শ্রাবণধারায় ফিরলেন পুষ্প বৃক্ষ বিহঙ্গপ্রেমী
· Prothom Alo

‘আমি গেলে তো আর ফিরব না
এই পৃথিবী রইবে নতুন
রইবে ঘুঘুর হু হু কূজন
ফুল ঝরানো শিউলিতলা
আঁকা-বাঁকা নদীর চলা
থাকবে শিশু যুবক বুড়ো
বেবাক কিছু থাকবে পড়ে
আমি শুধু থাকব না’
— কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা
Visit forestarrow.rest for more information.
সকাল থেকে, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি মনে হয় আকাশ যেন ফুটো হয়ে গেছে। ভেজা কংক্রিটের শহরে প্রতিদিনের মতো কর্মস্থলে ফেরা মানুষের মিছিল মাথায় রংবেরঙের বাহারি ছাতা যেন রংধনু হাঁটছে। রিকশার হুট তুলে দিলাম। রিকশা নামিয়ে দিল সচিবালয় মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে। রেলযাত্রা শুরু হলো, রেকর্ড করা ভয়েস জানিয়ে দিচ্ছে পরবর্তী স্টেশন মিরপুর ১০, ট্রেনটির গন্তব্যস্থল উত্তরা উত্তর। মিরপুর ১০–এ নেমে পড়লাম।
পাশেই টংদোকানে গিয়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। আকাশ কালো মেঘের বেলা একটু পরে জাঁকিয়ে নামবে বৃষ্টি। তাড়াতাড়ি রিকশা ভাড়া করলাম। রিকশাওয়ালা বলল, ‘মামা, ১০ টাকা বাড়িয়ে দেবেন।’ গন্তব্য মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান। আগের দিন মুঠোফোনে লেখক আহমদ ছফার শিষ্য খুদে বার্তায় জানায়, ‘রশীদ এনাম, আগামীকাল আহমদ ছফার নতুন কবর দেওয়া হবে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। সকাল ১১টা নাগাদ। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কাজটা হচ্ছে। আপনিও আসবেন।’
আহমদ ছফাবার্তাটা পেয়ে অভিভূত হলাম। প্রিয় লেখক আহমদ ছফাকে কবর থেকে তোলা হবে ২৫ বছর পর। নিজভূমের লেখক–বুদ্ধিজীবী, তাও চট্টগ্রামের প্রথম কোনো বুদ্ধিজীবীর কবর স্থানান্তর হবে। একটা নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলেছে বাংলাদেশ, এই প্রথম কোনো লেখকের কবর নতুন করে সমাহিত হবে।
ঘড়ির কাঁটা তখন ১২টা ছুঁই ছুঁই। শ্রাবণধারা অঝোরে নেমেছে। নতুন কবরের খননকাজ শেষের দিকে, কবরের ওপরে প্লাস্টিকের ত্রিপল টাঙানো হয়েছে। কিছু দূর হেঁটে পুরোনো কবরপাড়ের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। ইতিমধ্যে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান এসে হাজির। আমার ছাতা ছিল না। স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘এনাম, ছাতার ভেতরে এসো, ভিজে যাচ্ছ তুমি।’ আমি বললাম, ‘স্যার, এটা আনন্দের। ছফা স্যার তো প্রকৃতিপ্রেমী ছিলেন, প্রকৃতিও আজ ভিজিয়ে দিচ্ছে সমাধি।’ স্যার বললেন, ‘মহান সৃষ্টিকর্তা যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করেন, আর যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নেন, এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা অপমান করেন। নিঃসন্দেহে লেখক আহমদ ছফার জন্য এটা সম্মানের দিন।’
পুরোনো কবরের পাড়ে দু–একজন কোদালের কোপ মেরে চলেছেন। প্রায় সাড়ে তিন হাত গভীর করে খোঁড়ার পর একজন চিৎকার করে উঠলেন, ‘স্যার, হাড় পাওয়া গেছে।’
খুব সাবধানে কোদাল–খন্তির মাধ্যমে হাড়গুলো কফিনে তোলা হলো। কনুইয়ের কঙ্কাল, পিঠের পাঁজরের ভাঙা কিছু হাড়সহ দেহাবশেষ। বৃষ্টির ছোঁয়া এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে প্রিয় লেখকের দেহাবশেষ। বুক ভেঙে যাচ্ছিল। একদিকে আকাশের কান্না, অন্যদিকে দুনয়ন জলে ভাসিয়ে দিলাম।
একসময় কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা শ্রাবণধারায় কফিনে চড়ে ফিরতে লাগলেন নতুন ঠিকানায়। আমরা হাঁটছি কফিনের পিছু পিছু। কফিন পৌঁছাল বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। কবরের চতুর্দিকে বকুল, শিউলি, নানা জাতের ফুলের গাছ। গাছে কিছু বিহঙ্গ বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু হয়ে ডাকছে। বিহঙ্গরা বুঝতে পেরেছে তাদের প্রিয় লেখক অনন্ত স্মৃতির ঠিকানায় সাড়ে তিন হাত মাটির কুঁড়েঘরে ফিরছেন। এ জন্যই বোধ হয় আগে বুঝতে পেরে লিখে গিয়েছিলেন—
‘আমার কথা কইবে পাখি
করুণ করুণ ভাষে
আমার দুঃখ রইবে লেখা
শিশির ভেজা ঘাসে।
তারার সাথে রাত জেগেছি
ফুলের সাথে হৃদয় বিনিময়
বলবে সবাই কেমন ছিল
মধুর পরিচয়।
আমার নাম বলবে মুখে
মেঘের আসা যাওয়া
ইন্দ্রধনু লিখবে লিখন
কেমন ভালবাসে
দিঘল নদী করবে রোদন
আকুল উচ্ছ্বাসে।’
কত আবেগ দিয়ে লিখে গেছেন। আহা, আজ অনেক পাঠক ভক্ত বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্রিয় লেখককে নতুন করে সম্মান জানাতে জড়ো হয়েছেন কবরস্থানে। লেখক আহমদ ছফার কফিন যখন অনন্ত স্মৃতির ঠিকানায় নামানো হচ্ছিল, তখন ঝোড়ো হাওয়া শুরু হলো। কবরে শুইয়ে দেওয়ার পর আমরা হাতের মুঠোয় মাটি নিয়ে ‘বিসমিল্লাহি ওয়ালা মিল্লাতে রাসুলুল্লাহ’ বলে দোয়া করলাম। কেউ একগুচ্ছ রজনীগন্ধা ফুল গুঁজে দিল সমাধিতে। অনেক ভক্তকে কাঁদতে দেখলাম। মতিউর রহমান নামের এক ভক্ত এনেছে দূর্বাঘাস। কবরে যাতে কোনো পোষা প্রাণী উঠতে না পারে সে জন্য কবরের ওপর পরম মমতায় দূর্বাঘাস লাগিয়ে বাঁশের বেড়া দিয়ে চারদিকে ঘেরাও করে দেওয়া হলো। ওই মুহূর্তে মনে হয়েছে দেশের এবং সমাজের সবচেয়ে উঁচু কাতারের মানুষ হচ্ছেন একজন ভালো লেখক। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় সম্মান এর চেয়ে আর কী হতে পারে আমার জানা নেই। আমিও একমুঠো মাটি প্রিয় লেখকের সমাধিতে দিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হলাম। আহমদ ছফার নতুন সমাধিটি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের সমাধির পাশে।
লেখক আহমদ ছফার নতুন কবর, মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান২০০১ সালের ২৮ জুলাই, বাংলাদেশের সক্রেটিসখ্যাত কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা মারা যাওয়ার পর তাঁকে কবর দেওয়ার জন্য কোথাও জায়গা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সে সময় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাঁকে তখন মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে লেখকের শেষের ঠিকানা হয়েছিল তুরাগ নদের তীরে মিরপুর সাধারণ কবরস্থানে, তাও নানা অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কবর দেওয়ার জন্য ঘুষও দিতে হয়েছিল ৩০ হাজার টাকা।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে, আহমদ ছফার ভ্রাতুষ্পুত্র লেখক নুরূল আনোয়ার সিটি করপোরেশনে আবেদন করলে গত ১৩ এপ্রিল ডিএনসিসির ১৪তম সভায় আহমদ ছফার কবর মিরপুর কবরস্থান থেকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। বহু প্রতীক্ষার পর ২২ জুলাই লেখকের দেহাবশেষ শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ঠাঁই হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর পর যেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হলো। এটা সত্যি আনন্দের। চলতি বছর উত্তরায় আহমদ ছফার নামে সরণিও স্থাপন করা হয়েছে।
এই অসম্ভব কাজটি সম্ভব হওয়ার পেছনে যাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল, তাঁর নাম উল্লেখ না করলে দায় থেকে যায়। তিনি হলেন আহমদ ছফার শিষ্য লেখক ও গণবুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, প্রিয় লেখক আহমদ ছফার নামে জার্মানির জাতীয় কবি গ্যেটের ভেৎসলার শহরে একটি পানশালার নামকরণ করা হয়েছে। অথচ ওনার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া গ্রামে তাঁর কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আহমদ ছফা স্মৃতিবিজড়িত গাছবাড়িয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাগার স্থাপন, সড়কের নামকরণসহ চট্টগ্রামে আহমদ ছফা একাডেমি স্থাপনের জন্য চন্দনাইশ ও চট্টগ্রামের সব জনপ্রতিনিধিদের কাছে নিবেদন করছি।
লেখক ও গবেষক