পৃথিবীর সব পিঁপড়ার ওজন কি সব মানুষের ওজনের প্রায় সমান

· Prothom Alo

একটি কথা বলি, শুনলে প্রথমে বিশ্বাস না-ও করতে পারেন। একসময় মনে করা হতো, পৃথিবীর সব পিঁপড়াকে যদি এক পাল্লায় এবং সব মানুষকে অন্য পাল্লায় তোলা যায়—তবে দুটো পাল্লা প্রায় সমান থাকবে! হ্যাঁ, সেই খুদে প্রাণী পিঁপড়া, যাকে আপনি অনেক সময় না দেখেই পায়ের নিচে মাড়িয়ে চলে যান। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা।

 সংখ্যাটা আগে মাথায় ঢোকানো দরকার

২০২২ সালে পিএনএএস সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, পৃথিবীতে পিঁপড়ার সংখ্যা প্রায় ২০ কোয়াড্রিলিয়ন। সংখ্যাটা দেখতে ঠিক এ রকম—২০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০। অর্থাৎ ২-এর পর ১৬টি শূন্য!

Visit betsport.cv for more information.

এই সংখ্যায় পৌঁছানোর পদ্ধতিটাও বলার মতো। পিঁপড়া তো আর লাইন ধরে গোনা যায় না। তাই গবেষকেরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪৮৯টি আলাদা গবেষণার তথ্য জড়ো করেছেন। প্রতিটিতে মাপা হয়েছে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় প্রতি বর্গমিটারে কতটা পিঁপড়া আছে। সেই ঘনত্বকে পুরো পৃথিবীর স্থলভাগের আয়তন দিয়ে গুণ করলে যা বেরোয়, সেটাই ওই সংখ্যা। শুধু স্থলভাগ নয়; গাছের ডালে, পাতার নিচে, এমনকি মাটির বেশ গভীরেও পিঁপড়ার বাসা থাকে—সেগুলোও হিসাবে ধরা হয়েছে। এখানে অনুমান আছে ঠিকই, কিন্তু সেটি কোনো এলোমেলো অনুমান নয়।

পৃথিবীতে এখন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের বিপরীতে পৃথিবীতে প্রায় আড়াই লাখ পিঁপড়া রয়েছে!

পিঁপড়া সমাজে রানিকেই ছিঁড়ে খেল প্রজারা, কিন্তু কেন
গবেষকেরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪৮৯টি আলাদা গবেষণার তথ্য জড়ো করেছেন। প্রতিটিতে মাপা হয়েছে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় প্রতি বর্গমিটারে কতটা পিঁপড়া আছে।

ওজনের হিসাব কীভাবে হয়

পিঁপড়ার প্রজাতি আছে ২০ হাজারের বেশি। ছোট প্রজাতির ওজন মাত্র ১ মিলিগ্রামের কাছাকাছি। বড় প্রজাতি, যেমন আফ্রিকার ড্রাইভার অ্যান্ট বা দক্ষিণ আমেরিকার বুলেট অ্যান্ট ৬০ থেকে ১৫০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হয়। গড় ধরলে একটি পিঁপড়ার ওজন প্রায় ২ থেকে ৩ মিলিগ্রাম।

তবে বিজ্ঞানীরা কিন্তু সরাসরি ওজন দিয়ে তুলনা করেন না। করেন কার্বন ভর দিয়ে। কারণটা সহজ, প্রাণীর শরীরে পানির পরিমাণ আলাদা হয়, কিন্তু কার্বনের অনুপাত মোটামুটি একই থাকে। তাই কার্বন দিয়ে তুলনা করলে হিসাবটা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য হয়। একটি পিঁপড়ার শরীরের শুকনো ভরের প্রায় অর্ধেকটাই কার্বন; এটি প্রায় সব পোকামাকড়ের ক্ষেত্রেই সত্যি।

গড় ধরলে একটি পিঁপড়ার ওজন প্রায় ২ থেকে ৩ মিলিগ্রাম

গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর সব পিঁপড়ার কার্বন ভর মিলিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ মেগাটন। অর্থাৎ ১ কোটি ২০ লাখ টন কার্বন। এবার মানুষের দিকে তাকানো যাক। ৮০০ কোটি মানুষ, গড় ওজন ৬২ কেজি। মানুষের শরীরে কার্বনের অনুপাত প্রায় ১৬ শতাংশ। সেখান থেকে কার্বন ভর বের করলে তা দাঁড়ায় প্রায় ৬০ মেগাটন।

অর্থাৎ ১২ বনাম ৬০! মানুষের ওজনের সমান না হলেও পিঁপড়ার এই সম্মিলিত ভর কিন্তু বিশাল।

পিঁপড়া কামড় দিলে কী হয়
গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর সব পিঁপড়ার কার্বন ভর মিলিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ মেগাটন। অর্থাৎ ১ কোটি ২০ লাখ টন কার্বন। এবার মানুষের দিকে তাকানো যাক। ৮০০ কোটি মানুষ, গড় ওজন ৬২ কেজি।

এই তুলনার মানে কী

এই পুরো হিসাবের পেছনে একটি ধারণা আছে—বায়োমাস বা কোনো প্রজাতির সব সদস্যের মোট জৈব ভর। বিজ্ঞানীরা এটি দিয়ে বোঝেন, কোনো প্রজাতি পৃথিবীতে আসলে কতটা জায়গা নিয়ে আছে। শুধু কতটা এলাকায় ঘুরছে তা-ই নয়, বরং পুরো পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যে তার অবদান আর উপস্থিতি কতটা গভীর, সেটিও এর মাধ্যমে বোঝা যায়।

পৃথিবীর সব বুনো পাখির মোট বায়োমাসের চেয়েও শুধু পিঁপড়াদের ভর বেশি!

পিঁপড়ার বায়োমাস জেনে বিজ্ঞানীরা নিজেরাই একটু থমকে গিয়েছিলেন। মানুষের সমান না হলেও পিঁপড়ারা পৃথিবীর সব বুনো স্তন্যপায়ী প্রাণী মিলিয়ে যা হয়, তার চেয়েও বেশি ভারী। বাঘ, সিংহ, হাতি, নীল তিমি—সব বন্য স্তন্যপায়ীকে একসঙ্গে দাঁড়িপাল্লায় তুললেও পিঁপড়ারা ভারী হবে। এমনকি পৃথিবীর সব বুনো পাখির মোট বায়োমাসের চেয়েও শুধু পিঁপড়াদের ভর বেশি!

খুদে প্রাণী, কিন্তু সংখ্যায় ও ভরে এতটাই বেশি যে পৃথিবীর হিসাব ওদের ছাড়া মেলে না।

পিঁপড়া–সমাজ
একটি পিঁপড়া নিজের ওজনের ১০ থেকে ৫০ গুণ ভার বহন করতে পারে। মানুষের শরীরে এই ক্ষমতা থাকলে আপনি একটি প্রাইভেট কার কাঁধে নিয়ে হাঁটতে পারতেন!

পিঁপড়া না থাকলে কী হতো

পিঁপড়া মাটি খোঁড়ে। এতে মাটির ভেতরে বাতাস ঢোকে, পানি ঢোকে, গাছের শিকড় বাঁচে। বীজ বহন করে দূরে নিয়ে যায়, নতুন গাছ জন্মায়। মরা পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে। এই কাজগুলো চুপচাপ চলছে, কেউ খেয়াল করে না।

আসলে পিঁপড়া পৃথিবীতে আছে প্রায় ১৪ কোটি বছর ধরে। ডাইনোসর যখন ঘুরে বেড়াত, তখনও পিঁপড়া ছিল। ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু পিঁপড়া টিকে আছে। এরা মরুভূমিতে টিকে থাকে, বরফের কাছাকাছি অঞ্চলেও টিকে থাকে, বৃষ্টিঅরণ্যে তো কথাই নেই। এই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাটাই ওদের এত সফল করেছে।

পিঁপড়া পৃথিবীতে আছে প্রায় ১৪ কোটি বছর ধরে

আর একটি পিঁপড়া নিজের ওজনের ১০ থেকে ৫০ গুণ ভার বহন করতে পারে। মানুষের শরীরে এই ক্ষমতা থাকলে আপনি একটি প্রাইভেট কার কাঁধে নিয়ে হাঁটতে পারতেন!

তাই পরেরবার পিঁপড়ার সারি দেখলে একটু দাঁড়াবেন। ওরা পৃথিবীর অন্যতম সফল প্রজাতি—সংখ্যায়, ভরে এবং গুরুত্বে। আমাদের চেয়ে অনেক আগে থেকে পৃথিবীতে আছে, হয়তো অনেক পরেও থাকবে।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: বিবিসি, পিএনএএসপিঁপড়া কি উড়তে পারে?

Read full story at source