বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ ব্র্যান্ডগুলোই যেভাবে বেশি আলোচনায়

· Prothom Alo

লিভাইস চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে সবচেয়ে আলোচিত ব্র্যান্ডগুলোর একটি হওয়ার কথা ছিল না। একই কথা হেইঞ্জ বা বিটস ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। টুর্নামেন্টজুড়ে ফিফা এমন ব্যবস্থা করেছে, যাতে দর্শকদের চোখে এসব ব্র্যান্ড যতটা সম্ভব কম চোখে পড়ে। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সেই কৌশল কাজে লাগেনি; বরং ফিফা যে কারণে ব্যবস্থাটি নিয়েছে, ঠিক সে কারণেই তাদের কৌশলটি উল্টে লিভাইস, হেইঞ্জ ও বিটস ব্র্যান্ডের জন্য শাপে বর হয়ে উঠেছে। বদৌলতে এই ব্র্যান্ডগুলোকে নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে।

Visit bettingx.club for more information.

যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর লিভাইস স্টেডিয়ামের বাইরে ব্র্যান্ডটির বিখ্যাত লোগোটি সাদা ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। স্টেডিয়ামের ভেতরে সংবাদমাধ্যমের গ্যালারিতে রাখা হেইঞ্জের কেচাপ বোতলের লোগোও টেপ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এমনকি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়েরাও এই বিধিনিষেধ থেকে রেহাই পাননি। ম্যাচের আগে জার্মানির তারকা জামাল মুসিয়ালার একটি ছবিতে দেখা গেছে, তাঁর হেডফোনের বিটস লোগোটি মাস্কিং টেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

এর কারণ, প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটিই ফিফার আনুষ্ঠানিক স্পনসর বা পৃষ্ঠপোষক নয়। তবু এই তিনটি ব্র্যান্ডই বিশ্বকাপের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। অনেকের মতে, আনুষ্ঠানিক স্পনসর হতে যেসব প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি পাউন্ড ব্যয় করেছে, তাদের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসে গেছে এই ব্র্যান্ডগুলো।

এই ঘটনাকে বলা হয় ‘স্ট্রাইস্যান্ড ইফেক্ট’। গায়িকা ও অভিনেত্রী বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ডের নাম অনুসারে এই নামকরণ। একসময় তিনি ইন্টারনেট থেকে নিজের বাড়ির ছবি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু ফল হয়েছিল উল্টো। আগের চেয়ে আরও বেশি মানুষ সেই ছবিগুলো দেখতে শুরু করে। অর্থাৎ কোনো কিছু আড়াল বা দমন করার চেষ্টা অনেক সময় সেটিকেই আরও বেশি দৃশ্যমান করে তোলে। আর এই বিশ্বকাপে ফিফাও যেন সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।

নিচু মানসিকতা নয়, স্পনসরদের সুরক্ষা
ফিফা (ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল দ্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) অবশ্য এই ধরনের পদক্ষেপগুলো নিয়েছে কোনো নিম্ন মানসিকতা বা বিদ্বেষ থেকে নয়। তাদের লক্ষ্য, নিজেদের আনুষ্ঠানিক স্পনসরদের স্বার্থ রক্ষা করা। কারণ, বিশ্বকাপের সঙ্গে নিজেদের নাম যুক্ত করার অধিকার পেতে অফিশিয়াল স্পনসররা বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে থাকে। কিছু স্পনসরশিপ চুক্তির মূল্য কয়েক কোটি পাউন্ড পর্যন্ত হয়।

সেই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, যেসব প্রতিষ্ঠান অর্থ না দিয়েই বিশ্বকাপের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত দেখাতে চায়, তাদের কাছ থেকে অফিশিয়াল স্পনসরদের সুরক্ষা দেওয়া। যুক্তিটা সহজ। যদি কোনো ব্র্যান্ড বিনা খরচে একই ধরনের প্রচার পেয়ে যায়, তাহলে একচেটিয়া সেই অধিকার পেতে কেউই আর অর্থ ব্যয় করবে না।

এ কারণেই ফিফা অন্যান্য ব্র্যান্ডের দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করতে পারে, খেলোয়াড় বা দর্শক কী পরিধান করে মাঠে প্রবেশ করবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, নির্দিষ্ট শব্দ বা পরিভাষার ব্যবহার সীমিত করতে পারে, এমনকি টুর্নামেন্টের নিজস্ব ফন্টও সুরক্ষিত রাখে।

তবে দর্শকের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। আর ব্র্যান্ডগুলোও সব সময় এমন কোনো না কোনো বিকল্প পথ খুঁজে নেয়, যার মাধ্যমে তারা আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে পারে। বিপণনের ভাষায় একে বলা হয়, ‘অ্যামবুশ মার্কেটিং’। ১৯৯৪ সাল থেকেই এই কৌশলের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে ফিফা।

ফিফার ব্র্যান্ড যুদ্ধ
২০০৬ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের সমর্থকদের স্টেডিয়ামে ঢোকার আগে প্যান্ট খুলে ফেলতে বলা হয়েছিল। পোশাকটি কোনোভাবেই অশোভন ছিল না। সমস্যা ছিল, তাতে ছিল ‘বাভারিয়া’ ব্র্যান্ডের লোগো। অথচ বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক স্পনসর ছিল ‘বাডওয়াইজার’।

খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে একজন সমর্থক অন্তর্বাস পরেই পুরো ম্যাচ দেখেছেন। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। অথচ এই প্রচারণার জন্য বাভারিয়াকে ফিফার তহবিলে একটি পয়সাও দিতে হয়নি।

এরপর ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিমান সংস্থা ‘কুলুলা’ নিজেদের ‘ওই যে টুর্নামেন্ট’-এর অনানুষ্ঠানিক বিমান সংস্থা বলে একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করেছিল। ফিফার চাপে শেষ পর্যন্ত সেটি প্রত্যাহার করতে হয়। কিন্তু প্রত্যাহারের পরই বিজ্ঞাপনটি আরও বেশি প্রচার পায়।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ‘সনি’ ছিল ফিফার আনুষ্ঠানিক স্পনসর। অন্যদিকে ‘বিটস বাই ড্রে’-এর পণ্য বিশ্বকাপের সব স্টেডিয়াম ও গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান থেকে নিষিদ্ধ ছিল। সনি খেলোয়াড়দের বিনা মূল্যে হেডফোন দিলেও অনেক তারকা ফুটবলার দলীয় বাসে, অনুশীলনের সময়, টানেলে অর্থাৎ ফিফার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা প্রায় সব জায়গাতেই বিটসের হেডফোন ব্যবহার করতেন।

এদিকে বিটস পাঁচ মিনিটের একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে নিজেদের প্রচারণা আরও জোরদার করে। ফলে সনি একচেটিয়া প্রচারের অধিকার কিনে নিলেও মানুষের মনোযোগ কিন্তু কেড়ে নিয়েছিল বিটসই।

অ্যামবুশ মার্কেটিংয়ের শক্তি
এসব ঘটনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং তার পর কী ঘটে, সেটি।
হেইঞ্জ টেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া কেচাপের বোতলটিকেই সীমিত সংস্করণের (লিমিটেড এডিশন) নতুন পণ্য হিসেবে বাজারে আনে।

অন্যদিকে বিটস জামাল মুসিয়ালার সেই ছবিটি, যেখানে হেডফোনের লোগো টেপ দিয়ে ঢেকে রাখা ছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে। ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘আগাম ইঙ্গিত: এটি বি’। পরে জানা যায়, এটি ছিল এমন একটি নতুন হেডফোন মডেলের টিজার, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আগে কেউই জানত না। অর্থাৎ ফিফাই কার্যত বিটসের নতুন পণ্যের উদ্বোধনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

লিভাইস কোনো আলাদা প্রচারণার কৌশল নেয়নি। তারা শুধু ফিফাকে তাদের লোগো ঢেকে দিতে দিয়েছে। আর সেটিই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। লিভাইসের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টেই কয়েক লাখ মানুষের প্রতিক্রিয়া আসে। লোগো ঢেকে রাখার একটি টিকটক ভিডিও দেখা হয় প্রায় ৯০ লাখ বার।

এরপর লিভাইস একই ধরনের ত্রিপল-ঢাকা লোগো ব্যবহার করে লন্ডন, প্যারিস, মিলান, বার্লিন, হংকং, ব্রাজিল ও মেক্সিকোর দোকানগুলোতেও প্রচারণা চালায়। অর্থাৎ লোগো ঢেকে দেওয়ার ঘটনাটিই তাদের বিজ্ঞাপন প্রচারণার অংশ হয়ে ওঠে।

আনুষ্ঠানিক বনাম অনানুষ্ঠানিক
সহজেই মনে হতে পারে, স্পনসরশিপের চেয়ে অ্যামবুশ মার্কেটিং বেশি কার্যকর। তবে এমন সিদ্ধান্ত পুরো চিত্র তুলে ধরে না।

লিভাইস, বিটস ও হেইঞ্জ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক স্পনসররা খেলছে ভিন্ন এক খেলা। তারা শুধু প্রচারণাই পায় না; বরং বিশ্বকাপের মতো বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রীড়া আসরের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের যুক্ত করার অধিকার, বিশেষ প্রবেশাধিকার, বিভিন্ন প্রচারণামূলক কার্যক্রম (অ্যাকটিভেশন), আতিথেয়তা-সুবিধা এবং অফিশিয়াল অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাও পায়।

এসব সুবিধার বিকল্প তৈরি করা খুবই কঠিন। তাই স্পনসরশিপ এবং অ্যামবুশ মার্কেটিং আসলে একই লক্ষ্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে না। এক পক্ষ চায় পুরো আয়োজনের মালিকানার অনুভূতি তৈরি করতে, আর অন্য পক্ষ চায় সেই আয়োজনকে ঘিরে চলা আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে।

টুর্নামেন্ট চলাকালে অ্যামবুশ মার্কেটিং হয়তো বেশি সাফল্য পেতে পারে। কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যেতে পারে আনুষ্ঠানিক স্পনসরশিপই। এই মুহূর্তে বিশ্বের মনোযোগ কে কেড়ে নিয়েছে, তা স্পষ্ট।

বিশ্বকাপের ট্রফি তুলে দেওয়ার অনেক পরে, যখন স্টেডিয়ামের লোগোর ওপর থেকে সেই সাদা ত্রিপলও সরিয়ে ফেলা হবে, তখন মানুষের মনে শেষ পর্যন্ত কার উপস্থিতি টিকে থাকবে—সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো তখনই মিলবে।

Read full story at source