ইসলামে বিনোদন: রূপরেখা ও নীতিমালা (১)

· Prothom Alo

মানুষ হিসেবে আমরা কোনো যান্ত্রিক সত্তা নই। আমাদের আবেগ, অনুভূতি, ইচ্ছা ও স্বাধীনতা আছে। আমরা যাচাই-বাছাই করতে পারি, সিদ্ধান্ত নিতে পারি। আমরা ক্লান্ত হই, কখনো-সখনো অবসাদেও ভুগি।

আমরা সব সময় সিরিয়াস ও কর্মমুখর থাকতে পারি না। এতে আমাদের মানসিক উদ্দীপনা ও কাজের আগ্রহ কমে যায়। এ জন্যই মানুষ হিসেবে আমাদের দরকার মানসিক ও শারীরিক বিশ্রাম এবং বিনোদন; যাতে আমরা ক্লান্তি, বিষণ্নতা ও একঘেয়েমি ঝেড়ে ফেলে আবার ফিরতে পারি বাস্তব জীবনের নানা ব্যস্ততায়।

Visit newsbetting.bond for more information.

এই ধারণার চমৎকার সমর্থন পাওয়া যায় একটি বিখ্যাত হাদিসে। রাসুল (সা.)-এর একজন লিপিকার ছিলেন হজরত হানজালা উসাইদি (রা.)। তিনি বর্ণনা করেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, হানজালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে।

আল্লাহর রাসুল বললেন, ব্যাপার কী? আমি বললাম, আমরা যখন আপনার কাছে থাকি, আপনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা স্মরণ করিয়ে দেন; মনে হয় যেন আমরা তা চোখেই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এরপর যখন আপনার কাছ থেকে বের হয়ে স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদের মাঝে যাই, তখন এর অনেক কিছু ভুলে যাই।

আল্লাহর রাসুল বললেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, আমি তাঁর শপথ করে বলছি—আমার কাছে থাকাকালে তোমাদের যে হাল হয়, যদি তোমরা সব সময় এ অবস্থায় থাকতে এবং আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকতে, তবে তো ফেরেশতারা বিছানায় ও রাস্তায় তোমাদের সঙ্গে মুসাফাহা করত।

কিন্তু হানজালা, এক সময় (ইবাদত ও আখেরাতের জন্য), আরেক সময় (পার্থিব ব্যস্ততা, বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য) ব্যয় করবে। কথাটি আল্লাহর রাসুল তিনবার বললেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৫০)

বিনোদনের সব উপায়কে যেমন ইসলাম নিষিদ্ধ করেনি, তেমনি সবগুলোকে আবার শর্তহীন বৈধও করে দেয়নি। এ ক্ষেত্রে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ তৈরি করেছে।
পার্থিব জীবনের সঙ্গে আধ্যাত্মিক জীবনের সমন্বয় যেভাবে করবেন

ইসলাম যেহেতু একটি জীবনমুখী ও সর্বজনীন ধর্ম, তাই এতে রয়েছে বিনোদন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। বৈরাগ্যবাদকে ইসলাম কখনোই প্রশ্রয় দেয়নি; বরং জীবনবিমুখ কঠোর অনুশাসনের নিন্দা করা হয়েছে কোরআন ও সুন্নাহে।

বৈরাগ্যবাদকে কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে মানুষের উদ্ভাবিত একটি কঠোর অনুশাসন হিসেবে, যা আল্লাহ আদেশ করেননি: ‘আর বৈরাগ্যবাদ—সেটা তারা নিজেরা আবিষ্কার করেছিল, আমি তাদের ওপর এটা আবশ্যক করিনি।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৭)

তিনজন সাহাবি একবার ইবাদতের আতিশয্যে বিয়ে না করার, সারা বছর রোজা রাখার এবং সারা রাত জেগে নামাজ পড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) তাদের সংশোধন করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি এবং তাঁর প্রতি বেশি অনুগত। অথচ আমি রোজা রাখি, আবার রোজা থেকে বিরতও থাকি। নামাজ পড়ি, ঘুমাই ও বিয়েশাদি করি। সুতরাং যে আমার জীবনপদ্ধতির প্রতি বিরাগভাব পোষণ করবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৩)

বিনোদনের সব উপায়কে যেমন ইসলাম নিষিদ্ধ করেনি, তেমনি সবগুলোকে আবার শর্তহীন বৈধও করে দেয়নি। এ ক্ষেত্রে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ তৈরি করেছে; যা মানুষের জীবন, সমাজ, সময় ও কল্যাণের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। বিনোদনের ক্ষেত্রে ইসলামের এমনই কিছু মূলনীতি নিচে আলোচনা করা হলো:

শিরক পরিহার করা

শিরক মানে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো সত্তা, বস্তু বা বিষয়কে অংশীদার সাব্যস্ত করা। শিরককে সবচেয়ে বড় পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে প্রতিটি ঐশী ধর্মে ও আসমানি কিতাবে।

লোকমান হাকিমের প্রজ্ঞা ও পুত্রকে দেওয়া নসিহত উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ করো, যখন লোকমান উপদেশ দিয়ে তার পুত্রকে বলল, হে বৎস, আল্লাহর সঙ্গে কোনো শরিক কোরো না। নিশ্চয়ই শিরক হলো সবচেয়ে বড় মহাপাপ।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৩)

শিক্ষাদানে মহানবীর ১৫ কৌশল: হাতে-কলমে ও পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি
যদি বিনোদনটি সুস্থ ও সৃজনশীল হয়, তবে বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমে সেই বিনোদনও ইবাদতে পরিণত হয়ে যাবে।

তাই বিনোদনসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে শিরক এড়িয়ে চলা একজন বিশ্বাসীর প্রধান লক্ষ্য। তবে দুঃখজনক হলো, মানুষের আদিম ইতিহাস থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সবখানেই বিনোদনের নানা ধারায় শিরকের দর্শন ও উপাদানের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

বিনোদন হিসেবে চারুকলা বা ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে মানুষ সীমা লঙ্ঘন করে মাটির উপাস্য তৈরি করেছে; তাদের প্রতিভা ও সাধনা নিবেদন করেছে আল্লাহর অংশীদারত্বের প্রতিমূর্তি গড়তে।

সাহিত্য ও পুরাণে নানা দেব-দেবীর কাল্পনিক গল্প তৈরি করা হয়েছে; কাব্যচর্চা ও সংগীতের মধ্য দিয়ে তাদের প্রতি প্রার্থনা ও ভজনের ছন্দ বোনা হয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে সেগুলোকে সৃষ্টিকর্তার দান না ভেবে উল্টো প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকেই উপাস্য বানানো হয়েছে, জন্ম দেওয়া হয়েছে বহু-ঈশ্বরবাদের।

আধুনিক যুগেও ফ্যান্টাসি সাহিত্য, রোল-প্লেয়িং গেম (আরপিজি) ও নানা ধারার সংগীতসহ বিভিন্ন বিনোদনে শিরকের উপাদানের ছড়াছড়ি দেখা যায়। এগুলোই আমাদের সামাজিক জীবন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জীবনধারা ও নৈতিকতাকে সূক্ষ্মভাবে প্রভাবিত করছে।

তাই একজন মুসলিম হিসেবে বিনোদনের ক্ষেত্রে এসব শিরকের উপাদান এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি। অঙ্কন ও শিল্পচর্চায়, কবিতা ও সংগীতসাধনায়, সাহিত্য ও লেখালেখিতে, খেলাধুলা ও গেম ডেভেলপমেন্টে শিরকের দর্শন ও ক্ষতিকর উপাদানগুলো পরিহার করা অবশ্যকর্তব্য।

ইসলামে সৃজনশীলতার দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। জগতের ক্রমবিকাশে সৃজনশীলতার মধ্য দিয়েই মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করে। তাই একজন মুসলিম যখন নিজে কোনো শিল্পের সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটাবেন, তখন তাঁর নিজস্ব বিশ্বাসের জায়গাটি যেন কলুষিত না হয়—সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

যদি বিনোদনটি সুস্থ ও সৃজনশীল হয়, তবে বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমে সেই বিনোদনও ইবাদতে পরিণত হয়ে যাবে।

  • আবদুল্লাহিল বাকি : আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রোগ্রামার

    [email protected]

ইসলামের প্রাচীনত্ব: সব আসমানি ধর্মের মূল সূত্র কি একই 

Read full story at source