প্রজ্ঞাবতী নারী উম্মে সালামা: নবীজি যাঁর পরামর্শ নিতেন
· Prothom Alo

তাঁর নাম মূলত হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া। তিনি বেশ উচ্চ বংশীয়, প্রখর রূপবতী, চরম বুদ্ধিমতী এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এক নারী ছিলেন। পিতা আবু উমাইয়া ছিলেন তৎকালীন আরবে দানবীর বলে প্রসিদ্ধ। তাঁকে সবাই ডাকত ‘কাফেলার অন্নদাতা’ (যাদুর রাকিব)।
Visit turconews.click for more information.
তিনি যখন কোনো সফরে যেতেন, তাঁর সঙ্গী কাফেলার কাউকে নিজের খাবার বহন করতে দিতেন না; পুরো যাত্রাপথের সবার খাবারের ব্যবস্থা তিনি একাই করতেন। এমন এক মহৎ পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন উম্মে সালামা (রা.)।
অনেকেই মনে করেন শুধু দুর্বল ও অসহায় মুসলমানরাই হাবশায় হিজরত করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের সত্য হলো, উম্মে সালামা ও তাঁর স্বামীর মতো মক্কার অনেক প্রভাবশালী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্যও এই হিজরতে শামিল হন।
সত্যের খোঁজে ইসলাম গ্রহণ
নবুয়তের শুরুর দিকে, যখন নবীজি গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন, তখনই উম্মে সালামা এবং তাঁর স্বামী আবদুল্লাহ ইবনে আবদিল আসাদ (যাঁকে সবাই আবু সালামা নামে চিনতেন) ইসলাম গ্রহণ করেন। মূর্তিপূজার মতো যুক্তিহীন প্রথা ছেড়ে তাঁরা এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন।
আবু সালামা (রা.) ছিলেন নবীজির ফুফাতো ভাই। নবীজির আপন ফুফু আরওয়া বিনতে আবদিল মুত্তালিবের সন্তান।
মক্কায় কাফেরদের অত্যাচার বাড়ছিল। নবীজি (সা.) তাঁর সঙ্গীদের হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার পরামর্শ দেন। অনেকেই মনে করেন শুধু দুর্বল ও অসহায় মুসলমানরাই হাবশায় হিজরত করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের সত্য হলো, উম্মে সালামা ও তাঁর স্বামীর মতো মক্কার অনেক প্রভাবশালী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্যও এই হিজরতে শামিল হন।
তাঁরা নিজেদের জীবন বাঁচাতে যাননি, বরং মক্কার উত্তপ্ত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করতে এবং আরব উপদ্বীপের বাইরে বিশ্বময় ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে হাবশায় গিয়েছিলেন। সেখানে কয়েক বছর অবস্থানকালে তাঁদের প্রথম সন্তান ‘সালামা’ জন্মগ্রহণ করেন। পরে তাঁরা প্রিয় নবীজিকে ধর্মের কাজে সহযোগিতা করতে আবার মক্কায় ফিরে আসেন।
উম্মুল মুমিনীন সাওদা বিনতে যামআ (রা.)পরীক্ষা শেষে মদিনার পথে
মক্কায় ফিরে আসার পর কোরাইশদের নির্যাতন আরও উগ্র হয়ে ওঠে। মুসলমানদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়, নানাভাবে কষ্ট দেওয়া হয়। কিন্তু ইসলামের অনুসারীরা সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। এর কিছুদিন পর মদিনা থেকে আসা নতুন বিশ্বাসীরা যখন নবীজিকে মদিনায় আমন্ত্রণ জানান, তখন মুসলমানরা একে একে মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করতে শুরু করেন।
উম্মে সালামা (রা.) এবং তাঁর স্বামীও মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। কিন্তু হিজরতের কিছুদিনের মধ্যেই ঘটে এক বেদনাদায়ক ঘটনা। ওহুদের যুদ্ধের পর এক আঘাতের কারণে আবু সালামা (রা.) ইন্তেকাল করেন। চারটি ছোট ছোট সন্তান নিয়ে এক লহমায় নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে পড়েন উম্মে সালামা।
তাঁর মনে বারবার একটিই প্রশ্ন জাগত—‘আমার আবু সালামার চেয়ে উত্তম আর কে হতে পারে?’ কারণ আবু সালামা ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, সচ্চরিত্রবান এবং আদর্শ এক স্বামী।
শোকের মাঝে দোয়ার অলৌকিক ফল
তীব্র শোকের মাঝেও উম্মে সালামা হারিয়ে যাননি। তিনি স্মরণ করলেন তাঁর প্রিয় স্বামীর মুখে শোনা নবীজির একটি সুসংবাদ। হাদিসে এসেছে, কোনো বান্দা যখন বিপদে পড়ে এবং বলে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহুম্মাজুরনি ফি মুসিবাতি ওয়া আখলিফ লি খাইরাম মিনহা’ (আমরা সবাই আল্লাহর এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ, আমার এই বিপদে আমাকে প্রতিদান দাও এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করো), তখন আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান ও বিকল্প দান করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১৮)
উম্মে সালামা (রা.) দোয়াটি বারবার পড়তে লাগলেন। তবে তাঁর মনে বারবার একটিই প্রশ্ন জাগত—‘আমার আবু সালামার চেয়ে উত্তম আর কে হতে পারে?’ কারণ আবু সালামা ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, সচ্চরিত্রবান এবং আদর্শ এক স্বামী। ইন্তেকালের আগে তিনি নিজেও দোয়া করে গিয়েছিলেন, যেন আল্লাহ উম্মে সালামাকে এমন এক স্বামী দেন, যিনি তাঁকে কখনো কোনো কষ্ট দেবেন না।
উম্মে দারদা: ইসলামের প্রথম যুগের নারী শিক্ষকমহিমান্বিত প্রস্তাব
ছোট ছোট সন্তান থাকা সত্ত্বেও তাঁর মতো গুণবতী নারীর বিয়ের প্রস্তাবে কোনো বাধা ছিল না। চার মাসের ইদ্দতকাল শেষ হওয়ার পর উম্মে সালামার কাছে বিয়ের বহু প্রস্তাব আসতে শুরু করে। আবু বকর এবং ওমরের মতো মহান সাহাবিরা প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু স্বামীর স্মৃতি হৃদয়ে ধারণ করে তিনি বিনয়ের সঙ্গে সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
কিছুদিন পরেই এল এমন এক প্রস্তাব, যা আর ফিরিয়ে দিতে পারলেন না। মহানবী (সা.) নিজে উম্মে সালামাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান!
মর্যাদার দিক থেকে এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে। উম্মে সালামা এই প্রস্তাবে আনন্দিত হলেও নিজের কিছু স্বভাবগত সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে ইতস্তত বোধ করলেন। নবীজির কাছে বার্তা পাঠালেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমার তিনটি সমস্যা রয়েছে—আমি স্বভাবগতভাবে কিছুটা আত্মভোলা ও আত্মমর্যাদা বোধসম্পন্ন (বা ঈর্ষাপরায়ণ), আমার বয়স কিছুটা বেশি এবং আমি একাধিক সন্তানের মা।’
নবীজি (সা.) উত্তর পাঠালেন, ‘তোমার ঈর্ষাপরায়ণতার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করব, যেন তিনি তা দূর করে দেন। বয়সের কথা বলছ? আমি তোমার চেয়ে বয়সে আরও বড়। আর তোমার সন্তানদের দায়িত্ব? তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দায়িত্বেই থাকবে।’
ইসলামের অনেক কঠিন মুহূর্তে, বিশেষ করে হোদাইবিয়ার সন্ধির সময়, উম্মে সালামার বুদ্ধিমত্তা ও পরামর্শ গোটা মুসলিম উম্মাহকে এক বড় সংকট থেকে রক্ষা করেছিল।
জীবনের নতুন এক পরম প্রাপ্তি
উম্মে সালামা (রা.) বুঝতে পারলেন, পরম করুণাময় আল্লাহ তাঁর ধৈর্যের প্রতিফল হিসেবে বহুগুণ উত্তম স্বামী দিয়ে তাঁর ঘর ভরিয়ে দিয়েছেন। শুভ বিবাহ সম্পন্ন হলো। তিনি ‘মুমিনদের মাতা’ হওয়ার পরম মর্যাদা লাভ করলেন।
পরবর্তী জীবনে ইসলামের অনেক কঠিন মুহূর্তে, বিশেষ করে হোদাইবিয়ার সন্ধির সময়, উম্মে সালামার বুদ্ধিমত্তা ও পরামর্শ গোটা মুসলিম উম্মাহকে এক বড় সংকট থেকে রক্ষা করেছিল।
উম্মে সালামার জীবন আমাদের শেখায়, জীবনে যতই কঠিন বিপদ বা স্বজন হারানোর বেদনা আসুক না কেন, আল্লাহর ওপর নিঃশর্ত ভরসা রাখলে এবং ধৈর্য ধারণ করলে তিনি মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া উত্তম প্রতিদান দান করেন।
নারীদের শিক্ষায় উম্মে সালামার অবদান