দ্রুতি এবং বেগ কী, এদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়

· Prothom Alo

আগের পর্ব

গাড়ি ছুটছে দুরন্ত গতিতে৷ এই গতি কি সবসময় এক থাকে? কখনো কমে, কখনো বাড়ে৷ এই বাড়া-কমার হিসাব রাখতে হয়। দৈনন্দিন জীবনে যতটা, তার চেয়ে বেশি পদার্থবিজ্ঞানে।

পদার্থবিজ্ঞানে গাড়ি, ট্রেন ইত্যাদির গতি নিয়ে শত শত অঙ্ক কষতে হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গাড়ি বা ট্রেনের গতি পদার্থবিজ্ঞানে ঠিক কী কাজে লাগে?

Visit syntagm.co.za for more information.

গাড়ি বা ট্রেন এখানে অনুষঙ্গ মাত্র। আসল ব্যাপার হলো গতি৷ গতির ধর্ম ও প্রকৃতি বোঝার জন্য বারবার ট্রেন ও গাড়ির প্রসঙ্গ আসে। পদার্থবিজ্ঞানের গতির হিসাব-নিকাশ করা হয় আরও বড় স্কেলে। যেমন, গ্রহ-নক্ষত্রের গতি, খুদে কণাদের গতি ইত্যাদি। আর গতি থেকেই জন্ম নেয় গতিবিদ্যা। গতিবিদ্যার বেসিকটা বোঝার জন্য চাই সহজ উদাহরণ। এজন্যই বারবার গাড়ি বা ট্রেন চলে আসে। মূল উদ্দেশ্য হলো গতির প্রকৃতি জানা।

পদার্থবিজ্ঞানে গতিকে মোটা দাগে দুই রূপে প্রকাশ করা হয়—বেগ ও দ্রুতি। রৈখিক গতির ক্ষেত্রে বেগ এবং দ্রুতি দুটোরই ব্যবহার আছে৷ কিন্তু কৌণিক গতির শুধুই কৌণিক বেগ, কৌণিক দ্রুতি বলে কিছু নেই। এর অবশ্য কারণও আছে। কারণ হলো দিক। রৈখিক গতির ক্ষেত্রে বেগ ও দ্রুতি একই। কিন্তু কৌণিক গতির ক্ষেত্রে সেটা এক নয়। আমাদের বেগ ও দ্রুতি আলাদা করে মনে রাখা দরকার। কিন্তু পথ যদি সরলরৈখিক বা কৌণিক কোনোটাই না হয়, কিছু দূর পর পর গিয়ে গিয়ে গতির দিক পরিবর্তন হয়, তাহলে সেখানে দ্রুতি ও বেগ দুটোই একসঙ্গে হাজির হতে পারে, কিন্তু আলাদা রূপে, আলাদা মান নিয়ে।

কৌণিক গতির শুধুই কৌণিক বেগ, কৌণিক দ্রুতি বলে কিছু নেই। এর অবশ্য কারণও আছে। কারণ হলো দিক। রৈখিক গতির ক্ষেত্রে বেগ ও দ্রুতি একই। কিন্তু কৌনিক গতির ক্ষেত্রে সেটা এক নয়।

এখন দেখা যাক দ্রুতি কী? একটা বস্তু একটা নির্দিষ্ট সময়ে যে পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করে সেটাই হলো বস্তুর দ্রুতি। অর্থাৎ প্রতি একক সময়ে দূরত্ব পরিবর্তনের হারকে দ্রুতি বলে।

ধরা যাক, একটা গাড়ি চলছে সোজা পথে, নানা কারণেই গাড়িটা হয়তো একই গতিতে চলতে পারে না। কখনো চলার পথে অন্য কোনো বস্তু এসে পড়তে পারে, তখন গতি কমাতে হয়। আবার খুব ভালো এবং নিরিবিলি রাস্তায় চালক গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেন। ধরা যাক, গাড়িটা তিন ঘণ্টায় মোট ১৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিল। সুতরাং গাড়ির দ্রুতি প্রতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার।

দ্রুতির সূত্র হলো, দ্রুতি = মোট অতিক্রান্ত দূরত্ব/সময়। অর্থাৎ v = s/t। এখানে s হলো অতিক্রান্ত দূরত্ব এবং t হলো মোট সময়।

অর্থাৎ আমাদের গাড়িটির দ্রুতি, v = ১৮০/৩ = ৬০ কিমি/ঘণ্টা। গাড়ি, ট্রেন, জাহাজ, বিমান, এসব কম গতির বস্তুর ক্ষেত্রে দ্রুতির হিসাব কষা হয় ঘণ্টায়।

কিন্তু দ্রুতগতির বস্তুর ক্ষেত্রে হিসাব কষা হয় মিটার ও সেকেন্ডে। অর্থাৎ এমকেএস পদ্ধতিতে। ধরা যাক, একটা দ্রুতগতির কণা ২০ সেকেন্ডে ৪০ হাজার মিটার দূরত্ব অতিক্রম করল। তাই এর দ্রুতি v = ৪০০০০/২০ = ২০০ মিটার/সেকেন্ড। এটা হলো, এমকেএস পদ্ধতির হিসাব। পদার্থবিজ্ঞানে এই পদ্ধতিতেই বেশিরভাগ হিসাব-নিকাশ করা হয়। তাই বেশিরভাগ কম গতির বস্তু যেমন গাড়ি বা ট্রেনের ক্ষেত্রেও কিলোমিটারকে মিটার এবং ঘণ্টাকে সেকেন্ডে পরিবর্তন করে নেওয়া হয়।

ধরা যাক, একটা দ্রুতগতির কণা ২০ সেকেন্ডে ৪০ হাজার মিটার দূরত্ব অতিক্রম করল। তাই এর দ্রুতি v = ৪০০০০/২০ = ২০০ মিটার/সেকেন্ড। এটা হলো, এমকেএস পদ্ধতির হিসাব।

আমাদের, আগের ওই গাড়িটার দ্রুতি ছিল ৬০ kmh-1। এমকেএস পদ্ধতিতে এটাকে রূপান্তর করা যাক। ১০০০ মিটারে ১ কিলোমিটার। তাহলে গাড়িটার মোট অতিক্রান্ত দূরত্ব দাঁড়াবে, ১৮০ × ১০০০ মিটার = ১৮০০০০ মিটার। এই দূরত্ব পাড়ি দিতে ৩ ঘণ্টা সময় নিয়েছে। এই সময়টাকে আমরা সেকেন্ডে পরিণত করব। ১ ঘণ্টা = ৩৬০০ সেকেন্ড। তাই ৩ ঘণ্টা = ১০৮০০ সেকেন্ড।]

তাহলে গাড়িটির দ্রুতি দাঁড়াবে v = ১,৮০,০০০/১০,৮০০ = ১৬.৬৬ মিটার/সেকেন্ড

সরলরৈখিক গতির ক্ষেত্রে বেগ ও দ্রুতির মধ্যে পার্থক্য নেই। আসলে রৈখিক গতিতে বেগ বলে কিছু নেই। কারণ বেগ ভেক্টর রাশি। এর সঙ্গে দিক জড়িত থাকে। সরলরৈখিক গতির ক্ষেত্রে দিক সব সময় একই থাকে। তাই এক্ষেত্রে বেগ ও দ্রুতি আসলে একই। দ্রুতি স্কেলার রাশি, বেগ ভেক্টর রাশি। দিক পরিবর্তন হয় না বলে তাই এখানে দ্রুতি ও বেগ সমান। কিন্তু আমরা অহরহ ‘বেগ’ বলতে অভ্যস্ত। স্কুল পদার্থবিজ্ঞানের বইগুলোতেও আমরা দ্রুতিকে বেগ লিখতে দেখি। কারণ এই বইয়ে সরল রৈখিক গতি নিয়েই বেশি আলোচনা করা হয়েছে। পার্থক্য নেই বলে দ্রুতির বদলে বেগ ব্যবহার করা হয়েছে।

কিন্তু পথ যদি আঁকাবাঁকা না হয়, তখন বস্তুর দিক সবসময় এক থাকে না। তাই দ্রুতি আর বেগের মানের পার্থক্য দেখা যায়। এক্ষেত্রে চিহ্ন দেখে পার্থক্যটা বোঝা যায়। দ্রুতির চিহ্ন v-এর মাথায় কোনো ভেক্টর চিহ্ন অর্থাৎ ক্যাপ বা দাগ বা তির থাকে না। কিন্তু বেগের ক্ষেত্রে অবশ্যই ভেক্টর চিহ্ন ṽ থাকবে।

সরলরৈখিক গতির ক্ষেত্রে দিক সব সময় একই থাকে। তাই এক্ষেত্রে বেগ ও দ্রুতি আসলে একই। দ্রুতি স্কেলার রাশি, বেগ ভেক্টর রাশি। দিক পরিবর্তন হয় না বলে তাই এখানে দ্রুতি ও বেগ সমান।

বেগ হচ্ছে ভেক্টর রাশি, দ্রুতি স্কেলার রাশি। তাই দ্রুতির সম্পর্ক দূরত্বের সঙ্গে আর বেগের সম্পর্ক সরণের সঙ্গে। সোজা কথায়, একটা নির্দিষ্ট সময়ে দূরত্বের পরিবর্তনের হারকেই দ্রুতি বলে। অন্যদিকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দিকে একটা বস্তুর সরণের পরিবর্তনের হারকে বলে বেগ।

ধরা যাক, একটা বস্তু আঁকাবাঁকা পথে চলছে। প্রথম ‘ক’ বিন্দু থেকে বস্তুটি ২০ মিটার উত্তর দিকে গিয়ে পৌঁছুলো ‘খ’ বিন্দুতে। সেখান থেকে বস্তুটি পূর্বদিকে গেল ২০ মিটার গিয়ে ‘গ’ বিন্দুতে গিয়ে যাত্রা শেষ করল। বস্তুটি মোট ৪০ মিটার দূরত্ব পাড়ি দিল, সময় লাগল ৪ সেকেন্ড। তাহলে বস্তুটির দ্রুতি v = ৪০/৪ = ১০ মিটার/সেকেন্ড।

অন্যদিকে বস্তুর সরণ কিন্তু ৪০ মিটার নয়। ‘ক’ থেকে ‘গ’ পর্যন্ত একটা সরলরেখা টানুন। তাহলে ‘কগ’ রেখার দৈর্ঘ্যই হলো বস্তুটির সরণ। ধরা যাক, কগ = ২৮.২৮ মিটার। তাই বস্তুটির বেগ (ṽ) = সরণ/সময় = ২৮.২৮/৪ = ৭.০৭ মিটার/সেকেন্ড।

সুতরাং, বেগ ও দ্রুতি সরলরৈখিক গতির ক্ষেত্রে এক হলেও, আঁকাবাঁকা বা কৌণিক গতির ক্ষেত্রে এক নয়। বেগ ভেক্টর রাশি, তাই এর সঙ্গে দিকও জড়িত থাকে।

মোদ্দাকথা হলো, নির্দিষ্ট সময়ে বস্তুর দূরত্ব পরিবর্তনের হারকে বলে দ্রুতি। আর নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দিকে কোনো বস্তুর সরণ পরিবর্তনের হারকে বলে বেগ। তবে নবম-দশম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞানে ভেক্টর গণিতের ব্যবহার নেই বললেই চলে। তাই এখানে বেগ বলতে দ্রুতিকেই বোঝানো হয়। তবু এই ব্যাপারে সাবধান থাকা ভালো।

লেখক: সাংবাদিকপদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ১পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ২পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ৩পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ৪পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ৫পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ৬পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ৭পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ৮পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ৯পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ১০পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ১১পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ১২পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ১৩পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ ১৪পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ ১৫পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ ১৬পদার্থবিদ্যার সহজপাঠ ১৭পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ১৮পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ১৯পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ২০পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ ২১

Read full story at source