বাজেট প্রত্যাশাকে ভাষা দিয়েছে, পূরণের পথ স্পষ্ট করেনি

· Prothom Alo

ড. সেলিম রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক। প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটের নতুনত্ব, বাস্তবায়নের ঝুঁকি, ফ্যামিলি কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধিসহ নানা প্রসঙ্গে।

Visit extonnews.click for more information.

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া মনোজ দে

গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি প্রথম বাজেট প্রস্তাব করেছে। গণ-অভ্যুত্থান একদিকে যেমন অনেক জনপ্রত্যাশা তৈরি করেছে, তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নানা সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যও হয়েছে। জনপ্রত্যাশা ও সংস্কার কর্মসূচি—এই দুই বিবেচনায় বাজেট কেমন হলো?

সেলিম রায়হান: ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে উচ্চাভিলাষী। বাজেট বক্তৃতায় গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক ন্যায়, অন্তর্ভুক্তি, সুশাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা বারবার এসেছে। এই অর্থে বাজেটটি কেবল আয়-ব্যয়ের দলিল নয়; এটি নতুন সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানও প্রকাশ করেছে।

বিশেষ করে অর্থনীতিকে কিছু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতিতে রূপান্তরের যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা জনপ্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। কিন্তু এখানেই একটি সতর্কতা আছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা শুধু নতুন রাজনৈতিক ভাষা নয়, বরং ক্ষমতা, সম্পদ, সুযোগ ও সেবার বণ্টনে দৃশ্যমান পরিবর্তন। বাজেট সেই প্রত্যাশাকে ধারণ করেছে, কিন্তু তাকে এখনো পর্যাপ্তভাবে বাস্তবায়নযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনায় নামিয়ে আনতে পারেনি। 

সমস্যা হলো, জনপ্রত্যাশা ও বাস্তব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান থেকে গেছে। বাজেটে সংস্কারের ভাষা শক্তিশালী, কিন্তু সংস্কারের পথরেখা অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট। ব্যাংক খাত, রাজস্ব প্রশাসন, সরকারি ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কোন সংস্কার কখন, কার নেতৃত্বে, কীভাবে এবং কোন সূচকে তা পরিমাপ করা হবে—এই বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হওয়া দরকার ছিল।

গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ বেশি ধৈর্য ধরতে আগ্রহী নয়। তারা আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা বাজারে স্বস্তি, কর্মসংস্থানে সুযোগ, সহজে সরকারি সেবাপ্রাপ্তি, ব্যাংক খাতে আস্থা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায়। সেখানেই এই বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এবং সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এটি প্রত্যাশাকে ভাষা দিয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশা পূরণের নির্ভরযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক যন্ত্র এখনো যথেষ্ট স্পষ্ট করে দেখাতে পারেনি। 

যদি নতুনত্বের কথা বলি, আগের সরকারগুলোর দেওয়া বাজেটের সঙ্গে এই বাজেটে কোনো বিশেষ নতুনত্ব আছে কি?

সেলিম রায়হান: নতুনত্ব কিছু আছে, বিশেষ করে থ্রি আর কৌশল। এই কৌশলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও বিনির্মাণের কথা বলা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, সৃজনশীল অর্থনীতি, খেলাধুলাভিত্তিক অর্থনীতি, বিনিয়ন্ত্রণকরণ, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল, লজিস্টিকস বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি ও সবুজ খাতের প্রণোদনায়। পূর্ববর্তী রুটিন বাজেটের তুলনায় এগুলো ভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুর তৈরি করেছে। 

তবে বাংলাদেশের বাজেটগুলোতে প্রায়ই বড় লক্ষ্য, উচ্চ প্রবৃদ্ধির আশা, মানবসম্পদে বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা এবং রাজস্ব বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকে। এ বাজেটেও সেই ধারাবাহিকতা আছে। পার্থক্য হচ্ছে ভাষায়, খাত নির্বাচনে এবং কিছু রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে। কিন্তু প্রকৃত নতুনত্ব প্রমাণিত হবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে। যদি কর প্রণোদনা পুরোনো ধরনের বিশেষ সুবিধায় পরিণত হয়, যদি বিনিয়ন্ত্রণকরণ আমলাতান্ত্রিক স্তরে আটকে যায় এবং যদি সামাজিক খাতের বরাদ্দ ফলাফলে না পৌঁছায়, তাহলে নতুনত্ব অনেকটাই কাগুজে থাকবে। 

কিছু খাতে নতুন কল্পনা আছে, যেমন ক্রিয়েটিভ হাব, আঞ্চলিক বিনিয়োগে দ্রুত অবচয় সুবিধা এবং লজিস্টিকস খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ। কিন্তু এগুলোকে অর্থনৈতিক ফলাফলে রূপ দিতে হলে আইন, তথ্য, অর্থায়ন, দক্ষতা ও বাজার সংযোগের সমন্বিত প্যাকেজ লাগবে। বাজেটে সেই পূর্ণতা এখনো দেখা যায় না। 

নতুন সরকারের বাজেটে অতীতের তুলনায় একটি দৃশ্যমান পার্থক্য হলো খাত নির্বাচনে বৈচিত্র্য। রপ্তানি, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো বা কৃষির বাইরে সংস্কৃতি, ক্রীড়া, ডিজিটাল কনটেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং ও স্থানীয় সৃজনশীল পণ্যকে অর্থনীতির আলোচনায় আনা হয়েছে। এটি ভালো, তবে মূলধারার শিল্পনীতি ও বাণিজ্যনীতির সঙ্গে এসব খাতের যোগসূত্র পরিষ্কার নয়। 

রাজনৈতিক চিন্তার বিশাল বাজেট। বাস্তবায়নের ঝুঁকি কতটা দেখছেন?

সেলিম রায়হান: এই বাজেটের রাজনৈতিক চিন্তা বড়। সরকার একসঙ্গে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, মানবসম্পদ, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং আর্থিক খাত সংস্কারের লক্ষ্য নিয়েছে। এগুলো আলাদাভাবে জরুরি। কিন্তু সমস্যা হলো এগুলো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হলে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং নীতির ধারাবাহিকতা অনেক বেশি শক্তিশালী হতে হয়। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ঠিক এখানেই। 

বাস্তবায়নের ঝুঁকি তাই বড়। রাজস্ব আহরণ কম হলে উন্নয়ন ব্যয় কাটছাঁট হতে পারে। ব্যাংক খাত দুর্বল থাকলে বিনিয়োগে ঋণপ্রবাহ কমবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকলে সামাজিক সুরক্ষা বাড়িয়েও মানুষের বাস্তব আয় রক্ষা কঠিন হবে। আবার প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি, ক্রয়প্রক্রিয়ার দুর্বলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে বরাদ্দের সুফল কমে যাবে। এই বাজেট সফল করতে হলে শুধু অর্থ বরাদ্দ নয়, বাস্তবায়ন ব্যবস্থার ওপর কঠোর নজরদারি দরকার। 

এবার বিশাল বাজেট একই সঙ্গে বিশাল ঘাটতির বাজেটও। প্রশ্ন হচ্ছে, এই টাকাটা আসবে কোথা থেকে? এনবিআর কি তার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে? দেখা যাচ্ছে প্রায় সব শ্রেণির জন্য করছাড় দিয়ে করের আওতা বাড়ানো হয়েছে। এটা কতটা কার্যকর হবে? আবার ঋণ করে ঘাটতি মেটাতে গেলে তার অভিঘাত তো ব্যাপক।

সেলিম রায়হান: বাজেটের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা। সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয় ধরেছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আসার কথা। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, বরং কিছুটা অবাস্তব বললেও বেশি বলা হবে না। অর্থনীতি এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, আমদানি চাপ, ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা এবং ভোক্তা চাহিদার চাপের মধ্যে আছে। এমন অবস্থায় রাজস্বে বড় উল্লম্ফন সাধারণত সহজে ঘটে না। 

এনবিআরের সমস্যা লক্ষ্য কম হওয়ার কারণে নয়; সমস্যা কাঠামোগত। করভিত্তি সংকীর্ণ, করছাড় অনেক, কর প্রশাসনে হয়রানির অভিযোগ, স্বেচ্ছা পরিপালন দুর্বল আর বড় কর ফাঁকি ধরার সক্ষমতা সীমিত। বাজেটে ডিজিটালাইজেশন, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং করছাড় পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে। এগুলো জরুরি। কিন্তু এক বছরের মধ্যে এগুলোর ফল বড় আকারে পাওয়া কঠিন। তাই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত না হলে মাঝপথে ব্যয় কাটছাঁট, ব্যাংকঋণ বৃদ্ধি, বকেয়া বিল জমা, অথবা পরোক্ষ কর বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। 

সরকার অনেক শ্রেণির জন্য করছাড়ের কথা বলেছে, কিন্তু করের আওতা বাড়াতে গিয়ে বাস্তবে ছোট ব্যবসা, পাইকারি বিক্রেতা, এসএমই বা মধ্যবিত্ত পেশাজীবীরা বেশি চাপে পড়তে পারেন। বড় সম্পদ, উচ্চ আয়ের গোষ্ঠী, অপ্রদর্শিত সম্পদ, কর ফাঁকি এবং কর ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাবের দিকে কঠোর নজর না দিলে কর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে না। একই সঙ্গে ঘাটতি ঋণ দিয়ে মেটানোরও বড় অভিঘাত আছে। এতে সুদ ব্যয় বাড়বে, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ বাজেটে সামাজিক ও উন্নয়ন ব্যয়ের জায়গা কমে যেতে পারে। বাজেটে সুদ পরিশোধের চাপ ইতিমধ্যেই বেশ বড়; ফলে ঋণ যদি উৎপাদনশীল প্রকল্পে না যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের করদাতাকেই তার বোঝা বহন করতে হবে। তাই প্রশ্ন শুধু ঘাটতির আকার নিয়ে নয়; ঘাটতি কীভাবে অর্থায়ন হচ্ছে এবং সেই অর্থ কতটা উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে, সেটিই আসল বিষয়। 

এনবিআরের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কর প্রশাসনকে রাজস্ব আহরণের পাশাপাশি করদাতা-বান্ধব হতে হবে, কিন্তু এই রূপান্তর সহজ নয়। মাঠপর্যায়ের আচরণ, অডিটের স্বচ্ছতা, বিরোধ নিষ্পত্তি, ভ্যাট রিফান্ড এবং কাস্টমস মূল্যায়নে অনিশ্চয়তা থাকলে ব্যবসা আস্থা পাবে না। চাপ বাড়লে হয়রানির ঝুঁকিও বাড়ে। 

সরকার মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে। ইরান যুদ্ধ ও গত চার-পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এটা কতটা বাস্তবসম্মত? মূল্যস্ফীতি কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ বাজেটে প্রতিফলন হলো?

সেলিম রায়হান: মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামানো এবং প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে কঠিন। গত কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে। খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জ্বালানি মূল্য, সার, পরিবহন ব্যয়, আমদানি খরচ ও বিনিময় হার চাপ তৈরি করতে পারে। বাজেটে স্বীকার করা হয়েছে যে জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে বহিঃখাতের অভিঘাত মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। 

মূল্যস্ফীতি কমানোর ক্ষেত্রে বাজেটে কিছু ব্যবস্থা আছে, যেমন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএস, কৃষি উৎপাদন, সার ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষা। কিন্তু মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রতিযোগিতা, মজুতদারি নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহব্যবস্থা,আমদানি ব্যবস্থাপনা এবং মুদ্রানীতি-রাজস্বনীতির সমন্বয় আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল। একদিকে ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে ব্যাংকঋণ থাকবে, আবার করছাড়ও বাড়বে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমবে ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যও বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভরশীল; বিনিয়োগ না বাড়লে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হতে পারে। 

ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি খাতে সরকার বরাদ্দ বাড়িয়েছে। কিন্তু এর সুফল টার্গেটেড জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ কী?

সেলিম রায়হান: সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সময়োপযোগী। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খাদ্যব্যয় বৃদ্ধি, নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তব আয়ের ক্ষয় এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় নগদ ও খাদ্যসহায়তা দরকার। ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে নকশা করা যায়, তাহলে এটি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিগুলোকে পরিবারভিত্তিক সহায়তার একটি কাঠামোতে আনতে পারে। এতে দরিদ্র পরিবার, নারী, শিশু, প্রবীণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে। 

কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে বরাদ্দের সংকটের পাশাপাশি টার্গেটিংয়ের দুর্বলতাও এক বড় সমস্যা। দেখা যায়, প্রকৃত দরিদ্র বাদ পড়ে, তুলনামূলকভাবে সচ্ছল কেউ কেউ সুবিধা পায়। রাজনৈতিক প্রভাব, তালিকা প্রণয়নে পক্ষপাত, তথ্যের ঘাটতি এবং স্থানীয় পর্যায়ের অনিয়ম বড় সমস্যা। ডিজিটাল ডেটাবেজ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু ডেটাবেজের মান যদি দুর্বল হয়, তাহলে প্রযুক্তি শুধু পুরোনো ভুলকে দ্রুততর করবে। ফ্যামিলি কার্ড সফল করতে হলে দারিদ্র্যের নিয়মিত আপডেট, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, স্থানীয় যাচাই, নারীপ্রধান পরিবারকে অগ্রাধিকার এবং স্বচ্ছ তদারকি দরকার। 

নারীপ্রধানের নামে কার্ড দেওয়া ইতিবাচক। তবে শুধু টাকা দেওয়া যথেষ্ট নয়। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় সেবার সঙ্গে কার্ড যুক্ত না হলে এটি ভাতাভিত্তিক কর্মসূচি হয়ে থাকবে। সুফল পেতে হলে সামাজিক সুরক্ষাকে দারিদ্র্য ব্যবস্থাপনা নয়, সামাজিক গতিশীলতার পথ করতে হবে। 

আরেকটি বিষয় হলো নগরদরিদ্র। সামাজিক সুরক্ষা আলোচনায় গ্রামীণ দরিদ্র বেশি দৃশ্যমান, কিন্তু ভাড়া, খাদ্য, পরিবহন ও চিকিৎসা ব্যয়ে শহরের নিম্ন আয়ের পরিবারও গভীর চাপে আছে। ফ্যামিলি কার্ডে তাদের অন্তর্ভুক্তির পদ্ধতি পরিষ্কার না হলে বড় অংশ বাদ পড়তে পারে। 

সামাজিক সুরক্ষায় ভাতার পরিমাণ বাড়ানো দরকার, তবে মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় তা যথেষ্ট কি না, দেখা জরুরি। তাই শুধু উপকারভোগীর সংখ্যা নয়, প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ও দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের পথও মূল্যায়ন করতে হবে। 

বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। শিক্ষার মান উন্নয়ন ও গুণগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে ব্যয়ের রূপরেখাটা কি পাওয়া গেল?

সেলিম রায়হান: শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি প্রশংসনীয়। কারণ, এই দুই খাতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ দীর্ঘদিন কম। বাজেট মানবসম্পদ, দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও সবার জন্য মানসম্মত সেবার কথা বলেছে। দিকটি সঠিক। কিন্তু ব্যয়ের রূপরেখা এখনো পর্যাপ্তভাবে ফলাফলমুখী নয়। শিক্ষায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শেখার ঘাটতি, কারিগরি শিক্ষার মান, ভাষা ও ডিজিটাল দক্ষতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা। শুধু অবকাঠামো বা নতুন কর্মসূচি দিয়ে শিক্ষার মান ফিরবে না। 

স্বাস্থ্য খাতেও একই কথা প্রযোজ্য। হাসপাতাল নির্মাণের চেয়ে দরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, ডাক্তার-নার্স উপস্থিতি, ওষুধ সরবরাহ, রেফারেল ব্যবস্থা, রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্য ব্যয়ে পরিবারের নিজস্ব খরচ কমানো। বাজেটে দিকনির্দেশ আছে, কিন্তু গুণগত সেবা নিশ্চিতে খরচ, কর্মী, জবাবদিহি ও মান সূচকের পরিষ্কার পরিকল্পনা আরও দরকার। 

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উভয় ক্ষেত্রেই জেলা পর্যায়ের বৈষম্য বড়। বরাদ্দ বাড়লেও যদি ভালো শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ল্যাব, ইন্টারনেট, ওষুধ ও ব্যবস্থাপনা শহরকেন্দ্রিক থাকে, তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন হবে না। বাজেটের রূপরেখায় এই আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর বাস্তব পদ্ধতি আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার। 

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সঙ্গে ব্যয়ের দক্ষতা মাপার স্বতন্ত্র ব্যবস্থা থাকা দরকার। কত শিশু শেখার ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করল, কত রোগী নিজ জেলা থেকে সেবা পেল, কত পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ে দরিদ্র হলো না, এসব সূচক ছাড়া সাফল্য বোঝা যাবে না।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর যে বিশাল চ্যালেঞ্জ, তা মোকাবিলার সুনির্দিষ্ট পথরেখা পাওয়া গেল কি? 

সেলিম রায়হান: বেসরকারি খাতকে প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি বলা বাস্তবসম্মত। বিনিয়ন্ত্রণকরণ, কর স্থিতিশীলতা, বিদেশি অর্থায়নের ওপর কর কমানো, ফ্রি ট্রেড জোন, লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইভি, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, স্টার্টআপ ও এসএমই প্রণোদনা বিনিয়োগের সংকেত দিতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগ শুধু প্রণোদনায় আসে না। বিনিয়োগকারী দেখে নীতির ধারাবাহিকতা, জ্বালানি নিশ্চয়তা, দ্রুত কাস্টমস, জমি, দক্ষ শ্রম, ব্যাংকঋণ, বিচারিক সুরক্ষা এবং সরকারি দপ্তরের আচরণ। বাজেটে এসবের ভাষা আছে, কিন্তু বাস্তব বাধা সরানোর সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি কম। 

কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এসএমই ও আঞ্চলিক শিল্পায়ন সবচেয়ে জরুরি। প্রযুক্তি খাত ও অর্থনীতির সম্ভাবনা আছে, কিন্তু তা সীমিত জনগোষ্ঠীতে আটকে যেতে পারে। বড়সংখ্যক তরুণের জন্য শ্রমঘন উৎপাদন, কৃষিভিত্তিক শিল্প, সেবা, নির্মাণ এবং দক্ষতা-সংযুক্ত চাকরি দরকার। বাজেট এই সেতুবন্ধ পুরোপুরি দেখায়নি।

ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপকে করছাড় দেওয়া তরুণদের জন্য ইতিবাচক সংকেত। কিন্তু অনলাইন আয়ের বাইরে বিপুলসংখ্যক কম দক্ষ তরুণ আছে, যাদের জন্য স্থানীয় শিল্প, কারিগরি প্রশিক্ষণ, শ্রমবাজার তথ্য এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগ অর্থায়ন দরকার। কর্মসংস্থান নীতি তাই আরও বিস্তৃত হতে হবে। বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতির স্থিতিশীলতা বিশেষভাবে জরুরি। যদি এক বছর প্রণোদনা দেওয়া হয় আর পরের বছর তা বদলে যায়, বিনিয়োগকারী ঝুঁকি নেবে না। একইভাবে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ না হলে করছাড়ও কম কার্যকর হবে। সরকারের উচিত বিনিয়োগ-সংক্রান্ত প্রতিটি সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা প্রকাশ করা।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে। বেসরকারি খাতের চাকরিজীবী ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর কী হবে, সেই প্রশ্নটি জনমনে তৈরি হয়েছে।

সেলিম রায়হান: সরকারি কর্মচারীদের বেতনকাঠামো প্রায় ১১ বছর অপরিবর্তিত ছিল; মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় তাঁদের বেতন সমন্বয়ের অবশ্যই যৌক্তিকতা আছে। রাষ্ট্র যদি দক্ষ, সৎ ও পেশাদার প্রশাসন চায়, তবে সরকারি কর্মীদের জীবিকা বাস্তবতার সঙ্গে বেতনকাঠামোর সম্পর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের উচিত বেসরকারি খাতের জন্যও কিছু স্পষ্ট সুরক্ষা ভাবনা দেওয়া। ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন, শ্রমবাজার তথ্য, দক্ষতা ভর্তুকি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ঋণ, সামাজিক বিমা এবং নগর দরিদ্র সহায়তা। সরকারি বেতন বৃদ্ধি যেন সামগ্রিক আয়-সুরক্ষা নীতির অংশ হয়। 

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো অতিরিক্ত বেতন ব্যয়ের অর্থায়ন কীভাবে হবে। যদি এই ব্যয় বাড়তি রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে মেটানো যায়, তাহলে চাপ তুলনামূলকভাবে কম হবে। কিন্তু রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে সরকারকে হয় ঋণ নিতে হবে, নয়তো অন্য খাতের ব্যয় কমাতে হবে। বিশেষ করে যদি অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ ঋণনির্ভর হয়, তাহলে অর্থনীতিতে চাহিদা বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। তাই সরকারি বেতন সমন্বয়কে রাজস্ব সক্ষমতা, কর্মদক্ষতা, সেবা মান এবং বৃহত্তর শ্রমবাজার নীতির সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। 

এবারের বাজেট নিয়ে সামগ্রিকভাবে কোনো মন্তব্য করবেন কি?

সেলিম রায়হান: সামগ্রিকভাবে বাজেটটি কিছু ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করলেও এতে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি ও বাস্তবায়নগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। ঘোষণার চেয়ে বাস্তব ফলাফল কতটা আসবে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এর সাফল্য নির্ভর করবে কম কথা ও বেশি বাস্তবায়ন, কম ছাড় ও বেশি জবাবদিহি এবং কম আনুষ্ঠানিকতা ও বেশি ফলাফলের ওপর। অন্যথা এই বাজেটও অতীতের অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার মতো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকিতে পড়বে। এটাই এখন সরকারের সবচেয়ে কঠিন এবং সবচেয়ে জরুরি অর্থনৈতিক পরীক্ষা।

আপনাকে ধন্যবাদ।

সেলিম রায়হান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

Read full story at source