চট্টগ্রামের ১৫১টি মামলার মধ্যে দুই বছরে তদন্ত শেষ কেবল ১৫ টির
· Prothom Alo

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় চট্টগ্রামে মামলা হয়েছে ১৫১টি। গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হলেও এসব মামলার মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ১৫টির। এর মধ্যে ১২টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং ৩টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্র দেওয়া ১২ মামলার মধ্যে একটি হত্যা মামলা।
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে হতাহত ব্যক্তিদের স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাঁদের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হোক। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। যাচাই-বাছাই ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতামত নিয়ে এক-দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন আদালতে দেওয়া হবে।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে ১৫১টি মামলার মধ্যে নগর ও জেলার ৯টি থানায় হয়েছে ৬৯টি। বাকি ৮২টি মামলা আদালতে দায়ের করা নালিশি মামলা (সিআর)। এসব মামলায় নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ১৩ হাজার ৪৫০। অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার। আসামিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন—এমন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষের নামও রয়েছে।
আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ছোড়া ১০টি গুলি লাগে শহীদুলের শরীরেথানায় হওয়া ৬৯ মামলায় মোট আসামি ২১ হাজার ৯০৬ জন। এর মধ্যে নাম উল্লেখ করা আসামি ৭ হাজার ২২৬ এবং অজ্ঞাতনামা ১৪ হাজার ৬৮০ জন। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন ১ হাজার ৬০০ জন। তাঁদের মধ্যে এক–তৃতীয়াংশ এখন জামিনে বলে আদালত সূত্র জানিয়েছে।
গ্রেপ্তার না হওয়া উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, চট্টগ্রামের সাবেক দুই সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও রেজাউল করিম, কার্যক্রম নিষিদ্ধ কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী, নিষিদ্ধ নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম, সাবেক কাউন্সিলর নুর মোস্তফা ও শৈবাল দাশের নাম রয়েছে।
চট্টগ্রামে ১৫১টি মামলার মধ্যে নগর ও জেলার ৯টি থানায় হয়েছে ৬৯টি। বাকি ৮২টি মামলা আদালতে দায়ের করা নালিশি মামলা (সিআর)। এসব মামলায় নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ১৩ হাজার ৪৫০। অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার। আসামিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন-এমন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষের নামও রয়েছে।
১৫ হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র একটি
থানায় হওয়া ৬৯ মামলার মধ্যে ১৫টি হত্যা মামলা। এর মধ্যে শুধু নগরের চান্দগাঁও থানায় দোকানকর্মী শহীদুল ইসলাম হত্যা মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর আদালত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন। এতে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ ২৩২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের ছোড়া গুলিতে শহীদুল ইসলাম নিহত হন। তাঁর বুক, পেট ও পিঠে ১০টি গুলি লাগে। শটগান ও বন্দুক থেকে এসব গুলি ছোড়া হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট নগরের জুবিলী রোড এলাকায় জুতার দোকানের কাজ শেষে বাজার সদাই নিয়ে চান্দগাঁওয়ের বাসায় ফিরছিলেন শহীদুল ইসলাম। বাসার পাশে বহদ্দারবাড়ি এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিসোঁটা, হকিস্টিক ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চলছিল। ওই দিন সন্ধ্যা সাতটার দিকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে ছোড়া গুলি শহীদুল ইসলামের বুক, পেট ও পিঠে লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহত শহীদুল ইসলামের ভাই শফিকুল ইসলাম চান্দগাঁও থানায় মামলা করেন। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে আসামি করা হয়।
৬৭৫ আসামির নাম বাদ দিতে বাদীর আবেদন সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই নগরে চেরাগী পাহাড় মোড় এলাকায়তদন্ত শেষ চান স্বজনেরা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নগরের লালদীঘির পাড় এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মাদ্রাসাশিক্ষার্থী নিজাম উদ্দিন (২১)। ওই দিনই তাঁকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় গত বছরের ১ জুলাই তাঁর বাবা সাহাব উদ্দিন কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।
নিজামের বাবা সাহাব উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেদিন সুরতহাল-ময়নাতদন্ত করার মতো পুলিশ-চিকিৎসক, পরিবেশ কিছুই ছিল না। ছেলের লাশ দাফন করতে পেরেছি, এটিই বড় কথা। মামলা করার পর পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট আমার বাড়িতে গিয়েছিলেন। লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমার ছেলেকে যারা মেরেছে, তাদের বিচার চাই।’
নেছার আহমেদ, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের মামলার তদন্ত তদারককারী কর্মকর্তা ও নগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক উত্তর) বেশির ভাগ মামলায় ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। কিছু মামলার এজাহারে ত্রুটি রয়েছে। আবার অনেক মামলায় কিছু আসামিকে বাদ দিতে বাদী হলফনামা দিয়েছেন। এর বাইরে কয়েকটি ঘটনায় ময়নাতদন্ত না হওয়া এবং প্রতিবেদন পেতে দেরি হওয়ায় তদন্তে সময় লেগেছে।আরেকটি হত্যা মামলার বাদী আবদুল মোতালেব। তাঁর ছেলে কাউসার মাহমুদ বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট নগরের নিউমার্কেট গোলচত্বরে গুলিবিদ্ধ হন কাউসার। পরে ১৩ অক্টোবর ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় করা মামলায় সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, মহিবুল হাসান চৌধুরীসহ ৯১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় একজন মৃত ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।
কীভাবে মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, জানতে চাইলে মামলার বাদী ও নিহত কাউসারের বাবা আবদুল মোতালেব প্রথম আলোকে বলেন, ‘কীভাবে মৃত ব্যক্তি আসামি হয়েছে, তা জানি না। যারা আমার ছেলেকে মেরেছে, তাদের শাস্তি চাই।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখলেন সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ, পুলিশ বলছে ককটেলশহীদুল ইসলামসাত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন
নগর পুলিশের ৬৯টি মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত সাতটির তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টিতে অভিযোগপত্র এবং একটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। ছয়টি অভিযোগপত্রের মধ্যে একটি হত্যা মামলার। অন্যগুলো আহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলা। এসব মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়েছে।
জেলা পুলিশের অধীন থানায় করা ছয়টি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার জুনায়েদ কাউসার।
অন্যদিকে থানার বাইরে আদালতে করা ৮২টি মামলার মধ্যে ৮টির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়েছে। পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের নির্দেশে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের আটটি মামলা তদন্ত করেছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাদী ঘটনার বিষয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ দিতে না পারায় ওই দুটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। বাকি ছয়টিতে ঘটনায় জড়িত আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
‘গুলি ছুড়তে ছুড়তে আসছিল তারা’পিবিআই সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ২৮ সাংবাদিকসহ মোট ১০৯ জনের বিরুদ্ধে অপহরণের চেষ্টা, আক্রমণ ও মিথ্যা সংবাদ প্রচারের অভিযোগে করা একটি মামলার তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় পিবিআই।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলার বাদীকে হাজির হয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য চারবার নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি কোনো তথ্য দেননি। মামলায় সাক্ষী হিসেবে যাঁদের নাম ও ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল, তাঁদেরও পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া জব্দ করার মতো কোনো আলামতও পাওয়া যায়নি।
সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার সালাউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের ছয়টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। তবে এগুলোর তদন্ত শেষ পর্যায়ে।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নগরের মুরাদপুর এলাকায় হামলা করেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা‘নিরীহ কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন’
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের মামলার তদন্ত তদারককারী কর্মকর্তা নগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক উত্তর) নেছার আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বেশির ভাগ মামলায় ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। কিছু মামলার এজাহারে ত্রুটি রয়েছে। আবার অনেক মামলায় কিছু আসামিকে বাদ দিতে বাদী হলফনামা দিয়েছেন। এর বাইরে কয়েকটি ঘটনায় ময়নাতদন্ত না হওয়া এবং প্রতিবেদন পেতে দেরি হওয়ায় তদন্তে সময় লেগেছে।
নেছার আহমেদ বলেন, ‘নিরীহ কেউ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন আর প্রকৃত অপরাধী যাতে পার না পায়, সে লক্ষ্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহকে তদন্তে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, বেশির ভাগ মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। হত্যা মামলাসহ নগরের সাতটি মামলার অভিযোগপত্র প্রস্তুত রয়েছে। শিগগিরই এসব আদালতে জমা দেওয়া হবে।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূর বলেন, মামলাগুলোর তদন্ত শেষ পর্যায়ে। কিছু যাচাই-বাছাই শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মতামত নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।