আ রেইনি ডে

· Prothom Alo

বছরের শুরু থেকে ঝামেলা লেগেই আছে। বাড়ি, অফিস, ক্লাব—কোথাও শান্তি নেই। বাকি ছিল প্রেম? সেখানেও ঘটেছে ছন্দপতন। বলিহারি মেয়ে নয়না, কোনো কিছু না বলেই সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।

সহকর্মী সুধীরবাবুর শালা জ্যোতিষী। অফিসের অনেকেই তাঁর পরামর্শ নিয়েছেন। সুফলও পেয়েছেন। ‘আপনি একবার আলাপ করে দেখেন। ভালো লাগলে পরামর্শ শুনবেন, না হলে শুনবেন না।’ সুধীরবাবু কয়েকবার বলেছেন রাজীবকে। প্রথম দিকে রাজীব পাত্তা দেয়নি। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যা হয়, তা–ই ঘটেছে।

Visit fish-roadgame.com for more information.

যদিও কর্তব্য ছিল সুধীরবাবুকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া। না হলেও ভদ্রলোককে বিষয়টা জানানো। কিন্তু অফিসে জানাজানি হলে চোখ–টানাটানির মধ্যে পড়তে হবে। তাই অসুস্থতার অজুহাতে ছুটি নিয়ে রাজীব জ্যোতিষীর সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

সজনীকান্ত সেন। গোল্ড মেডেলিস্ট, জাপান।

রাজীব বসে আছে ভদ্রলোকের চেম্বারে। হাতে একটা কবিতার বই—রূপসী বাংলা, জীবনানন্দ দাশ। সজনীবাবু রুমে ঢুকে রাজীবের হাতে বইটি দেখেই আওড়াতে শুরু করলেন। ‘মানুষের ব্যথা আমি পেয়ে গেছি পৃথিবীর পথে এসে’ ঠিক বললাম তো, মিস্টার?

আমি রাজীব, রাজীব ব্যানার্জি।

হ্যাঁ, রাজীব। বসেন প্লিজ। জীবনানন্দ দাশ ফেবারিট?

বলতে পারেন। একজীবনে কতটা মেধা নিয়ে জন্মালে এত ভালো ভালো কবিতা লেখা যায়, ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।

‘কী জানেন রাজীব, মেধা তো তাঁর ছিলই। কিন্তু জীবনানন্দের জীবনী পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে একটা উপলব্ধির কথা যদি বলি, বলব, মৃত্যুকালে কেউ কারও শত্রু থাকে না। শনিবারের চিঠির সজনীকান্ত দাশের কথাই ধরেন। ভদ্রলোক জীবনানন্দকে কত গালমন্দ, সমালোচনা করেছেন। কিন্তু কবির মৃত্যুর পর সেই তিনিই সব সমালোচনা তুলে নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। বলি কি, শত্রুতা করা, কারও হক কেড়ে নেওয়া, স্বপ্ন ধ্বংস করে দেওয়া কি মানুষের কাজ! দীর্ঘশ্বাস বড় ক্ষতি করে। কে কদিন বাঁচব তা তো জানি না। তা ছাড়া আমরা ভুলে যাই, শান্তি আগে নিজের মনে আনতে হয়। মনে শান্তি থাকলেই চারপাশে শান্তি আসে।’

রাজীব বিস্মিত, হতভম্ব। সেদিনের ঘটনা কারও জানার কথা নয়। সজনীবাবু কি তাঁকে ইঙ্গিত করে বললেন, না স্রেফ কথার কথা? জিজ্ঞেস করবে ভেবেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহসে কুলায়নি। ঘটনাটা জানাজানি হলে সমাজে মুখ দেখানোর জো থাকবে না।

কী ঘটেছিল?

রিণী এসেছে পড়তে। বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছেতাই অবস্থা। রিণী রাজীবদের বাড়ির দারোয়ান নগেনের মেয়ে। ভালো নাম পুনর্ভবা বসু। দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। বিজ্ঞান বিভাগে। এখন পড়ালেখাও বড় ধরনের ইনভেস্টমেন্টের ব্যাপার। টাকাপয়সা না থাকলে পড়ালেখা করা সহজ কাজ নয়।

রিণী এসএসসিতে যখন জিপিএ–৫ পেল, রাজীব নিজেই বলেছিল গ্রুপ সাবজেক্টগুলো দেখিয়ে দেবে। এর পর থেকে সপ্তাহে দুই দিন সন্ধ্যায় রাজীবের কাছে রিণী পড়তে আসে।

চোখেমুখে লেগে থাকা জলে পূর্ণিমার চাঁদের মতো সুন্দর দেখাচ্ছে রিণীকে। চুল ভিজে, বুকের দিকটাও ভিজে গেছে। রাজীব একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। রিণী ব্যাপারটা খেয়াল করে। উচিত ছিল ওড়না টেনে বুকের ওপর দেওয়া। কিন্তু রিণীর ইচ্ছা করে না। রাজীবের কাছে এক বছরের বেশি সময় ধরে পড়তে আসছে। রাজীব অন্য পুরুষদের মতো না। আর আলাদা বলেই মনে মনে রিণী রাজীবকে পছন্দ করে। কিন্তু তাদের মধ্যে ব্যবধানের যে দেয়াল, তা ডিঙিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বাবা সামান্য গেটম্যান আর রাজীব বনেদি বাড়ির একমাত্র ছেলে। কিন্তু হঠাৎ রিণীর কী যেন একটা হয়ে যায়। পেছন থেকে গিয়ে রাজীবকে জড়িয়ে ধরে। রাজীব আগে কোনো দিন কোনো তরুণীর স্পর্শ পায়নি। নয়নার সঙ্গে সম্পর্কে থাকাকালীন সেই অর্থে কখনো হাতটাও ধরেনি। রাজীবের শরীরে শিহরণ বয়ে যায়। রিণী আরও জোরে জাপটে ধরে। কপালে চুমু খায়। রিণীর ঠোঁট দুটো রাজীবের ঠোঁটের কাছে আসতেই ধাক্কা দিয়ে রিণীকে সরিয়ে দেয় রাজীব। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে যায় রিণীর। রাজীব চিৎকার করে বলে, ‘বেরিয়ে যা। আর কখনো আসবি না।’ কিছু বলে না, চোখের জল মুছতে মুছতে রিণী বের হয়ে যায়।

রক্তের বাঁধনে বাঁধা ছিল না

রাজীবের বাবা বেঁচে নেই। মাকে নিয়ে ঢাকার বাড়িতে থাকে। ‘রিণী যদি ঘটনাটা মাখিয়ে ভিন্নভাবে প্রচার করে। তখন আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না।’ ভয় থেকে পরের দিন সকালে নগেনকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেয়। নগেন বারবার বলেছিল, ‘ছোট বাবু, মেয়েটার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে। আমাকে একটু দয়া করেন। দরকার হলে বেতন কিছু কম করে দেন।’ কিন্তু এই শহরে রাজীবের মতো মানুষের কাছে একজন দারোয়ানের চাকরি খাওয়া কঠিন কিছু নয়।

সজনীবাবুর সঙ্গে রাজীব আর কথা এগোয় না। ‘পরে আসব’ বলে চেম্বার থেকে বের হয়ে উবার নিয়ে রিণীর কলেজের সামনে এসে দাঁড়ায়। রিণী চাইলে তার নামে বদনাম লটিয়ে সুবিধা নিতে পারত। কিন্তু রিণী সেটা করেনি। রিণীর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে, কিন্তু ঠিক হবে না মনে হতেই মুঠোফোন থেকে নগেনকে কল করে।

‘বড় অভাবের মধ্যে আছি, ছোট বাবু। রিণীর কোচিংয়ের ফি তিন মাস দিতে পারিনি। মেয়েটার বড় স্বপ্ন ছিল, একটু দয়া করেন আমারে।’

রাজীবের চোখ ভিজে ওঠে। ধরা গলায় রাজীব বলে, ‘কাল থেকে কাজে এসো। মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে রিণীর কোচিংয়ের ফি দিয়ে দিয়ো।’

কথা শেষ হতেই, রাজীবের বুকের ভেতর প্রশান্তির বৃষ্টি নামে। ভীষণ সুখ বোধ হয়। পরক্ষণেই রিণীর মুখটা ভেসে ওঠে চোখে। অবচেতন মন কি রিণীকে প্রশ্রয় দিতে চাইছে, রাজীব ভাবতে শুরু করে।

Read full story at source