অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করার ১০ উপায়
· Prothom Alo

আল্লাহর ভয় একজন মুমিনের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এটি এমন একটি আধ্যাত্মিক শক্তি, যা মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকতে সাহায্য করে।
ইসলামে একে বলা হয় ‘তাকওয়া’। কোরআন ও হাদিসে বারবার তাকওয়া অর্জনের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। অন্তরে আল্লাহভীতি জাগ্রত করার জন্য ১০ উপায় বিশেষভাবে কার্যকর।
Visit turconews.click for more information.
১. আল্লাহর পরিচয় জানা
আল্লাহকে যত বেশি জানা যায়, তাঁর প্রতি ভয়, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তত বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও রহমতের পরিচয় মানুষকে তাঁর সামনে বিনয়ী হতে সাহায্য করে।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে তারাই তাঁকে বেশি ভয় করে, যারা জ্ঞানী। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, অতি ক্ষমাশীল।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ২৮)
২. কোরআন তেলাওয়াত
পবিত্র কোরআন মানুষের অন্তরকে জাগ্রত করে এবং আখিরাতের ব্যাপারে সচেতন করে তোলে। এর উপদেশ ও সতর্কবাণী হৃদয়ে আল্লাহভীতি সঞ্চার করে।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘প্রকৃত মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হলে তাদের হৃদয় ভয়ে ও শ্রদ্ধায় প্রকম্পিত হয়, আর যখন তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হয়, তখন তাদের ইমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপরই ভরসা করে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২)
মুমিনের সফল হওয়ার শর্ত কী কী এবং প্রধান বাধাগুলো কী৩. আখেরাতের কথা স্মরণ
মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে এবং আখেরাতের প্রস্তুতিতে উদ্বুদ্ধ করে। কেউ যখন বিশ্বাস করবে—তাকে একদিন মহাপরিক্রমশালী আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, তার অন্তরে স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহভীতি জন্ম নেবে।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা স্বাদ বিনষ্টকারী বস্তু অর্থাৎ মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৭)
৪. নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া
আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক দৃঢ় করার সর্বোত্তম মাধ্যম নামাজ। নিয়মিত নামাজ আদায় মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং পাপাচার থেকে দূরে রাখে।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
৫. পাপ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা
পাপ অন্তরকে কঠিন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলে। তাই ছোট-বড় সব ধরনের পাপ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা অন্তরে আল্লাহভীতি বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম।
নবীজি (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো বান্দা একটি পাপ করে, তখন তার হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে। এরপর যদি সে পাপ থেকে বিরত হয়, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং তওবা করে, তবে তার হৃদয় পরিষ্কার করে দেওয়া হয়। আর যদি সে পুনরায় পাপে লিপ্ত হয়, তাহলে সেই কালো দাগ আরও বাড়তে থাকে, এমনকি এটি তার সমগ্র হৃদয়কে ঢেকে ফেলে। এটাই সেই ‘রান’ (মরিচা বা আবরণ), যার কথা আল্লাহ (সুরা মুতাফ্ফিফিনে) বলেছেন—‘কখনো নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৩৪)
৬. আল্লাহভীরু মানুষের সান্নিধ্য গ্রহণ
মানুষ তার সঙ্গীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। নেককার ও আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের সঙ্গে চলাফেরা করলে তাদের উত্তম চরিত্র ও আমল নিজের মধ্যেও প্রভাব ফেলে। তাই আল্লাহভীতি ও তাকওয়া অর্জন করতে চাইলে সৎ ও ধার্মিক মানুষের সান্নিধ্য গ্রহণ করা জরুরি।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর আদর্শ ও জীবনপদ্ধতির অনুসারী হয়ে থাকে। অতএব তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩)
তওবার অনন্য ৫ সুফল৭. তওবা ও ইস্তিগফার
তওবা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং আল্লাহর প্রতি বিনয়ী করে তোলে। বারবার তওবা করলে আল্লাহর সামনে নিজের দুর্বলতার উপলব্ধি তৈরি হয়, যা আল্লাহভীতি বৃদ্ধি করে।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যেন তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)
৮. আল্লাহর নেয়ামত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা
আল্লাহর নেয়ামত অপরিসীম। কেউ যখন সেই নেয়ামত, অনুগ্রহ ও দানের কথা চিন্তা করবে, তখন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও জবাবদিহির অনুভূতি সৃষ্টি হবে। এর ফলে অন্তরে জাগ্রত হবে আল্লাহভীতির মনোভাব।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩৪)
৯. নফল ইবাদতের প্রতি গুরুত্বারোপ
নফল নামাজ, রোজা, তাসবিহ ও জিকির অন্তরকে জীবন্ত রাখে। এগুলো বান্দাকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে এবং এর মাধ্যমে তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি হয়।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)
১০. নিজের আমলের হিসাব গ্রহণ
প্রতিদিন নিজের কাজের হিসাব নেওয়া মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। নিজের ভুল-ত্রুটি পর্যালোচনা করলে সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং আল্লাহর ভয় অন্তরে দৃঢ় হয়।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে আগামী দিনের জন্য সে কী প্রেরণ করেছে।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ১৮)
আল্লাহভীতি কোনো জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়। এটি অর্জন করতে হয় ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে। যে হৃদয় আল্লাহভীতিতে আলোকিত হয়, সে হৃদয়ই দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা অর্জন করে।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ