ব্রাজিলের খেলায় সেই নান্দনিকতা কোথায়
· Prothom Alo

বল পায়ে ছন্দ, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার সেই চিরচেনা জাদুকরি পাসিং, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের মূল শেষ কথাই তো এটিই। কিন্তু হাইতির বিপক্ষে স্কোরবোর্ড ৩-০ দেখালেও তা সব কথা বলছে না। ব্রাজিলের খেলায় কোনো শৈল্পিক ছোঁয়া ছিল না। ১৯৭০ বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের ফুটবল দেখে আসা ভক্তদের কাছে বর্তমানের দলটিকে সাদামাটা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই ব্রাজিলকে চেনা যায় না। এই ব্রাজিলকে নিয়ে বহুদূর যাওয়ার স্বপ্নও আমি দেখতে পারছি না।
Visit sportbet.reviews for more information.
মাঠের টেকনিক্যাল দুর্বলতা বিশ্লেষণ করলে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগে মাঝমাঠে। বল পজেশন হারানোর পর তা ফিরে পাওয়ার যে আগ্রাসী তাগিদ ব্রাজিলের ঐতিহ্যের অংশ, সেটি এই ম্যাচে অনুপস্থিত দেখেছি। বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত প্রতি–আক্রমণে যাওয়ার চেনা রূপটিও সেভাবে খুঁজে পাইনি। মাঝমাঠের পারফরম্যান্স ছিল সাধারণ। পুরো দলের খেলায়ই তেমন কোনো সৃজনশীলতা বা দারুণ কিছু চোখে পড়েনি।
মরক্কো ম্যাচের পরই স্পষ্ট হয়েছিল, এই দলে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য আছে, এমন খেলোয়াড়ের বেশ অভাব। প্রথম আলোয় আমার কলামেও তা বলেছিলাম। হাইতির মতো তুলনামূলক কম শক্তির দলের বিপক্ষে সহজে জেতার পরও একই কথা বলতে হচ্ছে। এই ম্যাচে মাঝমাঠের উচিত ছিল পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা, প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করা। কিন্তু তার বদলে দেখা গেছে অনেক ভুল পাস আর লক্ষ্যহীন শট। হাইতি যে ব্রাজিলের ওপর খুব বেশি চাপ তৈরি করতে পেরেছে তা নয়, বরং ব্রাজিলের নিজেদেরই সাধারণ বানিয়ে রেখেছে।
ব্রাজিলের হয়ে এখন পর্যন্ত সেরা পারফরমার ভিনিসিয়ুসআক্রমণভাগেও কিছু ব্যর্থতা ছিল চোখ পড়ার মতো। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো তারকা খেলোয়াড় ডি-বক্সে সুযোগ তৈরি করলেও লক্ষ্যভেদে অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছেন। প্রথম গোলটি কিছুটা ভাগ্যপ্রসূতই মনে হয়েছে।
দ্বিতীয়ার্ধে তো খেলোয়াড়দের মধ্যে গোল করার সেই চিরাচরিত ক্ষুধাটাই দেখিনি। দূরপাল্লার শট বা বক্সের বাইরে থেকে আচমকা আক্রমণের যে বিশেষত্ব ব্রাজিলের ছিল, তা এই ম্যাচে পাইনি। খেলার মধ্যে গোল না হলে যে একটা তাগিদ বা তাড়াহুড়ো থাকে, সেই জিনিসটাই ছিল অনুপস্থিত। হাইতির মতো দলকে দুরমুশ বা পিষে ফেলা ব্রাজিলের জন্য অসম্ভব ছিল না। কিন্তু মাঠে সেই ‘কিলিং অ্যাটিচুড’ উধাও। আমরা ব্রাজিলের কাছ থেকে এমন একটা পাস দেখতে চাই, যা প্রতিপক্ষ তো বটেই, দর্শকেরাও কল্পনা করতে পারবে না। সেই ঝলকটাই হাইতি ম্যাচেও নিখোঁজ।
ডিফেন্ডার গাব্রিয়েলের অহেতুক লম্বা বল মারা এবং মানহীন ক্লিয়ারেন্সগুলো ব্রাজিলের মতো দলের থেকে কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। এ ছাড়া কোচ কার্লো আনচেলত্তির কৌশল বা দর্শন বেশ অস্পষ্ট মনে হয়েছে। ম্যাচের মাঝপথে রাফিনিয়ার মতো খেলোয়াড়কে হঠাৎ উঠিয়ে নেওয়ার কারণটিও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। ডাগআউটে গিয়ে তাঁর চাহনি দেখে বোঝা যায়নি, চোট না অন্য কোনো কারণে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়েছে। আনচেলত্তি একজন তুখোড় ট্যাকটিশিয়ান। কিন্তু এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের খেলায় বলার মতো কোনো ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন আমার চোখে পড়েনি।
ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তিআর্জেন্টিনা বা ফ্রান্সের মতো দলগুলো তাদের চিরায়ত ফুটবলে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে প্রথম ম্যাচে, ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচটাতে তো নয়ই, দ্বিতীয় ম্যাচেও সেই ম্যাজিক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মরক্কো ছিল গতিসম্পন্ন দল, গতবারের সেমিফাইনালিস্ট। তাদের সঙ্গে ব্রাজিলের শুরুটা ছিল ভীষণ নড়বড়ে। মরক্কোর খেলায় যে প্রেসিং বা তীব্রতা দেখা গেছে, তার বিপক্ষে লড়তে ব্রাজিল খেই হারালেও আশা ছিল হাইতির বিপক্ষে তারা স্বরূপে ফিরবে। কিন্তু হাইতির মতো দুর্বল প্রতিপক্ষের সামনেও ব্রাজিল বড় জয় পেলেও বেশ অনুজ্জ্বলই ছিল আমার চোখে। এমন ফুটবল খেলে পরের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলে ব্রাজিল কতটুকু টিকতে পারবে, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে।
হাইতির জালে তিনটি গোল করেছে বলে ব্রাজিল নিয়ে এই হতাশার কথা শুনে অনেকের ভিন্নমত থাকতে পারে। কিন্তু সেমিফাইনাল বা ফাইনাল পর্যন্ত যাওয়াকেই যদি ‘অনেক দূর’ বলা হয়, তাহলে এই ব্রাজিলের পক্ষে সেখানে পৌঁছানো কঠিন। হাইতির বিপক্ষে জয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু ব্রাজিল জিতেছে, শুধু এই মানদণ্ড দিয়ে তো আমরা দলটাকে মাপতে পারি না। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থক ব্রাজিলকে ভালোবেসেছে তাদের নান্দনিক ফুটবলের জন্য। আমরা ব্রাজিলকে ব্রাজিলের মতো করেই দেখতে চাই। সেই চিরন্তন ফুটবলের ধার, শৈল্পিক পাসিং আর প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা ফিরে না এলে এই ‘সাদামাটা পারফরম্যান্স’ নিয়ে ব্রাজিলের সামনের পথটা হবে বেশ কণ্টকাকীর্ণ।
মেসি-বন্দনায় অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষক, তবে তাঁর হৃদয়ে রোনালদো