউল, ব্যাটারি ইউনিট, সেন্সর, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং অ্যানটেনাসদৃশ যোগাযোগযন্ত্র দেখা যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও সামুদ্রিক প্রাণিবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আবদুল আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায়, এটি একটি অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল বা এইউভি। আমাদের সমুদ্রসীমায় নিয়মিত এ ধরনের যান ব্যবহারের তথ্য আমার জানা নেই। তবে ছবিতে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে এটি সচল অবস্থায় ছিল না। সম্ভবত যান্ত্রিক ত্রুটি বা শক্তি হারানোর কারণে স্রোতের টানে উপকূলের দিকে ভেসে এসেছে।’
এই প্রাণিবিজ্ঞানীর মতে, এ ধরনের যান সাধারণত দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসে অথবা সংগৃহীত তথ্য প্রেরণ করে।
বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, আবহাওয়া সংস্থা, নৌবাহিনী ও অফশোর তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো নিয়মিত এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে জানিয়ে আবদুল আজিজ আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে এমন যান ব্যবহারের বিষয়ে আমার কাছে তথ্য নেই। আর যদি এটা অন্য কোনো দেশের হয়ে থাকে, তাহলে অচল হওয়ার পর যানটি ভাসতে ভাসতে আমাদের জলসীমায় চলে আসতে পারে।’
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সমুদ্রপ্রাণী গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘এ ধরনের যান যদি আমাদের সমুদ্র গবেষণায় ব্যবহৃত না হয়ে থাকে, তাহলে এটি কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্যে আমাদের সমুদ্রসীমায় এসেছে, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, বাংলাদেশের উপকূলে প্রকাশ্যে এমন প্রযুক্তিগত যন্ত্র উদ্ধারের ঘটনা বিরল। একই সঙ্গে ঘটনাটি বঙ্গোপসাগরে পরিচালিত আন্তর্জাতিক সমুদ্র গবেষণা, জলবায়ু পর্যবেক্ষণ, সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান এবং আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর প্রকৃত পরিচয় জানা গেলে সমুদ্র গবেষণা ও সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
যানটির পরিচয় কীভাবে শনাক্ত করা সম্ভব, এমন প্রশ্নের জবাবে মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, এর গায়ে থাকা সিরিয়াল নম্বর, প্রস্তুতকারকের নাম, মেমোরিতে সংরক্ষিত তথ্য, সেন্সরের বিন্যাস এবং যোগাযোগব্যবস্থার প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ তথ্য সংরক্ষিত থাকলে এটি কোথা থেকে এসেছে, কত দিন সমুদ্রে ছিল এবং কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছিল, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।