অপ্রতিরোধ্য ভিনিসিয়ুস, স্বপ্ন দেখতেই পারে ব্রাজিল
· Prothom Alo
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে দ্রুততম, সৃষ্টিশীল ও ভয়ংকর উইঙ্গারদের নাম উচ্চারণ করলে সবার আগে যাঁদের কথা আসে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ব্রাজিলের ফুটবল ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এই তরুণ তাঁর গতি, ড্রিবলিং, সাহসী আক্রমণ এবং গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা দিয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্ব ফুটবলে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সম্ভাবনাময় এক কিশোর থেকে তিনি পরিণত হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ফুটবল তারকায়।
২০০০ সালের ১২ জুলাই ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জন্ম নেওয়া ভিনিসিয়ুস জোসে পাইশাও দে অলিভেইরা জুনিয়রের ফুটবলযাত্রা শুরু হয় খুব অল্প বয়সেই। দরিদ্র ও সংগ্রামী পরিবেশ থেকে উঠে আসা এই তরুণের স্বপ্ন ছিল ব্রাজিলের জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। সেই স্বপ্নের প্রথম বাস্তব রূপ দেখা যায় ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ফ্লামেঙ্গোর যুব দলে। সেখানে তাঁর অসাধারণ প্রতিভা দ্রুতই সবার নজর কেড়ে নেয়।
Visit syntagm.co.za for more information.
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ জয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করছেন নেইমার ও ভিনিসিয়ুসফ্লামেঙ্গোর হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন ভিনিসিয়ুস। শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ তাঁকে দলে ভেড়ায়। শুরুতে নতুন পরিবেশ, নতুন ভাষা এবং ইউরোপীয় ফুটবলের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগলেও তিনি কখনোই হাল ছাড়েননি। কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং শেখার আগ্রহ তাঁকে ধীরে ধীরে রিয়াল মাদ্রিদের অন্যতম প্রধান অস্ত্রে পরিণত করেছে।
ভিনিসিয়ুসের খেলার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর বিস্ময়কর গতি এবং একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দক্ষতা। বাঁ প্রান্ত থেকে তাঁর আক্রমণ প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। শুধু গোল করাই নয়, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করতেও তিনি সমানভাবে পারদর্শী। ম্যাচের কঠিন মুহূর্তে দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার মানসিকতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের পক্ষে দ্বিতীয় গোল করার পর উদ্যাপনে ভিনিসিয়ুসচলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁর দুর্দান্ত ফর্মের প্রতিফলন শুরু থেকেই দেখা গেছে। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করেও তিনি নিজের অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন। পরবর্তী ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিলের ৩–০ গোলের জয়ে আবারও গোল ও অ্যাসিস্ট করে ম্যাচসেরার পুরস্কার নিজের করে নেন। তৃতীয় ম্যাচে আজ ভোরে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তিনি আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে ৩–০ ব্যবধানে জয় এনে দেন এবং টানা তৃতীয়বারের মতো ম্যাচসেরার পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর গতি, ড্রিবলিং ও নিখুঁত ফিনিশিংয়ে স্কটল্যান্ডের রক্ষণভাগ ম্যাচজুড়ে ছিল দিশাহারা। টানা কয়েকটি ম্যাচে গোল এবং ম্যাচসেরা হওয়ার কৃতিত্ব তাঁকে এরই মধ্যে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা পারফর্মার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জাতীয় দলের জার্সিতেও ভিনিসিয়ুস এখন অপরিহার্য নাম। ব্রাজিলের বয়সভিত্তিক দলগুলোতে অসাধারণ সাফল্যের পর তিনি সিনিয়র দলে জায়গা করে নেন। তাঁর গতিময় ফুটবল, আক্রমণাত্মক মানসিকতা এবং জয়ের ক্ষুধা ব্রাজিলকে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব দেওয়ার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বাস করেন, আগামী বছরগুলোতে ব্রাজিলের সাফল্যের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হবেন এই তারকা।
শুভ জন্মদিন ‘জাদুকর’ লিওনেল মেসিভিনিসিয়ুস জুনিয়র ব্রাজিলের ইতিহাসে মাত্র পঞ্চম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই গোল করার কীর্তি গড়েছেনব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও ভিনিসিয়ুসের সাফল্যের ঝুলি সমৃদ্ধ। তরুণ বয়সেই তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ক্লাব পর্যায়ের পুরস্কার অর্জন করেছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত ভক্তদের হৃদয় জয় করা। মাঠে তাঁর হাসিমুখ, লড়াকু মানসিকতা এবং কখনো হার না মানার দৃঢ়তা তাঁকে কোটি মানুষের প্রিয় ফুটবলারে পরিণত করেছে।
ফুটবল ইতিহাসে অনেক তারকা এসেছেন, অনেকেই আলো ছড়িয়েছেন। কিন্তু যাঁরা প্রতিভার সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম এবং অবিচল আত্মবিশ্বাসকে একত্র করতে পেরেছেন, তাঁরাই কিংবদন্তি হওয়ার পথে এগিয়েছেন। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র সেই পথেই হাঁটছেন। প্রতিটি ম্যাচে তিনি নতুন করে প্রমাণ করছেন, কেন তাঁকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে অপ্রতিরোধ্য ফুটবলারদের একজন বলা হয়।
ব্রাজিলের হলুদ জার্সি কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের সাদা জার্সি—যেখানেই খেলুক না কেন, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এখন শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি এক প্রজন্মের স্বপ্ন, সাহস ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁর প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি ড্রিবল এবং প্রতিটি গোল কোটি ভক্তের হৃদয়ে নতুন আশার সঞ্চার করে। বিশ্বকাপের মঞ্চে ধারাবাহিক অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে বর্তমান সময়ের সেরা ফুটবলারদের তালিকায় তাঁর নাম উচ্চারিত হওয়াটা মোটেও কাকতালীয় নয়। আর তাঁর দুরন্ত পথচলা দেখে মনে হয়, বিশ্ব ফুটবলের আকাশে এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলো আরও বহু বছর জ্বলবে।
উপদেষ্টা, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা