মুসলিম সভ্যতায় গ্রন্থাগার ও আরকাইভাল সংস্কৃতি
· Prothom Alo

মধ্যযুগীয় আরবি সাহিত্যে একটি প্রবাদ বহুল প্রচলিত ছিল, ‘বই লেখা হয় কায়রোতে, অনুলিপি করা হয় বৈরুতে, আর পাঠ করা হয় বাগদাদে।’ এই প্রবাদ স্রেফ কথার কথা ছিল না; এটি ছিল ইসলামি সভ্যতার বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে গড়ে ওঠা গ্রন্থাগার সংস্কৃতির এক জীবন্ত খতিয়ান।
হিজরি নবম শতকের বিশ্বকোষ লেখক শিহাবুদ্দিন আল-কালকাশান্দি তিনটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খিলাফতের গ্রন্থাগার সংস্কৃতির তুলনা করেছিলেন—বাগদাদের আব্বাসীয় বায়তুল হিকমাহ, কায়রোর ফাতেমীয় রাজকীয় গ্রন্থাগার এবং কর্দোবার উমাইয়া গ্রন্থাগার।
Visit biznow.biz for more information.
এই তিনটিকেই তিনি মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধিক রাজকীয় ‘খিজানাতুল কুতুব’ (বইয়ের ভান্ডার) বলে উল্লেখ করেছেন। (কালকাশান্দি, সুবহুল আশা ফী সিনাআতিল ইনশা, খণ্ড: ১৪, দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯১৩–১৯২২ খ্রি.)
মুসলিম সভ্যতায় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা শুধু যে রাজকীয় শৌখিনতা ছিল, তা নয়; বরং এটি খেলাফতের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈধতা প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। যে শাসকের গ্রন্থাগার যত সমৃদ্ধ, মুসলিম বিশ্বে তাঁর মর্যাদাও তত উচ্চ বলে গণ্য হতো।
কর্দোবার অভিজাতদের অনুসরণে সাধারণ ধনাঢ্য নাগরিকদের মধ্যেও ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার রাখার রীতি একপ্রকার সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
ফাতেমীয় ‘দারুল ইলম’
মিসরের ফাতেমীয় খেলাফতের (৯৬৯–১১৭১ খ্রি.) কায়রোর রাজপ্রাসাদে অবস্থিত ‘দারুল ইলম’ বা জ্ঞানভবন ছিল সমকালীন বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়। সমকালীন ঐতিহাসিক ইবনে আবি তাইয়ির বরাতে বলা হয়, এই গ্রন্থাগার ছিল ‘পৃথিবীর বিস্ময়সমূহের একটি’ এবং ইসলামি ভূখণ্ডে এর চেয়ে বড় গ্রন্থাগার আর ছিল না। (মাকরিজি, খিতাতে মাকরিজি, আল-মাতবাআতুল কুবরাল আমিরিয়্যাহ সংস্করণ, বুলাক, ১২৭০ হি.)
এই গ্রন্থাগারের প্রকৃত আকার নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ আছে—কোনো কোনো সমকালীন বিবরণে বইয়ের সংখ্যা দশ লাখ থেকে ষোলো-আঠারো লাখের মতো উল্লেখ করা হয়েছে।
১১৭১ সালে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি কায়রো দখলের সময় গ্রন্থাগারে থাকা বইয়ের সংখ্যা আধুনিক গবেষণায় প্রায় ১,২০,০০০ বলে অনুমান করা হয়েছে, সালাহুদ্দিন বহু বই তাঁর অনুসারীদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়ার পর। (ফাতিমিদ লাইব্রেরি: হিস্ট্রি, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট)
সংখ্যাগুলোর এই বিশাল ফারাক থেকেই বোঝা যায়, মধ্যযুগীয় ক্রনিকল-লেখকদের অনেক বিবরণেই অতিশয়োক্তি মিশে থাকত—তবে এ কথা নিঃসন্দেহ যে এই গ্রন্থাগার ছিল যুগের সবচেয়ে সমৃদ্ধ জ্ঞানভান্ডারগুলোর একটি, যার একটি বড় অংশ ছিল বাগদাদি ক্যালিগ্রাফারদের ‘খত্তে মানসুব’ রীতিতে হাতে লেখা মূল্যবান পাণ্ডুলিপি।
মুসলিম সভ্যতায় কৃতী শিক্ষার্থীদের সম্মাননা দেওয়াকর্দোবার উমাইয়া গ্রন্থাগার
স্পেনের উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় হাকাম (শাসনকাল ৯৬১–৯৭৬ খ্রি.) ছিলেন এক প্রকৃত বইপ্রেমী। তিনি বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো ও খোরাসানে নিজস্ব এজেন্ট পাঠিয়ে রাখতেন, যাদের কাজ ছিল মূল্য না দেখে নতুন প্রকাশিত বইয়ের প্রথম পাণ্ডুলিপি কিনে কর্ডোভায় পাঠানো।
ফলে কর্দোবার রাজপ্রাসাদ-গ্রন্থাগার ইউরোপের বুকে এক অভাবনীয় জ্ঞানভান্ডারে পরিণত হয়— আধুনিক গবেষকদের হিসাবে এর সংগ্রহ চার থেকে ছয় লাখ পাণ্ডুলিপির মধ্যে ছিল বলে অনুমান করা হয়, যা সমকালীন খ্রিষ্টান ইউরোপের যেকোনো গ্রন্থাগারের তুলনায় বহু গুণ বড় ছিল।
এই গ্রন্থাগারের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল তার সূচিপত্র বা ক্যাটালগ। কেবল বইয়ের নাম, লেখকের নাম ও বিষয়ভিত্তিক তালিকা তৈরি করতেই ৪৪টি খণ্ড বা রেজিস্টার প্রয়োজন হয়েছিল, প্রতি খণ্ডে বিশটি পাতা অর্থাৎ প্রায় ৮৮০ পাতার এক বিশাল ক্যাটালগ, যা শুধু বইয়ের পরিচিতি লিপিবদ্ধ করতেই ব্যয় হয়েছিল, বইয়ের প্রকৃত বিষয়বস্তু নয়। (তিলিমসানি, নাফহুত তিব মিন গুসনিল আন্দালুসির রাতিব, খণ্ড: ৮, দার সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮ খ্রি.)
কর্দোবার অভিজাতদের অনুসরণে সাধারণ ধনাঢ্য নাগরিকদের মধ্যেও ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার রাখার রীতি একপ্রকার সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
প্রতিটি বিষয়ের জন্য পৃথক কক্ষ বরাদ্দ ছিল এবং পাঠকদের কাগজ, কালি ও কলম বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হতো, যাতে তাঁরা প্রয়োজনীয় অংশ নকল করে নিতে পারেন।
গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা: শিরাজ থেকে মার্ভ
মুসলিম সভ্যতার গ্রন্থাগারগুলো ছিল মূলত আধুনিক গবেষণাকেন্দ্রের পূর্বসূরি। বুয়াইহি শাসক আজুদুদৌলার (মৃ. ৩৭২ হি.) শিরাজের গ্রন্থাগার বর্ণনা করতে গিয়ে মাকদিসি লিখেছেন, প্রতিটি বিষয়ের জন্য পৃথক কক্ষ বরাদ্দ ছিল এবং পাঠকদের কাগজ, কালি ও কলম বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হতো, যাতে তাঁরা প্রয়োজনীয় অংশ নকল করে নিতে পারেন। (মাকদিসি, আহসানুত তাকাসিম ফী মারিফাতিল আকালিম, ই. জে. ব্রিল, লাইডেন, ১৯০৬ খ্রি.)
বই ধার দেওয়ার ক্ষেত্রেও উদারতার নজির পাওয়া যায়। ভূগোলবিদ ইয়াকুত আল-হামাভি—যিনি নিজে একসময় বইয়ের ব্যবসায়ী ছিলেন এবং পরে মার্ভ শহরে দীর্ঘকাল বসবাস করেছিলেন—তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রচনার সময় মার্ভের মসজিদ-গ্রন্থাগারগুলোর সহায়তার কথা স্মরণ করেছেন।
মার্ভ ছিল তখনকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং সেখানকার গ্রন্থাগারগুলোর সহজলভ্যতা ও ব্যবস্থাপনাই তাঁকে এই বিশাল ভৌগোলিক বিশ্বকোষ রচনায় সহায়তা করেছিল। (হামাভি, মুজামুল বুলদান, খণ্ড: ৭ দার সাদির, বৈরুত, ১৯৯৫ খ্রি.)
মুসলিম সভ্যতায় উন্মুক্ত শিক্ষাঙ্গনকলম যেখানে তরবারির অধিক
সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির প্রধান সচিব ও উপদেষ্টা আবদুর রহিম আল-বায়সানি (মৃ. ৫৯৬ হি.) ছিলেন কায়রোর ‘মাদরাসাতুল ফাজিলিয়্যাহ’র প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রায় এক লাখ বইয়ের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের মালিক।
ইতিহাসে সুপরিচিত একটি উক্তিতে সালাহুদ্দিন তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন বলে কথিত আছে, ‘তোমরা মনে কোরো না যে আমি এই ভূখণ্ড তোমাদের তরবারি দিয়ে জয় করেছি; বরং আমি তা জয় করেছি কাজি আল-ফাজেলের (বায়সানির উপাধি) কলম দিয়ে।’
১২৫৮ সালে বাগদাদে মঙ্গোল আক্রমণের সময় বায়তুল হিকমাহসহ শহরের অসংখ্য গ্রন্থাগার ধ্বংস হয়ে যায়, বহু পাণ্ডুলিপি দজলা (টাইগ্রিস) নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল এবং বইয়ের কালিতে নদীর পানি কালো হয়ে গিয়েছিল।
জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের প্রচারণা ও কূটনীতিতেও কাজি আল-ফাজেলের লেখনীশক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। (ইবনে তাগরিবার্দি, আন-নুজুমুজ জাহিরা ফি মুলুকি মিসর ওয়াল কাহিরা, খণ্ড: ১৬, দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ, কায়রো ১৯৫৪ খ্রি.)
ধ্বংসের ইতিহাস
ইসলামি সভ্যতার এই অমূল্য গ্রন্থাগারগুলোর পতনের পেছনে যেমন রাজনৈতিক উত্থান-পতন ছিল, তেমনি ছিল বিদেশি আক্রমণ। ১২৫৮ সালে বাগদাদে মঙ্গোল আক্রমণের সময় বায়তুল হিকমাহসহ শহরের অসংখ্য গ্রন্থাগার ধ্বংস হয়ে যায়— ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, বহু পাণ্ডুলিপি টাইগ্রিস নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল এবং বইয়ের কালিতে নদীর পানি কালো হয়ে গিয়েছিল।
একইভাবে কায়রোর ফাতেমীয় গ্রন্থাগারও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং কর্দোবার বিশাল সংগ্রহও খেলাফতের পতনের পর ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। (ইবনে আবি উসাইবিয়াহ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, ৭৯২ পৃষ্ঠা, দার মাকতাবাতিল হায়াত, বৈরুত, ১৯৬৫ খ্রি.)
বিশ্ব–ইতিহাসের প্রথম হাসপাতাল মুসলিম সভ্যতায়