চুক্তির ভার পেজেশকিয়ানকে দিয়ে কেন দূরে থাকছেন খামেনি
· Prothom Alo

সমঝোতা স্মারস সইয়ের পর চুক্তির জন্য সুইজারল্যান্ডে আলোচনায় বসছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা। তবে এই আলোচনা নিয়ে ইরানের ভেতরকার মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নিজের ভিন্নমত জানিয়েই আলোচনার ভার তুলে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের হাতে।
Visit newsbetting.club for more information.
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক নিয়ে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির অবস্থান উৎসাহিত করেছে ইরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীকে, যারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার বিরোধী।
দৃশ্যত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা চুক্তির দায়দায়িত্ব তুলনামূলক মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে প্রেসিডেন্ট এখন কট্টরপন্থী শিবিরের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ওই গোষ্ঠী মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে।
পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছেন, তা ইসরায়েলের রাজনৈতিক গোষ্ঠীরও বিরোধিতার মুখে পড়েছে। তাদের মতে, তেহরান এবং তার নেতৃত্বাধীন ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জোটকে দুর্বল করতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর দীর্ঘমেয়াদি একটি চুক্তির লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে ইতিমধ্যে সমবেত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা। কিন্তু এমওইউ নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরেও চলছে আলোচনা, বিভিন্ন পক্ষ এটিকে দেখছে বিভিন্ন দৃষ্টিতে।
ট্রাম্প মরিয়া হয়ে চুক্তি করেছেন: মোজতবা খামেনিখামেনি কী বলেছেন?
গত মার্চে বাবা আয়তুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়া মোজতবা খামেনিকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি, তাঁর কোনো বক্তব্যও শোনা যায়নি। তবে সমঝোতা স্মারকটি নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার তাঁর নামে আসা এক সংক্ষিপ্ত লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়, নীতিগতভাবে এতে তাঁর মত ভিন্ন ছিল।
তবে বিবৃতিতে বলা হয়, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে এ বিষয়ে দায়িত্ব নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন তিনি।
তবে পেজেশকিয়ানকে তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটন অতিরিক্ত দাবি তুললে তাতে যেন নতি স্বীকার করা না হয়। একই সঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়, সামনে সরাসরি আলোচনা শুরু হলেও তার মানে এই নয় যে ‘শত্রুপক্ষের’ দাবি মেনে নেওয়া হচ্ছে।
তেহরান সরকারের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমের তথ্য, খামেনি শর্ত দিয়েছেন যে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অন্তত তিন-চতুর্থাংশ সদস্য চুক্তির পক্ষে মত দিলে তবেই এটি কার্যকর হবে।
এই পরিষদে সামরিক কমান্ডাররাও রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে প্রায় সব সদস্যই এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন, যদিও ভোটাভুটির বিস্তারিত এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনিকর্তৃপক্ষ কী বলছে?
সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে খামেনিকে আশ্বস্ত করে বলেছে, তারা ইরানি জাতির অধিকার ও প্রতিরোধ শক্তির স্বার্থ রক্ষা করবে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত ইরানি নেতাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাবে।
কাউন্সিল জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘পূর্ণ অবিশ্বাস’ বজায় রেখেই আলোচনা এগিয়ে নেবে এবং অন্য পক্ষ চুক্তির কোনো ধারা লঙ্ঘন করলে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও আগে থেকেই রাখা হয়েছে।
পেজেশকিয়ান এই সমঝোতা স্মারককে একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, শক্তিশালী ইরানের পক্ষ থেকে এটি এমন একটি বার্তা, যা দেখায় পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘এই দলিল এমন একটি জাতির কণ্ঠস্বর বহন করে, যারা কোনো হুমকি বা চাপের বিনিময়ে নিজেদের মর্যাদা ও স্বাধীনতা বিকিয়ে দেয়নি।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতায় ইরানে বিক্ষোভ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির বিরুদ্ধে স্লোগানপার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির দিকনির্দেশনামূলক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বার্তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে সমঝোতা স্মারক সহায়ক হলেও এটি ‘দীর্ঘ ও কঠিন’ একটি পথের সূচনা মাত্র।
গালিবাফ নিজেকে যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ‘কমান্ডার’ হিসেবে তুলে ধরে আলোচনার সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিজের হাতে চান বলেও ইঙ্গিত দেন।
চুক্তির আলোচনার জন্য শনিবার সুইজারল্যান্ডে পৌঁছান ইরানের স্পিকার বাঘের গালিবাফ (মাঝে) এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি (সবার ডানে)গালিবাফ বলেন, ‘আমি এমন ব্যক্তি নই যে সিদ্ধান্ত ছাড়া বসে থাকব এবং অপেক্ষা করব। আমাকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হোক, যাতে আমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া গালিবাফ আরও বলেন, এখন ইরানি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো মিসাইল উৎক্ষেপণকারী ইউনিটগুলোর কাছ থেকে দায়িত্ব নিয়ে নেওয়া করা, নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা এবং জনগণকে অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত করা।
ইরানের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট এই যুদ্ধ আরও তীব্র করে তুলেছে।
কট্টরপন্থীরা কেন বিক্ষোভে
মোজতবা খামেনির সমর্থকদের দাবি, ইরানি আলোচকদের হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের দাবিতে অনড় থাকতে হবে এবং চুক্তিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না হলে আলোচনা ছেড়ে চলে আসতে হবে।
যুদ্ধ চলাকালে ইরানের বিভিন্ন শহরে প্রায় প্রতি রাতে কট্টরপন্থীদের সমাবেশ থেকে পেজেশকিয়ান, গালিবাফ ও আব্বাস আরাগচির সমালোচনা করা হয়। কট্টরপন্থীরা তাঁদের মধ্যপন্থী শিবিরের প্রতিনিধি হিসেবে দেখেন এবং মনে করেন, তাঁরাই যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে দিতে পারেন।
তেহরানের সড়কে জাতীয় পতাকা হাতে এক ইরানি নারী। ইরানের কট্টরপন্থীরা চান যুক্তরাষ্ট্রর সঙ্গে আলোচনায় কোনো ছাড় দেওয়া যেন না হয়রাজধানী তেহরানের কাছের শহর শাহর-ই-রেতে এক সমাবেশে ধর্মীয় বক্তা মোহাম্মদ আলী বাখশি হুমকির সুরে বলেন, ‘মাননীয় প্রেসিডেন্ট, সর্বোচ্চ নেতার নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে আমরা আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়াব। আপনার জীবন দুর্বিষহ করে তুলব।’
এদিকে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মেহদি ধর্মীয় বক্তা বাখশি এবং এ ধরনের ‘সন্দেহজনক’ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, তারা দেশের রাজনৈতিক শিবিরগুলোর মধ্যে বিভেদ উসকে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির সমঝোতায় নাখোশ ইরানের কট্টরপন্থীরাকট্টরপন্থী কয়েকজন এমপি দাবি করেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সীমিত পরিসরে চলা পার্লামেন্টকে আবার পুরোপুরি কার্যকর করতে হবে, যাতে জাতীয় স্বার্থবিরোধী মনে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি আটকে দেওয়া যায়।
রক্ষণশীল অধ্যুষিত শহর কোমের প্রতিনিধি মোহাম্মদ মান্নান রাইসি এক্সে লেখেন, ‘ন্যায়বিচার করুন এবং পার্লামেন্ট সচল করুন। আমার সর্বোচ্চ নেতা একা হয়ে গেছেন।’
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শিয়া–অধ্যুষিত শহর মাশহাদে জুমার নামাজের খতিব এবং সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ আহমাদ আলামোলহোদার মতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে লড়াই এখনো শেষ হয়নি।
তেহরানে একটি রাস্তায় প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতিকৃতিতিনি বলেন, ‘৭০ বছর ধরে তারা আমাদের ওপর নানা ধরনের অপরাধ, অবিচার ও নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। আমরা কি এখন পিছু হটব? আমাদের শহীদ নেতার প্রতিশোধ নিতে কেবল একজন দুর্নীতিগ্রস্ত, পাপী কুকুরকে হত্যা করলেই চলবে না। এ ধরনের শত শত মানুষকে হত্যা করলেও আমাদের শহীদ নেতার একটি চুলের সমান মূল্যও পাব না।’
শনিবার সপ্তাহের প্রথম দিনে ইরানের সংবাদপত্রগুলো খামেনির বার্তা এবং সমঝোতা স্মারককে প্রধান শিরোনাম করেছে। কিছু রক্ষণশীল দৈনিক লিখেছে, সর্বোচ্চ নেতা শর্তসাপেক্ষে চুক্তির অনুমোদন দিয়েছেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনো কঠিন।
অন্যদিকে সংস্কারপন্থী দৈনিক এতেমাদ সমঝোতা স্মারককে ‘বিজয়ের দলিল’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া বিষয়গুলো নিয়ে ইরানের দুই রাজনৈতিক ধারার বিপরীতমুখী অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।