কৃষি উপকরণের দাম কমানোয় জোর 

· Prothom Alo

  • কৃষি খাতে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব।

  • সার, কীটনাশক ও কৃষি উপকরণে শুল্ক-ভ্যাট ছাড়ের প্রস্তাব।

    Visit mchezo.co.za for more information.

  • মোট ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে সরকারের ‘বিশেষ অগ্রাধিকার’ খাত হিসেবে ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এতে কৃষি উপকরণের ব্যয় কমাতে বিভিন্ন কর ও ভ্যাট ছাড়ের প্রস্তাব রেখেছেন তিনি।

বাজেটে কৃষক কার্ডের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে। সেই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে সার, কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দেশীয় তেল প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিকাশে ১০ বছর কর অব্যাহতির প্রস্তাব রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে গত বৃহস্পতিবার বাজেট বক্তব্যে বলেন, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সার, বীজ, সেচসহ কৃষি উপকরণের সুলভ মূল্য নিশ্চিত করা এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাজেটে কৃষি খাতের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাতে এই খাতে উৎপাদন ব্যয় কমবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা।

বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত এই বাজেটে ব্যবসা সহজ করার নানা উদ্যোগের পাশাপাশি কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় সহনীয় রাখতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কৃষিতে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ না বাড়ায় তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, নতুন বাজেটে কৃষিসংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দ আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে, যা ইতিবাচক। তবে সামগ্রিক বাজেটের তুলনায় কৃষি খাতের অংশ কমেছে।

নতুন অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতে মোট ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ নিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ মোট বাজেটের ৫ শতাংশ, যেখানে চলতি অর্থবছরে ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক বছর ধরে মোট বাজেটের তুলনায় কৃষি খাতে বরাদ্দের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। তাই কৃষি খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উপকরণে করছাড়

প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কৃষিকাজে ব্যবহৃত সব ধরনের কীটনাশক আমদানির ওপর আরোপিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কীটনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব রয়েছে। এতে দেশীয় উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সার সরবরাহ সহজ করতে ব্যবসায়ী পর্যায়ে বিদ্যমান সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি জিংক সালফেট সার তৈরির অন্যতম কাঁচামাল জিংক অ্যাশ আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা দেশীয় সার উৎপাদনে সহায়ক হবে।

প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের উৎপাদন ব্যয় কমাতে জেনেরিক ভেটেরিনারি ওষুধ আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে পোলট্রি, ডেইরি ও মাছের খাদ্য তৈরির বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতেও শুল্ক অব্যাহতির সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এতে পশু ও মাছের খাদ্যের উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমবে।

নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য ফল উৎপাদনে উৎসাহ দিতে ফ্রুট ব্যাগিংয়ে ব্যবহৃত বিশেষ কাগজের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া পোলট্রি খাতের আধুনিকায়নে ব্যবহৃত হ্যাচার, হিউমিডিটি সেন্সরসহ পাঁচ ধরনের যন্ত্রপাতি আমদানিতেও শুল্ক ছাড় রয়েছে।

কৃষকদের সহায়তায় ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি চালু রয়েছে। আগামী অর্থবছরে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে এ সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা হয়েছে। এ জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। 

কৃষিঋণের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে। শস্য, মৎস্য ও পশুপালন খাতে নেওয়া ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সুবিধা বহাল থাকবে। কৃষিঋণ মওকুফের জন্য ১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ডাল, তেলবীজ, মসলা ও ভুট্টা চাষে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে। উপকূলীয় এলাকায় লবণ চাষে ৪ শতাংশ এবং পার্বত্য অঞ্চলে ৫ শতাংশ সুদে ঋণসুবিধা মিলবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রথমবারের মতো কৃষি ও মৎস্যবিমা চালুর পরিকল্পনার কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য সারে ভর্তুকি অব্যাহত থাকবে এবং ৩০ হাজার টন সার বিনা মূল্যে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া অর্থমন্ত্রী ৬০টি কৃষিপণ্যের উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা এবং মসলায় বিদ্যমান ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

বাজেটে দেশীয় বীজ থেকে তেল উৎপাদনে ১০ বছর কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাবকে ‘ভালো উদ্যোগ’ বলে মন্তব্য করেছেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

কৃষি অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, শুল্ক ও কর হ্রাসের উদ্যোগ দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করবে। কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান প্রথম আলোকে বলেন, কীটনাশকের কাঁচামালে শুল্কছাড় দেওয়ায় দেশীয় উৎপাদন বাড়বে। সারের করও ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সুবিধা যেন ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে, সেদিকেও সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে।

কাজুবাদাম ও পাঙাশের মতো কিছু পণ্যে নতুন শুল্কারোপ করে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার উদ্যোগকেও যথাযথ বলে মনে করেন জাহাঙ্গীর আলম খান। তবে কৃষিতে ভর্তুকি ও বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে বাড়েনি উল্লেখ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এ খাতে আরও নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

Read full story at source