যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে কী প্রভাব পড়বে
· Prothom Alo

জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর না করার অভিযোগে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে প্রতিযোগী ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, পাকিস্তানসহ ৬০ দেশের ওপর ১০ ও সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক বসেছে।
Visit playerbros.org for more information.
এই দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নিয়মিত শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে নতুন এই শুল্ক আদায় করবে যুক্তরাষ্ট্র কাস্টমস, যেমন বাংলাদেশের পণ্যে গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ। তার সঙ্গে নতুন শুল্ক যুক্ত হয়ে মোট শুল্ক দাঁড়াবে ২৫ শতাংশ। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও এভাবেই শুল্কের হিসাব হবে। সাধারণত যে প্রতিষ্ঠান পণ্য আমদানি করে, তাকেই শুল্ক দিতে হয়। তবে কোনো দেশের পণ্যে বেশি শুল্ক থাকলে, সেখান থেকে পণ্য কিনতে নিরুৎসাহিত হয় প্রতিষ্ঠান।
নতুন এই শুল্কে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যে কতটা প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে একাধিক রপ্তানিকারক বলেছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন আদালতে পাল্টা শুল্ক স্থগিত হওয়ার পর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়। সেটি শেষ হতে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক বসছে। ফলে মোট শুল্কহারে কোনো পরিবর্তন আসছে না। তবে দুশ্চিন্তা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন আরেকটি বিষয়ে তদন্ত করছে। সেখানে কোনো শুল্ক আরোপ হয় কি না, সেটির জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে।
নতুন এই শুল্ক আরোপ করে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর)। গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রেজিস্ট্রারের এক নোটিশে নতুন এই শুল্ক ঘোষণা করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পথে থাকা পণ্য ২৮ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট পর্যন্ত এই শুল্কহার থেকে অব্যাহতি পাবে।
১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১–এর আওতায় নতুন এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে। তবে তেল, গ্যাস, সার ও কিছু খাদ্যপণ্যসহ কয়েকটি পণ্য এ শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, ‘প্রায় এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্রে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং আমরা তা কঠোরভাবে কার্যকর করছি। আমাদের বাণিজ্য অংশীদারদের একই পদক্ষেপ নেওয়ার সময় আরও অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘আজকের পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বাণিজ্য বিকৃতিকারী এই চর্চা সংশোধনের সূচনা করবে এবং বিশ্বের সর্বত্র শ্রমিকদের কল্যাণে সহায়তা করবে।’
পাল্টা শুল্কের প্রভাব কী
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের জন্য এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য পিছিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। গত বছরের ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ৩৭ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আরও দর–কষাকষির পর ২ আগস্ট এই হার কমে হয় ২০ শতাংশ। গত বছরের ৭ আগস্ট থেকে এই পাল্টা শুল্কহার কার্যকর হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ। পাল্টা শুল্ক এই শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে আরোপ হয়।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি করে। সে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর দেশটির পাল্টা শুল্কের হার ১৯ শতাংশ। দুই সপ্তাহ পার না হতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেন। সেই রায়ের কয়েক ঘণ্টার মাথায় সব দেশের পণ্যের ওপর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। নতুন শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। আইন অনুযায়ী ১৫০ দিনের জন্য শুল্ক আরোপ করতে পারেন প্রেসিডেন্ট। সেই শুল্ক শেষ হওয়ার সময় থেকেই নতুন আরোপিত এই শুল্কহার কার্যকর হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির একক বড় বাজার। সদ্য বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এই বাজারে ৯০৪ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা কি না তার আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি। ওই অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৮৬৯ কোটি ডলারের পণ্য। তার মানে, পাল্টা শুল্ক আরোপ হওয়ার পরও বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে।
প্রতিযোগীদের কার কত শুল্ক
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ৮৫ শতাংশ তৈরি পোশাক। এই বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ হচ্ছে ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হন্ডুরাস।
ইউএসটিআরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৭টি দেশের পণ্য আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে মোট শুল্ক ১০ অথবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হবে। তার বাইরে চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ব্রাজিল, মিসরসহ ৩৮টি দেশের পণ্যে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মূল প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপর বাড়তি শুল্কহার একই থাকছে, সেহেতু রপ্তানিতে নতুন করে প্রভাব পড়ার কোনো কারণ দেখছি না। তবে গত বছর পাল্টা শুল্ক কার্যকরের পর বাজারটিতে চাহিদা কিছুটা কমে যায়। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, শুল্কের এই খড়্গ উঠে গেলে পণ্যের চাহিদা বাড়বে। তবে সেটি শিগগিরই হচ্ছে না’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর না করার অভিযোগে এই শুল্ক আরোপ অন্যায় ও অযৌক্তিক। ইউএসটিআরের তদন্ত শুরুর পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত শুনানিতে কী হয়েছে, সেটি আমাদের জানানো হয়নি।’
শুল্কের চাপ আরও বাড়বে
ইউএসটিআর গত ১২ মার্চ পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশ যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে দেশগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তার আগে উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলত তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট খাতের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটি তদন্ত হচ্ছে। ইতিমধ্যে শুনানিও শেষ। শিগগিরই এই তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে ইউএসটিআর।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শেষ বিচারে প্রতিযোগীদের তুলনায় আমাদের শুল্ক যদি বেশি হয়, তাহলে আমরা মুশকিলে পড়ব, না হলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো পাল্টা শুল্ক স্থগিত হলেও তার সমপরিমাণ শুল্ক হিসাব করেই তৈরি পোশাকের দর–কষাকষি করছে। কারণ, তাদের ধারণা ছিল, অন্য কোনো উপায়ে সেই পরিমাণ শুল্ক আরোপ হতে পারে।’