বুধবার। আমাদের দেশের শিশুরা কেন যথেষ্ট লম্বা হচ্ছে না
· Prothom Alo
শিশু কতটুকু লম্বা হবে, তার ৮০ শতাংশই ঠিক করে দেয় বাবা-মায়ের উচ্চতা। বাকি ২০ শতাংশ কিছু জন্মগত রোগ ও বহুবিধ পারিপার্শ্বিক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাবা-মায়ের উচ্চতামাফিক লম্বা হওয়ার প্রক্রিয়াও বিভিন্ন কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আজকের আলোচনার প্রধান বিষয়ও তা–ই।
Visit sportbet.rodeo for more information.
শিশুরা কত দিন পর্যন্ত লম্বা হয়
জন্মের পর প্রথম ৩ বছর এবং পরে বয়ঃসন্ধিকালে দ্রুত লম্বা হওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ সাধারণত তার উচ্চতায় পৌঁছায়। মেয়েরা সর্বোচ্চ ১৫ বছর আর ছেলেরা ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তবে সত্যিকার অর্থে ১৩ বছরের পর মেয়েদের আর ১৫ বছরের পর ছেলেদের লম্বা হওয়ার সুযোগ ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে।
সাধারণত ৩ বছর থেকে বয়ঃসন্ধির আগপর্যন্ত শিশু বছরে গড়ে ২ ইঞ্চি বা ৫ সেন্টিমিটার করে লম্বা হয়। কিন্তু সব সময় এই হিসাব যে মিলবে, তা–ও নয়। অনেক রোগ আছে, যেমন কিছু সিনড্রোম, অস্থি বা হাড়ের সমস্যা, মেটাবলিক ডিজঅর্ডার ইত্যাদি কারণে মানুষ জন্মগতভাবে খাটো হতে পারে।
কিছু জন্মগত রোগ যেমন থাইরয়েড ও গ্রোথ হরমোনের অভাব, ডায়াবেটিস, টার্নার সিনড্রোম, কিডনি ডিজিজসহ কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হরমোন দিয়ে চিকিৎসা করলে স্বাভাবিক উচ্চতা পাওয়ার সুযোগ থাকে।
একটি বিষয় জানিয়ে রাখি, মায়ের গর্ভকালীন সুস্থতা ও সঠিক পুষ্টি পরবর্তীকলে সন্তানের লম্বা হওয়ার বিশেষ ভূমিকা রাখে। জন্মের সময় ওজন কম বা অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়া শিশুরা তিন-চার বছরের মধ্যে স্বাভাবিক ওজন ও উচ্চতা না পেলে গ্রোথ হরমোন থেরাপি দেওয়া যেতে পারে। এ কারণগুলো বিবেচনায় রাখলে জন্মের পর একটি শিশুর কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা নির্ণয় করা সম্ভব।
খাটো হওয়ার যত কারণ
বাংলাদেশে শিশুদের খাটো হওয়ার অন্যতম কারণ স্টান্টিংসর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশুদের খাটো হওয়ার অন্যতম কারণ স্টান্টিং, যার অর্থ দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির কারণে লম্বা না হওয়া। এসব শিশুর ওজনও কম থাকে। এই দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির কারণ কী? দারিদ্র্যের কারণে পুষ্টিকর খাবার জোগান দিতে না পারা ছাড়াও নিম্নোক্ত কারণগুলো ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
শিশু যদি বারবার অসুস্থ হয়, তাহলে একাধারে যেমন শরীরে শক্তি বা ক্যালরির চাহিদা বেড়ে যায়, অন্যদিকে সে পর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না। দুইয়ে মিলে শরীরে প্রয়োজনীয় ক্যালরির অভাব দেখা যায়, ফলে ওজন তো বাড়েই না, উল্টো আরও কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ক্যালরির অভাব থাকলে তা উচ্চতা বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে। মনে রাখতে হবে, নিয়মিত বৃদ্ধির জন্য শিশুর শরীরে ক্যালরির চাহিদা একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তার জন্য প্রয়োজন এমন খাবার, যা ক্যালরির জোগান দেয়, যেমন শর্করা, আমিষ ও চর্বি–জাতীয় খাবার।
আমাদের দেশে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, আমরা শিশুর রুচি বৃদ্ধির জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই, ভিটামিন খাওয়াই। মনে রাখবেন, অরুচি নিজে কোনো রোগ নয়, এটা একটি উপসর্গ। পৃথিবীতে ‘রুচিবিশেষজ্ঞ’ বলে কিছু নেই। তাই আগে জানতে হবে রুচি কমে যাওয়া বা ক্ষুধামান্দ্যের প্রকৃত কারণ কী! কোনো মানুষ যদি সার্বিকভাবে সুস্থ থাকে, তাহলে তার খিদে থাকবেই। তাহলে প্রশ্ন হলো, আপাত সুস্থ থাকলেও শিশু কেন খেতে চায় না। খাওয়ার জন্য শিশুকে সার্বিক অর্থে সুস্থ থাকতে হবে, তার জন্য পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও মানসিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, নিয়মমাফিক নির্দিষ্ট সময় পরপর খেতে দিতে হবে। কারণ, শিশুর পাকস্থলী খালি হতে একটা নির্দিষ্ট সময় দরকার। এর আগেই খাওয়াতে চাইলে শিশু অনীহা প্রকাশ করবে। জোর করে খাওয়াতে চাইলে তা আরও ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বহু আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু যদি দীর্ঘমেয়াদি কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগে, অর্থাৎ নিয়মিত সঠিকভাবে মল ত্যাগ না করে, তাহলে ক্ষুধামান্দ্য বা রুচি কমে যায়। এর থেকে শিশুর দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি হয় এবং লম্বা হওয়া বাধাগ্রস্ত হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য হলে পেটে গ্যাস অনুভূত হয়, সে ক্ষেত্রে শিশুকে সঠিকভাবে মল ত্যাগে অভ্যস্ত না করে তথাকথিত গ্যাসের ওষুধ সেবন করালে কাজে আসে না, পাশাপাশি এই গ্যাসের ওষুধ দীর্ঘদিন খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।
এখন শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বেশির ভাগ শিশু ঘরে তৈরি সুষম খাবার (ভাত, ডাল, সবজি, মাছ-মাংস) না খেয়ে বাইরের খাবার পছন্দ করে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তৈরি এসব মানহীন খাবারে ভিটামিন-মিনারেলস থাকে না, থাকে স্বল্প বা অতিমাত্রায় ক্যালরি, যা শিশুকে রুগ্ণ বা স্থূল করে। অনেক সময় এসব খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস বা পেটের পীড়ার কারণ হতে পারে। কেউ কেউ আবার অধিক ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়ানোর জন্য অতিমাত্রায় ফল, বাদাম বা আমিষ খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যা ঠিক নয়।
মনে রাখা জরুরি, খাদ্য হতে হবে সুষম। যাতে থাকবে শর্করা, আমিষ, চর্বি, ভিটামিন, মিনারেলস ও পানির সমাহার। ক্যালরি বিবেচনায় খাদ্যের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ক্যালরি শর্করা থেকে, ১৫ থেকে ২০ ভাগ আমিষ ও ২৫ থেকে ৩৫ ভাগ চর্বি থেকে আসতে হবে। কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ভিটামিন ও মিনারেলস পেতে প্রতি বেলা খাবারে শাকসবজির কোনো বিকল্প নেই। শুধু ভিটামিন বা মিনারেলস সিরাপ কোনোভাবেই ওজন বা উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে সহায়তা করতে পারে না। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি ভিটামিন ডির অভাব শিশুর সার্বিক উচ্চতা বৃদ্ধিতে বাধা হিসেবে কাজ করতে পারে।
সমাধান কী
যেকোনো শিশুকে খাটো মনে হলে অল্প বয়সেই মূল্যায়ন করতে হবে, কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হবে। খর্বতার চিকিৎসাযোগ্য কোনো কারণ পাওয়া গেলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। আর যেসব শিশু আপাত সুস্থ, তারা যেন তাদের কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা পায়, তার জন্য নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে।
ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো। এরপর শিশুকে সুষম সম্পূরক খাবার দিতে হবে। যথাসম্ভব বাইরের খাবার বাদ দিতে হবে।
প্রথমে সঠিকভাবে ওজন বাড়ছে কি না, লক্ষ রাখতে হবে, না হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। কারণ, কম ওজন অপুষ্টির লক্ষণ ও পরবর্তীকালে উচ্চতা বৃদ্ধিতে বাধা তৈরি করে।
যেকোনো অসুস্থতার দ্রুত ও পরিপূর্ণ চিকিৎসা করতে হবে।
ক্ষুধামান্দ্য বা রুচি কমে গেলে তথাকথিত রুচিবর্ধক বা গ্যাসের ওষুধ না খেয়ে সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
দুই বছর বয়স হলেই শিশুকে নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস বা টয়লেট ট্রেনিং দিতে হবে।
শিশুকে নিয়মিত সূর্যালোকের সংস্পর্শে আনতে হবে, যা পর্যাপ্ত ভিটামিন ডির জোগান নিশ্চিত করতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, শিশু হরমোন রোগ বিভাগ, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা
উচ্চতা বাড়াতে পারবেন এই বুদ্ধিতে