এমপিদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কি আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে যাচ্ছে

· Prothom Alo

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত।’ এই একটি বাক্যই জাতীয় সংসদের অস্তিত্বের মূল দর্শন নির্ধারণ করে দেয়। একজন সংসদ সদস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো তিনি একজন আইনপ্রণেতা। তিনি কেবল একটি নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি নন; তিনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিচালনার জন্য আইন তৈরির সাংবিধানিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি।

Visit newsbetting.cv for more information.

কিন্তু বাংলাদেশের সংসদীয় বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে—সংসদ সদস্যরা কি সত্যিই আইন প্রণয়নের দায়িত্বকে তাঁদের প্রধান কর্তব্য হিসেবে দেখছেন? নাকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আইন তৈরির কাজ ধীরে ধীরে প্রশাসনিক কাঠামো বা আমলাতন্ত্রের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ছে?

সম্প্রতি ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ পাসের প্রক্রিয়া এ প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক আইন সংসদে মাত্র ২৮ মিনিটের আলোচনার পর পাস হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। বিলটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়নি, পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ সীমিত ছিল এবং সংসদ সদস্যদের সংশোধনী প্রস্তাব ও মতামত দেওয়ার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার—দ্রুত আইন প্রণয়ন সব সময় ভুল নয়। আধুনিক রাষ্ট্রে কখনো কখনো জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সংস্কার বা প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে।

সরকার যদি বিভিন্ন বিনিয়োগ সংস্থাকে একীভূত করে একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে চায়, তার পেছনে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মূল প্রশ্ন হলো দ্রুততা কি প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে?

সরকার কি আমলাতন্ত্রের ফাঁদে পড়েছে

আইন শুধু সরকারের একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; আইন হলো এমন একটি কাঠামো, যা নাগরিকের অধিকার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং ভবিষ্যৎ নীতিকে প্রভাবিত করে। তাই একটি ভালো আইন তৈরির জন্য প্রয়োজন আলোচনা, পরীক্ষা, সংশোধন এবং বিভিন্ন পক্ষের মতামত বিবেচনা করা।

এ কারণেই বিশ্বের কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থাগুলোয় সংসদীয় কমিটিগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স, ভারতের সংসদ কিংবা অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় কমিটি পর্যায়ে বিলের বিস্তারিত পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। কারণ, সংসদের মূল শক্তি শুধু ভোটাভুটিতে নয়; বরং যুক্তি, বিতর্ক এবং সংশোধনের মধ্য দিয়ে একটি উন্নত আইন তৈরি করার সক্ষমতায়।

বাংলাদেশের সংসদীয় কার্যপ্রণালিতেও স্থায়ী কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, স্থায়ী কমিটিগুলো মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, বিল পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। এ কমিটিগুলো কার্যকর হলে সরকারের প্রস্তাবিত আইন আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও জনবান্ধব হতে পারে। এখানেই সংসদ ও আমলাতন্ত্রের ভূমিকার মৌলিক পার্থক্য।

একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী সরকার প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন শক্তিশালী সংসদ। কারণ, সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে, আর সংসদ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিচালনার নিয়ম তৈরি করে

আমলারা রাষ্ট্রের অপরিহার্য অংশ। তাঁরা তথ্য, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও কারিগরি দক্ষতার মাধ্যমে আইন ও নীতির খসড়া তৈরি করেন। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশেই আইন তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ে আমলাদের ভূমিকা থাকে। কিন্তু তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। তাঁদের দায়িত্ব হলো সরকারের নীতি বাস্তবায়নে সহায়তা করা।

অন্যদিকে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব হলো সেই নীতির রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক প্রভাব মূল্যায়ন করা। একটি আইন বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে, কোথায় সমস্যা তৈরি হতে পারে, কোন শ্রেণির মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এসব প্রশ্ন তোলার দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। যখন সংসদীয় আলোচনা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। আইন জনগণের প্রতিনিধিদের সম্মিলিত মতামতের ফল না হয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অনুমোদনে পরিণত হতে পারে। এটি শুধু একটি নির্দিষ্ট আইনের প্রশ্ন নয়; এটি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার প্রশ্ন।

গবেষণার অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে, নাকি আমলাতন্ত্রের কবজায়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, সংসদ সদস্যরা জাতীয় আইন প্রণয়ন বা নীতিনির্ধারণের চেয়ে স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক সুপারিশ কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানে বেশি মনোযোগ দেন। অথচ একজন সংসদ সদস্যের মূল শক্তি হওয়া উচিত ভালো আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোকে উন্নত করা।

একজন এমপির সাফল্য শুধু কতটি রাস্তা নির্মাণ করা হলো বা কতটি প্রকল্প অনুমোদিত হলো, তার ওপর নির্ভর করে না। একজন প্রকৃত আইনপ্রণেতার মূল্যায়ন হবে তিনি কতটা কার্যকর আইন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন, কতটা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেছেন এবং কতটা সরকারের সিদ্ধান্তকে যুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করেছেন, তার ওপর।

সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করে, কিন্তু বিরোধী দলের প্রশ্ন, সমালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাব গণতন্ত্রকে কার্যকর রাখে। কারণ, গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি মতামত ও জবাবদিহির একটি কাঠামো।

বাংলাদেশের ইতিহাসেও দেখা গেছে, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনকারী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো যখন দ্রুততার সঙ্গে এবং সীমিত আলোচনার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে, তখন সেগুলো পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ১৯৭৫ সালের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী এবং একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু সিদ্ধান্তের বিষয়বস্তু নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াগত বৈধতা, সংসদীয় আলোচনা এবং অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী জাতীয় সংসদে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পাস হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে এর গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্যই প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনা তার নিজস্ব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হয়। কিন্তু একটি সাধারণ শিক্ষা রয়েছে—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান যত শক্তিশালী হয়, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত তত বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।

আজকের প্রশ্ন ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন’ প্রয়োজনীয় কি না, শুধু তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের সংসদ কি এখনো আইন প্রণয়নের প্রকৃত কেন্দ্র হিসেবে নিজের ভূমিকা পালন করছে?

যদি সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নকে তাদের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে না দেখেন, যদি গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই পাস হতে থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হবে। নির্বাচিত সংসদ তখন জনগণের মতামত প্রকাশের জায়গা না হয়ে শুধু সিদ্ধান্ত অনুমোদনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী সরকার প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন শক্তিশালী সংসদ। কারণ, সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে, আর সংসদ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিচালনার নিয়ম তৈরি করে। আইন প্রণয়নের দায়িত্ব কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি সংসদ সদস্যদের সাংবিধানিক শপথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই দায়িত্ব দুর্বল হলে শুধু সংসদ নয়, দুর্বল হয় পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামো।

  • ড. মো. সাহাবুল হক অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

  • মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source