দুর্যোগে সতর্কবার্তা মানলে ঝুঁকি কমবে
· Prothom Alo
মৌসুমি ও আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙন ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে চলেছে দেশে। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য এখন ঝুঁকির মুখে। বজ্রপাতেও ব্যাপক হারে প্রাণহানি ঘটছে। ঝড়, বন্যা, অতিবৃষ্টি ও বজ্রপাতের মতো দুর্যোগের আগাম বার্তা প্রচার ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ আয়োজিত মিডিয়া সংলাপে এ মন্তব্য করেন বক্তারা।
‘আবহাওয়া, দুর্যোগ ও জনস্বার্থে সাংবাদিকতা’ শীর্ষক সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয় প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে। বক্তারা বলেন, দুর্যোগে সতর্কবার্তা মানলে ঝুঁকি কমবে। প্রান্তিক মানুষকে দুর্যোগ থেকে রক্ষায় আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছাতে সরকারি–বেসরকারি সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তাঁরা।
Visit turconews.click for more information.
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিরক্ষাসচিব মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, ঝড়সহ দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা সাংবাদিকেরা মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিচ্ছেন। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, এখন মৃত্যুর সংখ্যা ২০–এর নিচে নেমে এসেছে। আগাম বার্তার মাধ্যমে দুর্যোগে যেভাবে মানুষের প্রাণহানি ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতি কমিয়ে আনা গেছে, সেভাবে ফসলের ক্ষয়ক্ষতিও কমিয়ে আনা দরকার। বোধগম্য ও নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তা পৌঁছাতে হবে মানুষের কাছে। মানুষকে বোঝাতে হবে দুর্যোগের সময় তিনি নিজের সম্পদ মাটিতে পুঁতে রেখে বা সঙ্গে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে পারবেন।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, দুর্যোগের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী, মেয়েশিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রান্তিক মানুষেরা। দুর্যোগের সময় আগাম বার্তা ও দুর্যোগ–পরবর্তী সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে এসব মানুষের। বজ্রপাতের আগাম বার্তা কীভাবে জানা যাবে, কী ব্যবস্থা নিতে হবে, সে বিষয়ে তথ্য প্রচার করতে হবে। সরকারি–বেসরকারি সম্মিলিত উদ্যোগ ও সংবাদমাধ্যমের সহায়তায় দুর্যোগে মানুষের প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ১৩ নম্বর দুর্যোগপ্রবণ দেশ। দুর্যোগ মোকাবিলায় সম্মিলিত কর্মকাণ্ডের ফলে তিন ধাপ দিয়ে এগিয়েছে দেশটি। এখন বহুমুখী ব্যবহারোপযোগী করে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। স্বাভাবিক সময়ে এই কেন্দ্রগুলো স্কুল ও দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব কেন্দ্রে গবাদিপশু রাখা যায়। রান্নার ব্যবস্থা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রশস্ত টয়লেট রয়েছে। অনেকে গবাদিপশু ও সম্পদের কথা ভেবে আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে চান না। তাঁদের কাছে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা সুবিধাগুলোর বিষয়ে বেশি করে তথ্য প্রচার করতে হবে, যাতে প্রাণহানি আরও কমে আসে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (প্রশাসন) ও যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ নাজমুল আবেদীন বলেন, তাঁর মন্ত্রণালয় ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা পেয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষকে নিয়ে আসার কাজ করে। এ কাজে ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন। তবে দেখা যায়, আগাম বার্তার কথা বলা হলেও এলাকার লোকজন সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে কী খবর এসেছে, তা দেখতে চান। ফলে সংবাদমাধ্যম যদি আগাম বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়ে উদ্ধুদ্বু করে, তাহলে প্রাণহানি আরও কমবে।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোমেনুল ইসলাম বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, আগাম বার্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বজুড়ে অনুকরণীয় মডেল। বন্যা, ঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে সঠিক আগাম বার্তা যেমন প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে, তেমনি ভুয়া ও অপতথ্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবহাওয়ার সঠিক তথ্য সহজ ভাষায় প্রচার করে মানুষকে দুর্যোগের ক্ষতি থেকে রক্ষায় সংবাদমাধ্যমকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সাংবাদিকেরা বন্যার সময় তথ্যের জন্য বেশি যোগাযোগ করেন। যদি বন্যার আগেই আগাম বার্তা নিয়মিত প্রচার করেন, তাহলে মানুষের জন্য পূর্বপ্রস্ততি নেওয়া সহজ হয়।
অনুষ্ঠানে চ্যানেল আইয়ের প্রধান বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার বিষয়ে উন্নতি হচ্ছে। আবহাওয়ার আগাম তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া, এসব তথ্যের ওপর মানুষের আস্থা তৈরি এবং একই সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে আসার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
বজ্রপাতের সময় ৩০/৩০ নিয়ম মানতে হবে
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ঝড়, বন্যা, বৃষ্টি, বজ্রপাত নিয়ে সতর্কবার্তা ও করণীয় নিয়ে তিনটি পৃথক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম বড়ুয়া ও ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির উপপরিচালক শরাফাত হোসেন খান। পরে তাঁরা সাংবাদিক ও বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের প্রশ্নের উত্তর দেন।
উপস্থাপনায় আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এখন আবহাওয়ার ৫ থেকে ১০ দিনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। তবে ৭২ ঘণ্টার পূর্বাভাস থাকে সবচেয়ে নিশ্চিত ও নির্দ্বিধায় এই পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করা যায়। ঝড়ের সতর্কবার্তার ক্ষেত্রে ৫, ৬ ও ৭ নম্বর বিপৎসংকেত সমান শক্তিমাত্রার ও ৮, ৯ ও ১০ নম্বর মহাবিপৎসংকেত সমান শক্তিমাত্রার। ফলে এই সতর্কসংকেত পেলে সতর্ক হয়ে যেতে হবে।
আবুল কালাম মল্লিক আরও বলেন, বজ্রপাতে প্রাণহানি বাড়ছে। এই বছর এ পর্যন্ত বজ্রপাতে ১৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বজ্রপাতের দুই ঘণ্টা আগে আগাম বার্তা দেওয়া যায়। ‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই এখুনি’—এটা মাথায় রেখে বজ্রপাত থেকে বাঁচতে ৩০/৩০ নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ বিজলি চমকানোর ৩০ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে বজ্রধ্বনি হলে দৌড়ে বাসা বা আবদ্ধ কক্ষে প্রবেশ করতে হবে এবং ৩০ মিনিট পর্যন্ত অবস্থান করতে হবে। খোলা বা দুর্বল ছাউনিযুক্ত স্থানে বজ্রপাতের সময় অবস্থান নেওয়া নিরাপদ নয়। এতে বজ্রপাতের সময়ে পাশ থেকে বিদ্যুতের ঝলকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বজ্রপাতের সময় রুফটপ রেস্টুরেন্টে বসা ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে মার্চ–এপ্রিল মাসে। বজ্রপাতের সময় বারান্দায় থাকা, বজ্রপাতসহ বৃষ্টির সময় হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি ছোঁয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি। বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে তালগাছ লাগানোর দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী। সংলাপে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমের ৫০ জনের বেশি সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।