বৃষ্টির ঠিকানা

· Prothom Alo

১.
শহরের নাম রাখা যাক নীলাচল। আসলে শহরটার নাম অন্য কিছু, কিন্তু এই গল্পে ওকে নীলাচলই বলি। কারণ, যেখানে মেঘ নেমে আসে মাটির কাছাকাছি, সেখানকার নাম নীল না হয়ে পারে না।
অর্ণব থাকত শহরের পুরোনো অংশে, এক চিলেকোঠার ঘরে। ঘরটার একটা মাত্র জানালা ছিল, আর সেই জানালা দিয়ে দেখা যেত পাশের বাড়ির ছাদ। সেই ছাদে প্রতি বিকেলে এসে দাঁড়াত একটা মেয়ে, হাতে বই, চোখে অন্যমনস্কতা। মেয়েটার নাম অর্ণব জানত না অনেক দিন পর্যন্ত। শুধু জানত, বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ওই ছাদে আলো একটু অন্য রকম পড়ে, আর সেই আলোয় মেয়েটাকে দেখতে ভালো লাগে।
মানুষ প্রেমে পড়ে অনেকভাবে। কেউ পড়ে চোখে চোখ রেখে, কেউ পড়ে কথায় কথায়। অর্ণব প্রেমে পড়েছিল দূরত্বে। রোজ বিকেলে একটা জানালা আর একটা ছাদের মাঝখানে যে ফাঁকা জায়গাটুকু থাকত, সেই জায়গাটাই একদিন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে উঠল।

২.
মেয়েটার নাম মেঘা। এটা অর্ণব জানতে পারল বাড়িওয়ালার মুখে, নেহাত কাকতালীয়ভাবে। নামটা শুনে অর্ণব হেসেছিল একা একা; কারণ, যে মেয়েকে সে রোজ আকাশের মতো দূর থেকে দেখে, তার নামও আকাশেরই সমার্থক।
তারপর একদিন হঠাৎ বৃষ্টি নামল। এমন বৃষ্টি, যা কোনো পূর্বাভাস মানে না। মেঘা তখন ছাদে, বই হাতে, বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে অথচ নড়ছে না। অর্ণব প্রথমবার তার জানালা থেকে চিৎকার করে বলল, ‘ভেতরে যান, ভিজে যাচ্ছেন তো!’
মেঘা চমকে তাকাল। তারপর হাসল। বলল, ‘ভিজতে ভালো লাগছে।’
এই ছোট্ট কথোপকথনটাই ছিল তাদের প্রথম সেতু। এর পর থেকে জানালা আর ছাদের মধ্যে শুধু চোখাচোখি নয়, কথাও হতে লাগল। কখনো আবহাওয়া নিয়ে, কখনো বইয়ের নাম নিয়ে, কখনো নিছক নীরবতা নিয়ে।

Visit moryak.biz for more information.

৩.
প্রেম যখন দূরত্ব দিয়ে শুরু হয়, তখন তার একটা নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়। অর্ণব আর মেঘার মধ্যেও তেমন একটা ভাষা তৈরি হলো। জানালার পর্দা সরানো মানে ‘আজ কথা বলব’, বইয়ের পাতা উল্টানো মানে ‘আজ মন ভালো নেই’, আর ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকানো মানে ‘তোমাকে মনে পড়ছে’।
একদিন মেঘা বলল, ‘তুমি কখনো নিচে নেমে সামনাসামনি কথা বলবে না?’
অর্ণব চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘ভয় হয়। জানালার এপার থেকে যা বলা যায়, সামনাসামনি তা বলা যায় না।’
মেঘা হাসল, ‘তাহলে জানালার ভাষাতেই থাকি আমরা।’
কিন্তু মানুষের মন তো স্থির থাকে না। দূরত্ব একসময় আর যথেষ্ট মনে হয় না। কাছে আসার তাগিদ জন্মায়, নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

৪.
শরৎকালের এক সন্ধ্যায় অর্ণব সাহস করে নিচে নামল। ছাদে গিয়ে দেখল মেঘা দাঁড়িয়ে, আকাশে তখন অসংখ্য তারা। প্রথমবার তারা মুখোমুখি দাঁড়াল, জানালা-ছাদের দূরত্ব ছাড়া।
মেঘা বলল, ‘তোমাকে আরও লম্বা লাগছে কাছ থেকে।’
অর্ণব বলল, ‘আর তোমাকে আরও... সত্যি।’
তারা দুজনেই বুঝল, এত দিন যে অনুভূতিটা জানালার ফাঁক দিয়ে বিনিময় হতো, সেটা এখন হাতের নাগালে চলে এসেছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, দূরত্বের সেই মায়াটাও কোথাও একটা মিস হতে লাগল। কাছে আসা মানেই কি ভালোবাসা সম্পূর্ণ হওয়া, নাকি কিছু ভালোবাসা দূরত্বেই সুন্দর থাকে—এই প্রশ্ন দুজনের মনেই উঁকি দিল।

৫.
সময় গড়াল। অর্ণব আর মেঘার সম্পর্ক এগোলো, কিন্তু জীবন সব সময় গল্পের মতো সরল পথে চলে না। মেঘার বাবার চাকরির বদলি হলো অন্য শহরে। যাওয়ার আগের রাতে মেঘা এসে দাঁড়াল সেই ছাদে, শেষবারের মতো।
অর্ণব জানালা থেকে দেখল তাকে, ঠিক প্রথম দিনের মতো। কিন্তু আজ চোখে জল।
মেঘা বলল, ‘মনে আছে, আমরা বলেছিলাম জানালার ভাষাতেই থাকব?’
অর্ণব মাথা নাড়ল।
মেঘা বলল, ‘তাহলে এখন থেকে দূরত্বটাই হোক আমাদের নতুন জানালা। আমি তোমাকে চিঠি লিখব। তুমি পড়বে, বুঝবে, উত্তর দেবে। ঠিক যেমন আগে বুঝতে, না বলেও।’

৬.
মেঘা চলে গেল, কিন্তু সম্পর্কটা থেমে গেল না। প্রতি মাসে একটা করে চিঠি আসত, হাতে লেখা, কালিতে একটু একটু লেপটে যাওয়া অক্ষরে। অর্ণবও লিখত, তার চিলেকোঠার জানালা থেকে দেখা আকাশের রং, বৃষ্টির শব্দ, আর প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্তের কথা।
বছর ঘুরে গেল। তারপর আরেক বছর। দূরত্ব কমেনি, কিন্তু ভালোবাসা কমেনি তার চেয়েও বেশি কিছু।
একদিন একটা চিঠিতে মেঘা লিখল, ‘আমি ফিরছি। সেই ছাদটা কি এখনো আছে?’
অর্ণব উত্তর দিল না চিঠিতে। বরং সেই বিকেলেই, ঠিক সাড়ে পাঁচটায়, জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিল, যেভাবে সে সরাত, যখন বলতে চাইত ‘আজ কথা বলব’।

৭.
গল্পটা এখানে থেমে যেতে পারত। কিন্তু ভালোবাসা কখনো সম্পূর্ণ থামে না, শুধু রূপ পাল্টায়। অর্ণব আর মেঘা আজও জানে না, ভালোবাসা আসলে দূরত্বে সুন্দর নাকি কাছে থাকায়—তারা শুধু এইটুকু জানে, যে সম্পর্ক একটা জানালা আর একটা ছাদ দিয়ে শুরু হয়েছিল, তা কোনো দূরত্বেই ভাঙেনি।
কারণ, কিছু কিছু ভালোবাসার ঠিকানা লেখা থাকে না কোনো রাস্তায়, কোনো শহরে—তা লেখা থাকে দুটো মানুষের অপেক্ষায়, প্রতীক্ষায়, আর বিশ্বাসে।
আর বৃষ্টি যখন নামে, আজও কোথাও না কোথাও কেউ একজন জানালার পর্দা সরিয়ে দেয়—নিঃশব্দে বলে দেয়, ‘আজ তোমাকে মনে পড়ছে।’
লেখা: মো. তন্ময় হাসান সিয়াম, ভ্রমণ লেখক ও ট্যুর গাইড

Read full story at source