ট্রাম্পকে কেন আর বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না সাধারণ ইরানিরা

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক মাস ধরে প্রায় প্রতিদিনই ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ নিয়ে নানা ঘোষণা দিয়ে আসছেন। তিনি কখনো ব্যাপক বোমা হামলার হুমকি দিচ্ছেন, আবার কখনো নতুন করে আলোচনা শুরুর দাবি করছেন। ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ফায়েজেহ মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথায় গুরুত্ব দেওয়া বা এসব নিয়ে ভাবা অনেক আগেই বাদ দিয়েছেন।

Visit newssport.cv for more information.

২৭ বছর বয়সী এই নারী আল–জাজিরাকে বলেন, ‘তাঁর (ট্রাম্প) কথাবার্তা অবশ্যই আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে। কিন্তু আমি এই অনিশ্চয়তার বিষাক্ত পরিবেশ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি—যা আমি নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সেদিকে মনোযোগ দিয়ে এবং নিজেকে ও প্রিয়জনকে সুরক্ষিত রাখার মাধ্যমে।’

শুধু ফায়েজেহ একা নন, ইরানের বহু মানুষ এভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে আগ্রাসন শুরুর পর ইরান যুদ্ধ ছয় মাসে গড়িয়েছে। অনেক ইরানি এখন নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সারাক্ষণ সংবাদ শিরোনামের পেছনে ছোটা থেকে বিরত থাকার পথ বেছে নিচ্ছেন।

রোহাম, তেহরানের বাসিন্দাআগে যুক্তরাষ্ট্রে এমন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, যাঁরা কম কথা বলতেন, কিন্তু বেশি কাজ করতেন। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের প্রভাবে—যেগুলো ব্যবহারে ট্রাম্প বেশ দক্ষ—তিনি বেশি কথা বলেন, কিন্তু তিনি ততটা কাজ করেন না।

এ সপ্তাহে ট্রাম্প আবারও ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন। তবে এবার তাঁর এ হুমকি ইরানিদের মধ্যে গত ৭ এপ্রিলের মতো উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করতে পারেনি। ৭ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।’ কিন্তু তার কয়েক ঘণ্টা পর তিনি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন।

তেহরানের কেন্দ্রস্থলের যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ফায়েজেহ কাজ করেন, সেখানে তাঁর সহকর্মী রোহাম।

রোহাম বলেন, ‘আগে যুক্তরাষ্ট্রে এমন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, যাঁরা কম কথা বলতেন, কিন্তু বেশি কাজ করতেন। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের প্রভাবে—যেগুলো ব্যবহারে ট্রাম্প বেশ দক্ষ—তিনি বেশি কথা বলেন, কিন্তু তিনি ততটা কাজ করেন না।’

সামনের দিনগুলোয় ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও অনেক খারাপ হবে বলে মনে করেন ফায়েজেহ। তাঁর আশঙ্কা, ইরানের মুদ্রার মানও আরও পড়ে যাবে।

রোহাম মনে করেন, ট্রাম্প কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না, এটা দেশের (ইরানের) মূল সমস্যা নয়; বরং ইরানি কর্তৃপক্ষের উচিত দেশে মতপ্রকাশের আরও সুযোগ তৈরি করা এবং আরও বেশি মানুষের কথা শোনার সুযোগ তৈরি করা। যদিও বর্তমানে এমন কিছু ঘটার কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।

রোহাম আরও বলেন, ‘আমরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি। আর আমাদের জীবনে নিশ্চয়তার অভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।’

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যগুলোকে বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলার লক্ষ্যে একটি ‘চক্র’ বলে মনে করেন ফায়েজেহ, যার পুনরাবৃত্তি করছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি এত দ্রুত এত পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করেন, তাঁকে আমার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।’

একটি ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার বিলবোর্ডের পাশে টানানো ব্যানারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি। ইরানের রাজধানী তেহরানের আজাদি স্কয়ারে। ৩০ জুলাই ২০২৬

সামনের দিনগুলোয় ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও অনেক খারাপ হবে বলে মনে করেন ফায়েজেহ। তাঁর আশঙ্কা, ইরানের মুদ্রার মানও আরও পড়ে যাবে।

আলী, তেহরানের বাসিন্দাআমার ধারণা, অন্তত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কংগ্রেস (মধ্যবর্তী নির্বাচন) নির্বাচন পর্যন্ত ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর কোনো বড় ধরনের হামলা চালানো বা স্থল অভিযান শুরু করার মতো গুরুতর পদক্ষেপ নেবেন না। বরং তিনি এই খেলা চালিয়েই যাবেন এবং বারবার অবস্থান বদলাবেন।

গতকাল সোমবার তেহরানের খোলাবাজারে ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের বিনিময় হার ছিল প্রায় ১৯ লাখ ১০ হাজার রিয়াল, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত জুনে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর মাসের মাঝামাঝি ইরানি মুদ্রার মান কিছুটা শক্তিশালী হয়ে প্রতি ডলারে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার রিয়াল হয়েছিল।

এ সপ্তাহে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ডায়াগ্রাম পোস্ট করে দাবি করেন, তিনি ‘ইরানের মুদ্রাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন’।

ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুলাই শেষ হওয়া ক্যালেন্ডার মাসে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি।

তেহরানের একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের পণ্য ব্যবস্থাপক আলী বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রধান মনোযোগ থাকে পুঁজিবাজার ও তেলের দামের দিকে। তাই ট্রাম্পের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে তিনিও এখন এসব সূচকের দিকে নজর রাখেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তার ‘নীতিগত অবস্থান’ থেকে সরে আসবে না।

আলী বলেন, ‘আমার ধারণা, অন্তত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কংগ্রেস (মধ্যবর্তী নির্বাচন) নির্বাচন পর্যন্ত ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর কোনো বড় ধরনের হামলা চালানো বা স্থল অভিযান শুরু করার মতো গুরুতর পদক্ষেপ নেবেন না। বরং তিনি এই খেলা চালিয়েই যাবেন এবং বারবার অবস্থান বদলাবেন।’

যদি কোনো চুক্তি হয়, তবে ট্রাম্প এমন একটি চুক্তি চাইবেন, যেটিকে তিনি নিজের বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন—এমনটাই মনে করেন আলী। তাঁর বিশ্বাস, যা–ই হোক, আগামী কয়েক মাস ইরানের ওপর যুদ্ধের আশঙ্কা ভর করেই থাকবে।

পররাষ্ট্রনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু

ইরানের ওপর ‘বড় ধরনের হামলার’ হুমকির দুই দিনের মাথায় গত রোববার ট্রাম্প মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তায় তেহরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার কথা বলেছেন, যেখানে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তিনি গতকাল সোমবার ওই আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলেছিলেন।

যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, বরং ওমানের সঙ্গে হচ্ছে এবং তারা একটি সমঝোতার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন।

যুদ্ধ ও আলোচনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারবার অবস্থান বদলানো মন্তব্যগুলো ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও প্রচারিত হয়েছে।

রোববার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তেহরান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ওয়াশিংটনকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা না চালিয়ে বরং আলোচনায় মনোযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে—ট্রাম্প প্রশাসনের এই দাবি সত্য কি না?

জবাবে বাঘাই বলেন, ‘আমি মাঝেমধ্যে অবাক হই, কেন আপনারা মার্কিন কর্মকর্তাদের এমন মন্তব্যকে এত গুরুত্ব দেন, যেগুলো বারবার ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে।’

বাঘাই জোর দিয়ে বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তার ‘নীতিগত অবস্থান’ থেকে সরে আসবে না।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দেশটির জনগণকে আবার যুদ্ধ শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কা মাথায় রেখে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কট্টরপন্থীরা অবশ্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধানের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।

তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গতকাল সোমবারও একটি চুক্তির প্রতি তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন, জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি ভবিষ্যতে ইরানের পররাষ্ট্র সম্পর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করবে।

হরমুজ প্রণালিতে চলছে নৌযান

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ইরানি প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই শত্রুপক্ষকে তার স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে বাধ্য করার চেষ্টা করতে হবে। এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দেশ, অঞ্চল এবং আমাদের মিত্রদের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।’

ইরানে নতুন হামলা না চালাতে ট্রাম্পকে সৌদি যুবরাজের আহ্বান

মাসুদ পেজেশকিয়ানের এ বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর আবারও ট্রাম্পের নতুন একটি ঘোষণা আসে।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লেখেন, ‘আমরা না চাইলে ইরানে কোনো কিছুই পৌঁছাতে পারবে না, আর কোনো চুক্তি বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই পৌঁছাতে পারবে না। ইরান এটি স্বীকার করুক বা না করুক, বাস্তবতা হলো, আমরা এমন একটি সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করছি, যে সমস্যা তারা কয়েক দশক ধরে সৃষ্টি করেছে।’

ট্রাম্প আলোচনা শুরুর দাবি করলেও ইরান বলছে ভিন্ন কথা, আসলে কী হচ্ছে

Read full story at source