সিমন নামের এক নীরব প্রাচীর

· Prothom Alo

টাইম মেশিনে চেপে একটু পেছনে ফেরা যাক। দিনো জফের উত্তরসূরি ওয়াল্টার জেঙ্গা ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপে গোলপোস্টের নিচে ইতিহাস গড়েন। টানা ৫১৭ মিনিট তাঁর জালে বল ছোঁয়াতে পারেননি কোনো স্ট্রাইকার। ফুটবল–বিশ্ব ভেবেছিল, এই কীর্তি বুঝি অলঙ্ঘনীয়। ইকার ক্যাসিয়াস, জিয়ানলুইজি বুফন বা অলিভার কানের মতো অতিমানবদের ক্যারিয়ারও এই রেকর্ডের সামনে এসে থমকে গিয়েছিল।

কিন্তু ৩৬ বছর পর ২০২৬-এর বিশ্বকাপ মঞ্চে দাঁড়িয়ে ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার ২৯ বছরের এক নিভৃতচারী স্প্যানিশ যেন নীরবে বললেন, ‘ইতিহাস তো ভাঙার জন্যই!’

Visit casino-promo.biz for more information.

উনাই সিমন—কাতার বিশ্বকাপের হতাশা পেরিয়ে যিনি এখন চলতি বিশ্বকাপের বড় বিস্ময়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে চার ম্যাচে মাত্র ৩টি গোল হজম করেও দ্রুত বিদায় নিতে হয়েছিল সিমন ও তাঁর দল স্পেনকে। কিন্তু সেই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে জাপানের কাছে ২-১ ব্যবধানে হারের পর থেকেই স্পেনের গোলপোস্টের নিচে অপরাজিত এই স্প্যানিশ গোলরক্ষক। কাতার বিশ্বকাপে শেষ ১৫৯ মিনিট স্পেনের জালে কোনো বল জড়াতে দেননি। সেই অজেয় যাত্রাকে সঙ্গী করে এই বিশ্বকাপেও তা দেননি টানা পাঁচ ম্যাচে।

কোয়ার্টার ফাইনালের মহারণে আজ যখন বেলজিয়াম স্পেনের বক্সে আক্রমণ শাণাবে, তখন সবার চোখ থাকবে সিমনের দিকে। টানা ৬০৯ মিনিট অপরাজিত থাকা এই স্প্যানিশ প্রাচীর কি পারবেন আজও নিজের পোস্ট অক্ষত রাখতে।

কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ে শুরু। সৌদি আরব ও উরুগুয়েকে ৪-০ ও ১-০ গোলে হারিয়ে নকআউট পর্বে ওঠা স্পেন শেষ ৩২-এ অস্ট্রিয়াকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেওয়ার পথে ৫১৯ মিনিট জাল অক্ষত রেখে ওয়াল্টার জেঙ্গার রেকর্ড ভেঙে দেন সিমন। এখানেই শেষ নয়, শেষ ১৬-এর ম্যাচে শক্তিশালী পর্তুগালকেও থামিয়ে নিজের কীর্তিকে টেনে নেন ৬০৯ মিনিট পর্যন্ত। এই বিশ্বকাপে মোট ৯টি সেভ করে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে উঠেছেন।

দুর্দান্ত সময় কাটছে উনাই সিমনের

কোয়ার্টার ফাইনালের মহারণে আজ যখন বেলজিয়াম স্পেনের বক্সে আক্রমণ শাণাবে, তখন সবার চোখ থাকবে সিমনের দিকে। টানা ৬০৯ মিনিট অপরাজিত থাকা এই স্প্যানিশ প্রাচীর কি পারবেন আজও নিজের পোস্ট অক্ষত রাখতে। উত্তরটা সময়ের হাতে থাকলেও সিমন যে নিজের সবটুকু দিয়ে দুর্গ পাহারা দেবেন, তা তো সবারই জানা।

স্পেনের বাস্ক অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এই গোলরক্ষক বড় হয়েছেন এক পুলিশ পরিবারে, যেখানে বাবা স্পেনের জাতীয় পুলিশ বাহিনীর অফিসার এবং মা বাস্ক অঞ্চলের স্থানীয় পুলিশের কর্মকর্তা। অপরাধীদের দমনে নিয়োজিত মা-বাবার সেই অদম্য সাহস আর কঠোর শৃঙ্খলাই সিমন যেন তুলে এনেছেন ফুটবল মাঠে।

আজকের ফুটবল–দুনিয়ায় ইনস্টাগ্রাম, টিকটক রিলস থেকে দূরে থাকা সিমন যেন এক ব্যতিক্রমী ‘সাধু’। মাঠের বাইরের ব্যক্তিগত জীবনটাকে এক রহস্যের চাদরে ঢেকে রেখেছেন। ২০২২ সালে শুধু জানিয়েছিলেন এক সম্পর্কে আছেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো ক্যামেরা তাঁর বান্ধবীর ছবি ফ্রেমবন্দী করতে পারেনি।

অথচ সিমনের এই অবিশ্বাস্য যাত্রার শুরুটা হতে পারত চরম হতাশায়। লা লিগায় অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের হয়ে প্রায় পুরো ক্যারিয়ার কাটানো এই কিপার সর্বশেষ ঘরোয়া মৌসুমে ৩৭ ম্যাচে ৫৪টি গোল হজম করেছিলেন। ফলে স্পেনের ফুটবল–মহলে দাবি ওঠে, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে টানা তিনবার গোল্ডেন গ্লাভসজয়ী ডেভিড রায়াকেই একাদশে খেলাতে। কিন্তু আর্সেনালের রায়া নন, স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ভরসা রেখেছেন সিমনের ওপর।

বার্সেলোনায় এই বেলজিয়াম দলের একজনকেই চাইতেন ইয়ামাল, তিনি কে

১৯৫৮ বিশ্বকাপে কিংবদন্তি লেভ ইয়াশিনের ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’ নামকে আরও সার্থক করে তোলা বা ১৯৭০ বিশ্বকাপে পেলের হেড আটকিয়ে গর্ডন ব্যাঙ্কসের সেই ‘সেভ অব দ্য সেঞ্চুরি’র মতো কোনো রোমাঞ্চকর বিশেষণ হয়তো এখনো বসেনি সিমনের নামের পাশে। তবে তিনি হাঁটছেন নিজের মতো করে।

২০০৬ বিশ্বকাপে ইতালির জিয়ানলুইজি বুফন বা ২০১০ বিশ্বকাপে স্পেনের ইকার ক্যাসিয়াস পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র দুটি করে গোল হজম করে দলকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করিয়েছিলেন। আজ কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে সিমনের স্পেনের সেই অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে একটি ভুলই থামিয়ে দিতে পারে তাঁর এই অবিশ্বাস্য স্বপ্নযাত্রা।

বেলজিয়ামের মুখোমুখি হওয়ার আগে অনুশীলনে স্পেন দল

এমিলিয়ানো মার্তিনেজ বা লুইস চিলাভার্টদের মতো অতটা আগ্রাসী নন সিমন, পেনাল্টি শুটআউটে নানাভাবে নড়াচড়া করে কোনো মনস্তাত্ত্বিক খেলাও খেলেন না। বরং কিংবদন্তি দিনো জফের মতো ধীরস্থির।

আর তাতেই প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারদের জন্য আস্ত গোলপোস্টটা যেন দেশলাইয়ের বাক্সের মতো ছোট হয়ে যায়। ক্যাসিয়াসের মতো ক্ষিপ্র আর বুফনের মতো বিশ্বস্ত সিমন, যিনি জেঙ্গার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী দেয়াল। এই দেয়ালকে ইতিহাস নিজেই যেন আজ সম্ভ্রমে কুর্নিশ জানায়।

মেসির সঙ্গে এমবাপ্পের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই—দেখুন পরিসংখ্যান

Read full story at source