ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত বিচারের চেয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত বেশি জরুরি
· Prothom Alo

ধর্ষণ মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার প্রবণতা ন্যায়বিচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আইনবিশেষজ্ঞ এবং অধিকারকর্মীরা। তাঁরা বলছেন, দ্রুত বিচারের চেয়ে সঠিক তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সমাজে সচেতনতা তৈরির ওপরও জোর দেন তাঁরা।
Visit rouesnews.click for more information.
আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘ধর্ষণ ও নির্যাতন: আইনগত সুরক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। ‘ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট’–এর ব্যানারে সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)।
সভায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী বলেন, বিচার তাড়াতাড়ি করতে পারলে ভালো অবশ্যই। তবে সঠিক তদন্তকে বাদ দিয়ে নয়। ১৯৮৯ সালের শারমিন রিমা হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তাড়াতাড়ি সাজা হয়েছে। তাড়াতাড়ি অলমোস্ট ফাঁসিও হয়ে গেছে।…এই কেস ফাঁসির কেস ছিল না…এটা যাবজ্জীবনের কেস ছিল। এই কেসে ফাঁসি হয়েছে এই কারণে যে রিমার বাবা একজন সাংবাদিক ছিলেন।’
বিচারপতি ইমান আলী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারী সংস্থাও বাধাপ্রাপ্ত হয়। কারণ, অভিযুক্তরা অর্থ, সামাজিক মর্যাদা বা রাজনৈতিক সংযোগে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে থাকেন। ফলে তদন্তই শেষ হয় না। ভুক্তভোগী এফআইআরই করতে পারেন না। বিচারব্যবস্থার মধ্যেও অনেক বাধা থাকে। তাঁর মতে, আইন পরিবর্তন করে তেমন কিছু হবে না। সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। সমাজে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
আইন কমিশনের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জিনাত আরা সতর্ক করেন যে বিচারের সময়সীমা বাধ্যতামূলক করার তিক্ত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আছে। তিনি বলেন, একসময় মামলা নিষ্পত্তির জন্য বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেক মামলা শেষ করা সম্ভব হয়নি। এরপর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আবেদনও অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো করা হয়নি। ফলে হত্যা ও জোড়া হত্যাসহ শত শত গুরুতর মামলায় আসামিরা আইনি সুবিধা পেয়ে মুক্তি পেয়ে যান।
জিনাত আরা মনে করেন, বিচারের সব পর্যায়েই সমস্যার মূলে রয়েছে নৈতিকতার অভাব। তিনি বলেন, সব জায়গায় যদি প্রত্যেকে সততার সঙ্গে কাজ করেন, তাহলে সবকিছু্ই সময়মতো করা সম্ভব।
‘আতঙ্ক প্রকাশ করছি’
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে শিশুহত্যার ঘটনায় করা মামলার রায়ে প্রতিক্রিয়া জানান সাবেক নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক। তিনি বলেন, ‘এভাবে যে ১৯ দিনের মাথায় সব শেষ করে ফেলা হলো; এটাতে অনেকে আনন্দিত হয়েছেন, আনন্দ প্রকাশ করেছেন, স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। আমি স্বস্তিও প্রকাশ করতে পারছি না, আনন্দ তো নয়ই, বরঞ্চ আমি আতঙ্ক প্রকাশ করছি যে আমাদের ভবিষ্যতে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে এটা কোনো দিকনির্দেশনা দেয়।’
অন্যায় বিচার যেন না হয়
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, একেকটা চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটলে সবার বিবেকে নাড়া দেয়। কিন্তু প্রত্যেক ঘটনাকে চাঞ্চল্যকর করা সম্ভব নয় এবং চাঞ্চল্যকর ঘটনা না হলে বিচার পাবে না, এটাও হতে পারে না।
সারা হোসেন বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলে বিচার বিভাগের ওপর রোষানল তৈরি হয়। কিন্তু বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষ যে বিচার পাচ্ছে, সেটা নিয়ে অত বেশি কথা হয় না। বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক মাইলফলক রায় হয়েছে। ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাচ্ছে। এবং এটাও নিশ্চিত করা হচ্ছে যে বিচারের নামে অন্যায় বিচার যাতে না হয়।
‘ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট’–এর ব্যানারে ‘ধর্ষণ ও নির্যাতন: আইনগত সুরক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় আয়োজন করে ব্লাস্টসুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সবার
সভায় ধর্ষণের ঘটনা এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন সাংবাদিক কুররাতুল–আইন–তাহমিনা। তিনি বলেন, ধর্ষণের ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখার বিষয়টি শুধু আইনের প্রশ্ন নয়, সাংবাদিকতার নৈতিকতারও প্রশ্ন। যেহেতু ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা গণমাধ্যম দিতে পারবে না, তাই তাঁর ক্ষতি বা বিপদ বাড়ানোর কোনো অধিকারও গণমাধ্যমের নেই।
তবে পুলিশ প্রেস কনফারেন্স করে নাম বললে, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কেউ ভুক্তভোগীর ঠিকানায় গেলে, অধিকারকর্মীরা ভুক্তভোগীর ছবিসংবলিত ব্যানার নিয়ে সড়কে আন্দোলন করলে কী হবে—সেই প্রশ্ন তুলে জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক বলে, ‘একা মিডিয়া এটা করতে পারবে না। যে সুরক্ষা আমরা দিতে চাচ্ছি, এই সুরক্ষাটা দিতে হবে আসলে পুলিশ থেকে শুরু করে সবাইকে।’
সভায় উপস্থাপনা দেন ব্লাস্টের প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট ইসরাত জাহান। এতে আলোচক হিসেবে আরও ছিলেন ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার লিজা বেগম, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান, কাজী জাহেদ ইকবাল, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদা রেহানা বেগম প্রমুখ। সভাটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন।